সংগ্রহ করতে কল করুন- 01321 562 334
সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
আত্মশুদ্ধির মাস রমযান সমাগত। এ মাস নেকী অর্জনে প্রতিযোগিতা করার মাস। সিয়াম, তারাবিহ, সেহরি-ইফতার ও লাইলাতুল কদর ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের সুযোগ মেলে এ মাসে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়ে হলো, প্রচলিত কিছু মন্দ প্রথা ও নিন্দিত কাজ ক্ষুণ্ণ করে রমযানের মাহাত্ম্যকে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পরিবর্তে পূর্ণ করে গোনাহের ভাণ্ডার। রমযানে প্রচলিত মন্দ প্রথা ও নিন্দিত কাজসমূহের মধ্যে ‘মেয়েদের শ্বশুরালয়ে ইফতারি প্রেরণ’ অন্যতম। দরিদ্রদের জন্য এটা এক মহাআতঙ্কের নাম ও ধনবানদের জন্য এক বিলাসী প্রথা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রথার প্রচলন রয়েছে। আমাদের সিলেট বিভাগে এর প্রচলনটা একটু বেশি। একজন দরিদ্র দিনমজুর পিতা, নুন আনতে যার পান্তা ফুরায়, সেই পিতাকেও মেয়ের মান ইজ্জত রক্ষা করতে, সংসার টিকিয়ে রাখতে ইফতারি দিতে বাধ্য করা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, সুদের টাকা এনে হলেও মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানো লাগে। আবার যেনতেনভাবে পাঠালেও চলবে না, সন্তোষজন ইফতারসামগ্রী পাঠাতে হবে। কারণ ইফতারির পরিমাণ, আইটেম ও বৈচিত্র্যের সাথে জড়িত থাকে উভয়পক্ষের মান-মর্যাদার প্রশ্ন। যদি সন্তোষজন ইফতারি পাঠানো না হয়, তাহলেও দেখা যায় কনেকে বিভিন্ন মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হয়। এমনকি বিভিন্নভাবে লজ্জিতও হতে হয়। এটি কোনোভাবেই শরীয়ত সম্মত নয়। কেননা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কারো সম্পদ ভক্ষণ করা জায়েয নয় তার সন্তুষ্টি ব্যতীত।’
অনেকে জ্ঞান দিতে আসবেন যে, যে ব্যক্তি বিত্তবান তার তো ইফতারি দিতে কষ্ট হয় না। সে দিলে কোনো অসুবিধা নেই। আপনার এই যুক্তি ভুল। কারণ, বিত্তশালীরা যদি স্বেচ্ছায়ও দিয়ে থাকে; তবুও এতে লুকিয়ে থাকে লৌকিকতা। আর লৌকিকতাকে সূক্ষ্ম শিরক আখ্যা দিয়ে হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, শাদ্দাদ ইবনে আওস রাযিায়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় রিয়াকে ছোট শিরক গণ্য করতাম।’ (মুসনাদে উমার)
তাই মেয়েদের শ্বশুরালয়ে ইফতারি প্রেরণের এই জঘন্য প্রথাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজের সর্বশ্রেণির মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। যারা লেখালেখি করেন, আপনারা এর বিরুদ্ধে কলম ধরবেন। যারা মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন, আপনারা জুমার খুতবায় এ বিষয়ে আলোচনা করবেন। যারা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে অংশগ্রহণ করে থাকেন, আপনারা সেখানে এ বিষয়গুলো উত্থাপন করবেন। রমযানে তারাবিহ নামাযের পর বিভিন্ন মসজিদে নসিহতমূলক আলোচনা হয়ে থাকে, সেখানেও এ বিষয়গুলো উঠানো যেতে পারে। কেননা এই প্রথা পালন করতে গিয়ে অনেক পিতার চোখের অশ্রু ঝরে। অনেক মায়ের মন বিষাদে ভরে যায়। অনেক মেয়েকে অসম্মানিত হতে হয় তার শ্বশুরবাড়িতে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ সকল মন্দ প্রথা ও নিন্দিত কাজ থেকে হেফাজত করুন এবং রমযানের পবিত্রতা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
-সালাহ উদ্দীন তারেক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মাসিক হেফাজতে ইসলাম
আরবি চান্দ্রবর্ষের সপ্তম মাস ‘রজব’ শুরু হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। রজব মাসের কথা শুনলেই আমাদের মনে হয়, রমযানের আর বেশিদিন বাকি নেই, মাত্র দুই মাস বাকি। আল্লাহ তাআলা বারো মাসের মধ্যে চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম’ তথা সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “মহান আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, সেই দিন থেকে যেদিন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ।” (সূরা তাওবা, আয়াতক্রম : ৩৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘বারো মাসে বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক : যিলকদ, যিলহজ, মহররম আর চতুর্থটি হলো রজব, যা জুমাদাল উখরা ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী মাস।’ (বুখারী)
উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ‘আশহুরে হুরুমের এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, এসব মাসে ইবাদতের প্রতি যত্নবান হলে বাকি মাসগুলোতে ইবাদতের তাওফীক হয়। আর আশহুরে হুরুমে কষ্ট করে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারলে অন্যান্য মাসেও গুনাহ পরিহার করা সহজ হয়।’ (আহকামুল কুরআন, জাসসাস, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১১১; মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩৭২)
তাই আশহুরে হুরুমের অন্তভুর্ক্ত রজব মাসকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।
রজব মাসের পরবর্তী মাস শাবান। রজব ও শাবান মাসদ্বয়কে একত্রে রজবান বা রজবাইন বলা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুই মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। কামনা করতেন রজব-শাবানের বরকত পেয়ে পবিত্র রমযানের ফযীলতে ধন্য হতে। তাই মহান প্রভুর দরবারে মিনতি ভরে গভীর আবেগে দুআ করতেন- ‘আল্লাহুম্মা বা-রিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দান কর এবং রমযান মাস পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে (জীবন) দাও।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদীসক্রম : ২৩৪৭)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুই মাস ইবাদতে মগ্ন থেকে সাহাবায়ে কেরামদেরও আমলের জন্য উৎসাহ দিতেন। প্রায় রজব মাসে ১০টি নফল রোযা রাখতেন এবং শাবান মাসে ২০টি নফল রোযা রাখতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান ছাড়া বছরের সবচেয়ে বেশি রজব ও শাবান মাসেই নফল নামায, নফল রোযা ও নফল ইবাদত-বন্দেগি করতেন।
হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘রজব হলো আল্লাহর মাস। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর মাস রজবকে সম্মান করল, সে আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল। আর যে আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতুন নাঈমে প্রবেশ করাবেন। আর শাবান হলো আমার মাস। আর যে ব্যক্তি শাবান মাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল, সে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল। আর যে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, কিয়ামতের দিন আমি হব তার অগ্রবর্তী এবং নেকির ভাণ্ডার। আর রমযান মাস হলো আমার উম্মতের মাস।’ (শুয়াবুল ইমান, হাদীসক্রম : ৩৫৩২)
রজব ও শাবান মাসে আমাদেরকে বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে। নফল নামায ও রোযা রেখে রমযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। মোহমুক্তি ও পাপ পরিহার করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সমাজের একে অন্যকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করতে হবে। রমযান মাসে যেন ইবাদতের পরিবেশ রক্ষা হয়, সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের চাপ কমাতে হবে। দান-খয়রাতের পরিমাণ বাড়াতে হবে। রমযানে গরিব মানুষ যেন ভালোভাবে সাহরি ও ইফতার করতে পারে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে পরিকল্পনা রজব ও শাবান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রজব ও শাবান মাসে পূর্ণ বরকত-প্রাপ্তির মাধ্যমে রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। আমীন।
-সালাহ উদ্দীন তারেক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মাসিক হেফাজতে ইসলাম
حدثنا أَبُو الْيَمَانِ قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ عَنِ الْأَعْرَجِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَأَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ.
হাদীসের তরজমা :
আবুল ইয়ামান…হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও পুত্রের তুলনায় প্রিয়তর হই।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ১৪)
মহব্বত কাকে বলে?
শরীয়তের পরিভাষায় মহব্বত বলা হয়-
ميلان القلب الى الشيء المرغوب الثابت حسنه شرعا
অর্থাৎ, ‘শরীয়ত-সমর্থিত উৎকৃষ্ট ও পছন্দনীয় জিনিসের প্রতি মনের যে আকর্ষণ বা টান থাকে, তাকে মহব্বত বলা হয়।’
মহব্বতের প্রকারভেদ :
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে মহব্বত তথা ভালোবাসা তিন প্রকার। যথা-
১. محبت طبعي তথা স্বভাবগত ভালোবাসা : প্রবৃত্তির চাহিদা ব্যতীত অকৃত্রিম ভালোবাসাকে স্বভাবগত ভালোবাসা বলে। যেমন, সন্তান-সন্ততির প্রতি পিতা-মাতার ভালোবাসা।
২. محبت عقلي তথা জ্ঞানগত ভালোবাসা : প্রকৃতির দাবিকে উপেক্ষা করে গুন, জ্ঞান ও বুদ্ধি বিবেচনার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, তাকে জ্ঞানগত ভালোবাসা বলে। যেমন, আরোগ্য লাভের জন্য তিক্ত ওষুধ সেবন করা, কোন জ্ঞানী-গুণীকে ভালোবাসা।
৩. محبت شرعي তথা দ্বীনী বা ঈমানগত ভালোবাসা : শুধু দ্বীনী বা ঈমানের দাবিতে যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, তা-ই মহব্বতে শরয়ী। হাদীসের ভাষায় একে الحب في الله বলা হয়। যেমন, আল্লাহ, রাসূল, সাহাবী ও অন্যান্য মুসলমানের প্রতি ভালোবাসা। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে-
لا يؤمن احدكم حتى اكون احب اليه من والده وولده والناس اجمعين
হাদীসে বর্ণিত মহব্বত দ্বারা কোন প্রকারের মহব্বত উদ্দেশ্য; সে ব্যাপারে মনীষীগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছেন। তবে শেষ কথা হলো, হাদীসে বর্ণিত মহব্বত দ্বারা মহব্বতে আকলী (জ্ঞানগত ভালোবাসা) থেকে শুরু করে যত উচ্চস্তরের মহব্বত আছে তার সবগুলোকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তাই তো সাহাবায়ে কেরাম রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন রাসূলের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে এভাবে জান উৎসর্গ করেছিলেন যে, তাঁকে ছাড়া দুনিয়ার কোন কিছুর পরোয়া করেননি। এই ভালোবাসার শক্তিতেই হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘরের যাবতীয় সহায়-সম্বল আল্লাহর রাসূলের কদম মোবারকের সামনে রেখেছিলেন। ঘরে কী রেখে এসেছেন জিজ্ঞেস করা হলে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে’। কারণ একটাই, রাসূলের প্রতি তাদের ঈমানী ও জ্ঞানগত ভালোবাসা।
রাসূলের প্রতি মুমিনের ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিত?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিত তা তিনি নিজেই হাদীসে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না তার কাছে বাবা-মা, সন্তান-সন্ততি ও সবার চেয়ে আমি বেশি প্রিয় না হবো। তার মানে ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য বুনিয়াদি শর্ত হলো, আল্লাহর রাসূলকে প্রকৃত মহব্বত করা, নামে মাত্র মহব্বত করা নয়। একজন মানুষের সবচেয়ে আপন হলো তার বাবা-মা, তারপর সন্তানাদি, তারপর অন্য কোন মানুষ। তাদের সবার চেয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বেশি মহব্বত হতে হবে এবং তার প্রকাশ ঘটতে হবে আনুগত্যের মাধ্যমে। শুধু নীতি বাক্য নয়, মুমিনকে পৌঁছাতে হবে নবী প্রেমের এই স্তরে; সকলের উপর, সবকিছুর উপর প্রাধান্য দিতে হবে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে; এমনকি নিজের জানের উপরও। আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম রাযিয়াল্লাহু বলেন-
كُنَّا مع النَّبيِّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ وهو آخِذٌ بيَدِ عُمَرَ بنِ الخَطَّابِ، فَقالَ له عُمَرُ: يا رَسولَ اللَّهِ، لَأَنْتَ أحَبُّ إلَيَّ مِن كُلِّ شَيْءٍ إلَّا مِن نَفْسِي، فَقالَ النَّبيُّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ: لَا، والَّذي نَفْسِي بيَدِهِ، حتَّى أكُونَ أحَبَّ إلَيْكَ مِن نَفْسِكَ، فَقالَ له عُمَرُ: فإنَّه الآنَ، واللَّهِ، لَأَنْتَ أحَبُّ إلَيَّ مِن نَفْسِي، فَقالَ النَّبيُّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ: الآنَ يا عُمَرُ.
‘একদিন আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। নবীজি ওমরের হাত ধরা ছিলেন। ওমর রাযিয়াল্লাহু বলে উঠলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার কাছে সবকিছু থেকে প্রিয়, তবে আমার জান ছাড়া।’ তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘না; ওমর এতে হবে না। যে সত্তার হাতে আমার জান তার কসম! (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না) যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার জানের চেয়েও প্রিয় না হই।’ পরক্ষণেই ওমর বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন তা হয়েছে; আল্লাহর কসম এখন থেকে আপনি আমার কাছে আমার জানের চেয়েও প্রিয়।’ তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ, ওমর এখন হয়েছে।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৬৬৩২)
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা যদি সবকিছুর উপর না হয় তাহলে পথ চলবে কীভাবে? আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আদেশের সামনে সমর্পিত হবে কীভাবে? আজ বাধা হবে সন্তান, কাল স্ত্রী, পরশু পিতা। কখনো জানের মায়ায় লঙ্ঘিত হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ। আর মুমিন তো সেই, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহব্বত ও নির্দেশের সামনে সবকিছু পিছনে ফেলতে জানে।
পবিত্র কুরআনেও একই নির্দেশনা এসেছে। মুমিনের জন্য ভালোবাসার মূল কেন্দ্র স্বয়ং আল্লাহ, তারপর রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। দুনিয়ার বুকে যত প্রেমময় মানুষ আছে, যত রকমের ভালো লাগার জিনিস আছে, সবকিছুর অবস্থান দ্বিতীয়তে। এ থেকে বোঝা যায় আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসা আমাদের প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। কেননা দুনিয়াতে ভালোবাসার যত কিছু আছে এর সব তাঁর কারণেই প্রেমময়। যদি তিনি আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসতে না বলতেন, আত্মীয়তার বন্ধন ঠিক রাখতে না বলতেন, সামাজিকভাবে এক থাকতে না বলতেন; ধনী-গরিব, সাদা-কালো ভুলে গিয়ে এক কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামায পড়তে না বলতেন, আমাদের মধ্যে এসব করার আগ্রহই তৈরি হতো না। আমরা তখন হতাম বিচ্ছিন্ন, শান্তিহীন। আমাদের থাকতো না কোনো সুখ।
মানুষ সামাজিক প্রাণী বটে; নিজ প্রয়োজনে দলবদ্ধ হয়ে থাকে। কিন্তু আটলান্টিকের এপার থেকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত ভাই ভাইয়ের সম্পর্কের স্বর্ণময় এক সভ্যতা গড়ে তোলা তার চেয়ে অনেক বড় বিষয়। আর তা একমাত্র সম্ভব হয়েছে রাসূলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা থাকার কারণে। এই শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই, সে কখনো তার ওপর জুলুম করে না এবং জালিমের হাতে তাকে ছেড়ে দেয় না।’ তারপর বলেছেন, ‘এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীরের মতো, যার একাংশ অপরাংশকে শক্তি জোগায়।’
ভালোবাসার দাবি আনুগত্য :
ভালোবাসার সার কথা হচ্ছে, আমি যাকে ভালোবাসি তার চিন্তা-চেতনা, চাওয়া পাওয়ার সাথে একাত্ম থাকা।
রুয়াইম ইবনে আহমদ আল বাগদাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মহব্বতকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন-
المحبة الموافقة في جميع الاحوال (كلمة الاخلاص للحافظ ابن رجب ص-٣٢
অর্থাৎ, ‘ভালোবাসা হলো প্রেমাস্পদের সাথে সর্বাবস্থায় একাত্ম থাকা।’ সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মহব্বতের প্রকাশ হচ্ছে জীবনের সকল ক্ষেত্রে তার সুন্নাহর অনুসরণ করা। যদি তা অগ্রাহ্য করা হয় তাহলে মহব্বতের দাবি করা অযৌক্তিক।
হাকীম মাহমুদ ওয়াররাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন-
لو كان حبك صادقا لاطعته # ان المحب لمن يحب مطيع
অর্থাৎ, ‘যদি তোমার প্রেম খাঁটি হতো তবে তো তুমি তার অনুগত হতে। কারণ প্রেমিক তো প্রেমাস্পদের অনুগত থাকে।’ (শরহুয্ যরকানী আলাল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়াহ, পৃষ্ঠা : ১১৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন। তারা সত্যিকারের নবীপ্রেমের বেনযীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তার চুল মোবারক মুণ্ডন করা হচ্ছে, আর তাঁর সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে আছে। তাঁরা চাইছিলেন তাঁর একটি চুলও যেন মাটিতে না পড়ে। বরং কারো না কারো হাতেই পড়ে।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীসক্রম : ২৩২৫)
এরকম বহু দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন সাহাবায়ে কেরাম রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীরাও নবীপ্রেমের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারে।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবার হৃদয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেন। তাঁর সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করার তৌফিক দান করেন। আমীন।
حدثنا عَمْرُو بْنُ خَالِدٍ قَالَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ عَنْ يَزِيدَ عَنْ أَبِي الْخَيْرِ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَجُلاً سَأَلَ النَّبِيَّ أَيُّ الإِسْلاَمِ خَيْرٌ قَالَ تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ
হাদীসের তরজমা :
আমর ইবনে খালেদ… হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইসলামের কোন কাজটি উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘(ক্ষুধার্তকে) খাবার খাওয়াবে এবং তুমি যাকে চেনো কিংবা চেনো না সকলকেই সালাম দেবে।’ (বুখারী, হাদীস-ক্রম : ১২)
গুরুত্ব ও ফযীলত :
অন্নহীনকে অন্ন দেওয়া অতি বড় পুণ্যকর্ম। সহানুভূতি ও মানবিকতার এক বড় পরিচয়। বিবেকবান মানুষ মাত্রই তা উপলব্ধি করেন। তবে আরো দশটা ভালো কাজের মতো এ কাজটিও অবহেলিত থাকে ইচ্ছা ও সংকল্পের অভাবে। এটি এমন একটি পুণ্যকর্ম যার দ্বারা আল্লাহর দয়া ও করুণার পাত্র হওয়া যায় এবং বান্দার উপর আল্লাহর রিযিকের দরজা খুলে। ইসলামের দৃষ্টিতে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিদের খাদ্য দানের গুরুত্ব ব্যাপক। নিম্নে এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীস থেকে আলোকপাত করা হলো-
১. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করা : পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাদ্য দানের আদেশ দিয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
او اطعام في يوم ذي مسغبة يتيما ذا مقربة او مسكينا ذا متربة
অর্থাৎ, “অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্ন দান করা, ইয়াতীম নিকটাত্মীয়কে অথবা ভূলুণ্ঠিত অভাবগ্রস্তকে।” (সূরা বালাদ, আয়াত-ক্রম : ১৪-১৬)
২. শ্রেষ্ঠ সদকা : হাদীস শরীফে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে তৃপ্তির সাথে আহার করানোকে শ্রেষ্ঠ সদকা বলা হয়েছে।
افضل الصدقه ان تشبع كبدا جائعا
অর্থাৎ, ‘সর্বোত্তম সদকা, ক্ষুধার্তকে আহার করানো।’ (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী হাদীসক্রম : ৩০৯৫)
৩. জান্নাত লাভের ব্যবস্থা : বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়ল্লাহু আনহু বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম-
يا رسول الله اني اذا رايتك طابت نفسي وقرت عيني فانبئني عن كل شيء
‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে যখন আমি দেখি, তখন আমার মন ভরে যায়। আমাকে সকল বস্তুর সূচনা সম্পর্কে বলবেন কি? তিনি বললেন-
كل شيء خلق من ماء
অর্থাৎ, ‘সকল বস্তু পানি থেকে সৃজিত।’
আমি বললাম-
اخبرني بشيء اذا عملت به دخلت الجنه
অর্থাৎ, ‘আমাকে এমন একটি কাজ সম্পর্কে বলুন যা পালন করলে আমি জান্নাতে যাব। তিনি বললেন-
اطعم الطعام افش السلام وصل الارحام وقم بالليل والناس نيام تدخل الجنه بسلام
অর্থাৎ, ‘খাবার দাও, সালামের বিস্তার ঘটাও, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করো আর রাতে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে ওই সময় নামায পড়ো। নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারবে।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীসক্রম : ২৫৫০)
কাজেই ইসলামী শিক্ষায় খাবার খাওয়ানো হচ্ছে এক শ্রেষ্ঠ সওয়াবের কাজ, যে কাজের দ্বারা মানুষ জান্নাতের পথে এগিয়ে যায়।
৪. ক্ষুধার্তকে খাদ্য দানে আল্লাহর সন্তুষ্টি : ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করলে মহান আল্লাহ খুশি হন। একদা এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এসে বললেন, ‘আমি ক্ষুধায় কাতর হয়ে গেছি।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্বরিত তার এক স্ত্রীর নিকট খবর পাঠালেন। তখন খবর আসলো বাড়িতে পানি ব্যতীত কিছুই নেই। তারপর তিনি অন্য স্ত্রীর নিকট খবর পাঠালেন। তার ঘরেও পানি ব্যতীত কিছুই নেই। এভাবে সমস্ত বিবিগণ সেই একই কথা বলে পাঠালেন। শেষ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘কে এই রাতে এই ক্ষুধার্তকে মেহমান হিসেবে গ্রহণ করবে?’ সাহাবীদের মধ্য থেকে হযরত আবু তালহা আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে মেহমান হিসেবে গ্রহণ করলাম।’ অতঃপর আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্ষুধার্ত ব্যক্তিটিকে সাথে নিয়ে তার বাড়িতে গেলেন। তার স্ত্রীকে বললেন, ‘তোমার নিকট কোন খাবার আছে কি?’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই ক্ষুধার্ত মেহমানের আপ্যায়ন করো। স্ত্রী বললেন, ঘরে বাচ্চাদের খাবার ব্যতীত আর কিছুই নেই। তখন হযরত আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু বিবিকে বললেন, বাচ্চাদেরকে কোন একটি জিনিস দ্বারা ঘুম পাড়াও। আর মেহমান যখন ঘরে প্রবেশ করবে তখন তাকে এমনভাবে দেখাবে যে, আমরাও তার সাথে খানা খাচ্ছি। অতঃপর মেহমান যখন খাওয়ার জন্য হাত বাড়াবে তখন তুমি দাঁড়িয়ে বাতিটি ঠিক করছো ভান করে তা নিভিয়ে ফেলবে। স্বামীর কথা অনুযায়ী স্ত্রী তাই করলেন। অতঃপর তারা সকলেই খেতে বসে গেলেন। প্রকৃত অবস্থায় মেহমান খেলেন আর তারা উভয়েই অনাহারে রাত্রিযাপন করলেন। যখন ভোর হলো আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু সকাল বেলায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে আমাকে খবর দিয়েছেন, গত রাতে ঐ ক্ষুধার্ত মেহমানের সাথে যে আচরণ করেছো তাতে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আশ্চর্য হয়েছেন বা হেসেছেন।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৪৮৮৯)
৫. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী এবং অবিরাম নামায আদায়কারী ও রোযা পালনকারীর ন্যায় মর্যাদা লাভ : গরীব ও ক্ষুধার্তদের খাদ্য দান করা, তাদের খাদ্যের জন্য চেষ্টা-সাধনা করা এতই মর্যাদাপূর্ণ যে, ওই ব্যক্তি মহান আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কারীর মর্যাদা লাভ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘বিধবা ও মিসকিনদের জন্য চেষ্টা সাধনাকারী আল্লাহ তাআলার রাস্তায় জিহাদ কারীর সমতুল্য। ক্ষুধার্তের জন্য প্রচেষ্টাকারী শুধু জিহাদকারীর মর্যাদা লাভ করবে তা নয়; এমনকি সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে অব্যাহতভাবে দিনে রোযা রাখে এবং রাতে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে।’
৬. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য : গরীব, অসহায় ও ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাদ্য দানকারী ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্যকারী ব্যক্তি বলে গণ্য হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন- ردو السائل ولو بظلف محترق অর্থাৎ, ‘তোমরা ভিক্ষুককে কিছু না কিছু দাও, আগুনে পোড়া একটা খুর হলেও।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদীসক্রম ১৬৬৯৯)
অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্ণ আনুগত্যকারী উম্মত হতে চাইলে আমাদেরকে ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করতে হবে। কেননা তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয়, যে নিজে পেট পুরে আহার করে, কিন্তু তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (বায়হাকী, শুআবে ঈমান, হাদীসক্রম : ৩৩৮৯)
প্রয়োজনীয়তা :
১. খাদ্য মানুষের প্রধান মৌলিক চাহিদা। এই অন্নের তাড়নায়ই বহু দরিদ্র ব্যক্তি নানাবিধ সামাজিক অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যেমন : চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদি। এ সবের মূলে রয়েছে অভাব। তাই ক্ষুধার্ত ও দরিদ্রদেরকে খাদ্য দানের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। যার ফলে কমে যাবে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই আর সমাজে বিরাজ করবে স্থিতিশীলতা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, ‘অভাব মানুষকে কুফরির দিকে নিয়ে যায়। তাই অন্ন দানের মাধ্যমে বাঁচবে মানুষের ঈমান।’
২. ক্ষুধার্তকে খাদ্য দানের মাধ্যমে সমাজে বসবাসরত উচ্চ শ্রেণি দরিদ্র শ্রেণির সহচর্যে আসে, তাদের পাশে দাঁড়ায়। ফলে উভয় শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান কমে যায়। এতে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, একের প্রতি অন্যের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়।
৩. সর্বোপরি জান্নাত লাভের ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রয়োজনে ক্ষুধার্তকে অন্নদান একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ক্ষুধার্তদের খাদ্য দান করার এবং এর দ্বারা দুনিয়া আখেরাতে তার শাস্তি হতে বাঁচার ও জান্নাত লাভ করার তাওফীক দান করুন।
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ الْقُرَشِيِّ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبِي قَالَ، حَدَّثَنَا أَبُو بُرْدَةَ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِي مُوسَى ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَىُّ الإِسْلاَمِ أَفْضَلُ قَالَ “ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ ”.
হাদীসের তরজমা :
সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া… হযরত আবু মুসা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন ‘হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামে কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে।’ (বুখারী, হাদীস-ক্রম : ১০)
হাদীসের ব্যাখ্যা :
আল্লামা ফখরুদ্দীন আহমদ মুরাদাবাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, المسلمون শব্দ দ্বারা শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রে কল্যাণকামী হতে হবে অমুসলিমদের সাথে ভালো ব্যবহার করা যাবে না এ অর্থ বুঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো একজন মুসলিমকে অবশ্যই সকল মানুষের জন্যই কল্যাণকামী হতে হবে।
সুতরাং যদি কারো সাথে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক না থাকে তাহলে মানবতার খাতিরে তার সাথেও ভালো ব্যবহার করতে হবে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে- (المؤمن من امنه الناس على دمائهم واموالهم) এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, সকল মানুষের সাথেই ভালো ব্যবহার করতে হবে। হাদীসে উল্লিখিত الناس শব্দটি ব্যাপকতার দিকে ইঙ্গিত করেছে।
অমুসলিম যদি যিম্মি বা নিরাপত্তা গ্রহণকারী হয় তাহলে সেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিধানে মুসলমানদের মতোই। কেননা তাদের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (اموالهم كاموالنا ودماءهم كد مائنا) অর্থাৎ ‘তাদের মাল ও রক্ত আমাদের মাল ও রক্তের মতোই।’ সুতরাং মুসলমানদের মতো তাদের প্রতিও পূর্ণরূপে সদাচরণ করতে হবে। উল্লেখ্য, যে সকল কাফেরদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি হয়েছে তারাও যিম্মিদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।
জিহ্বা ও হাতকে বিশেষভাবে উল্লেখের কারণ :
আলোচ্য হাদীসে প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় দিতে গিয়ে তার মুখ ও হাত সংযত করার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ বর্ণনায় হাদীস বিশারদগণ কতিপয় ব্যাখ্যা পেশ করেছেন। যেমন-
১. ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ অধিকাংশ কাজই এ দুটি অঙ্গ দ্বারা সম্পাদন করে থাকে। তাই এ দুটি অঙ্গ সংযত রাখার কথাই বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২. অধিকাংশ সময় অপরের কল্যাণ বা অকল্যাণ করার ক্ষেত্রে এ দুটি অঙ্গই মানুষের প্রধান হাতিয়ার হয়ে থাকে। তাই বিশেষভাবে এ দুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. মানুষের বাহ্যিক আচরণ মুখ দ্বারা প্রকাশিত হয় আর দৈহিক শক্তি হাত দ্বারা প্রকাশিত হয়। তাই এ দুটিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাতের পূর্বে জিহ্বাকে উল্লেখ করার কারণ :
মুহাদ্দিসগণ এর কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তার মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-
১. সাধারণত সর্বপ্রথম মৌখিক কথাবার্তা তারপর হাতের বিষয়টির প্রয়োগ হয়। এজন্য জিহ্বা প্রসঙ্গকে আগে বলা হয়েছে।
২. জিহ্বা ব্যবহার করা সহজ, তাই এর ব্যবহার অধিক হয়। এজন্য জিহ্বার আলোচনা পূর্বে আনা হয়েছে।
৩. জিহ্বা দ্বারা কষ্টের কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা অধিক। এমনকি বিশেষ ব্যক্তিবর্গও এতে লিপ্ত হয়ে থাকে।
৪. জিহ্বা দ্বারা উপস্থিত অনুপস্থিত এমনকি জীবিত-মৃত সকলকে কষ্ট দেয়া যায়, কিন্তু হাত দ্বারা এরূপ করা যায় না।
৫. জিহ্বা দ্বারা প্রদত্ত কষ্ট অনেক ক্ষেত্রে হাতের আঘাতের চেয়েও অধিক প্রতিক্রিয়াশীল হয়। কবি কতই না চমৎকার বলেছেন-
جراحات السنان لها التئام ** ولا يلتام ما جرح اللسان
‘ছুরিকাঘাতের ক্ষতের আরোগ্যের জন্য প্রতিষেধক পাওয়া যায়। কিন্তু জিহ্বা দ্বারা প্রাপ্ত আঘাতের ক্ষত কখনোই সেরে উঠে না।’
গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা :
আল্লাহ তাআলার নিয়ামতরাজির মধ্যে যবান অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। সঠিক কাজে যবান ব্যবহার করা, অন্যায়-অসত্য ও হারাম থেকে বিরত রাখা আল্লাহ তাআলার দীদার লাভের সহজ উপায়। এককথায় যবানের হেফাজত করা মুমিন জীবনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পবিত্র কুরআনের সূরা মুমিনুনের শুরুতে আল্লাহ তাআলা খাঁটি মুমিনগণের সাতটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে দ্বিতীয় গুন হচ্ছে ‘যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত।’ উক্ত আয়াতেلغو শব্দের অর্থ- অনর্থক কথা বা কাজ।
সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
يا ايها الذين امنوا اتقوا الله وقولوا قولا سديدا يصلح لكم اعمالكم ويغفر لكم ذنوبكم.
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো তাহলে আল্লাহ তোমাদের কার্যক্রমসমূহ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন।” (সূরা আহযাব, আয়াতক্রম : ৭০-৭১)
আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাকওয়া অবলম্বন তথা সব ধরনের নাফরমানী ছেড়ে দিতে বলেছেন। এর সাথে সাথেই যবানের সদ্ব্যবহার তথা সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। কেননা যবান হলো নাফরমানির বড় হাতিয়ার। তাই তাকওয়ার সাথেই যবানে সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। যবান সঠিক হয়ে গেলে অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গও সংশোধন হয়ে যাবে। তাই এর পরেই সব আমল সংশোধন ও গুনাহ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন। আর অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত, যারা যবানের হেফাজত করতে পারে তারা অন্যান্য গুনাহ থেকে সহজেই বাঁচতে পারে। যবানের ব্যাপারে শিথিলতা অনেক বড় বড় বিপদ ডেকে আনে। দেখা যায় দু’একটি কথার সূত্র ধরে বউ শাশুড়ি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বড় ধরনের ঝগড়া-বিবাদ হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা যবান হেফাজতের তাগিদে অন্য আয়াতে এভাবে ইরশাদ করেছেন-
ما يلفظ من قول الا لديه رقيب عتيد
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে যে (লেখার জন্য) সদা প্রস্তুত।” (সূরা কাফ, আয়াতক্রম : ৫০)
যবানে উচ্চারিত সবকিছুই ফেরেশতারা সংরক্ষণ করে রাখেন। ভালো-মন্দ ছোট-বড় সবকিছুই তারা লিপিবদ্ধ করেন। কেয়ামতের দিন এগুলোর হিসাব দিতে হবে। সেই দিন জিহ্বা, হাত-পা-সহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষী দিবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يوم تشهد عليهم السنتهم وايديهم وارجلهم بما كانوا يعملون
“যেদিন তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত-পা সাক্ষ্য দিবে।” (সূরা নূর, আয়াতক্রম : ২৪)
যবান হেফাজতের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন-
من كان يؤمن بالله واليوم الاخر فليقل خيرا او ليصمت
‘যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৬০১৮)
একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উকবা ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিনটি ওসিয়ত করলেন। এর প্রথমটি ছিল- (املك عليك لسانك) ‘তুমি তোমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো।’
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
والذي لا اله غيره ما على الارض شيء احوج الى طول سجن من لسان
‘সেই সত্তার কসম যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই; ভূপৃষ্ঠে সবকিছুর চেয়ে জিহ্বাই সবচেয়ে বেশি বন্দিত্ব ও নিয়ন্ত্রণের মুখাপেক্ষী।’ (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীসক্রম : ১৮১৮৪)
কোন দার্শনিক বলেছিলেন-
ما ان ندمت على سكوتي مرة ولقد ندمت على الكلام مرارا
‘আমি কখনো আমার নীরবতার উপর অনুতপ্ত হয়নি। তবে বহুবার কথার কারণে লজ্জিত হয়েছি।’
যবানের বড় বড় গুনাহ :
যবানের দ্বারা মানুষ অনেক বড় বড় গুনাহে লিপ্ত হয়। যবান আমলের খাতাকে কলুষিত করে। কিয়ামতের দিন এই যবানই মানুষের মহাবিপদের কারণ হবে। যবানের দ্বারা সংঘটিত কিছু পাপ নিয়ে আলোচনা করা যাক।
গীবত : যবানের দ্বারা সংগঠিত গুনাহের মধ্যে গীবতেই মানুষ সবচেয়ে বেশি লিপ্ত হয়। কম মানুষই এ থেকে বাঁচতে পারে। এ ব্যাপারে অবহেলার অন্ত নেই। জেনে না জেনে বুঝে না বুঝে গীবত করতে থাকে। সকালে গীবত করে, বিকালে গীবত করে, রাতে গীবত করে; গীবতই যেন কারো কারো সারাদিনের একমাত্র কাজ। ক’জন একত্রিত হলে প্রথম কাজ যেন গীবত। এটা মানুষের সমাজে শত ফাসাদের কারণ। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এর নিকৃষ্টতা বর্ণনা করেছেন নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের সাথে তুলনার মাধ্যমে।
পরনিন্দা : সামাজিক ফাসাদের ক্ষেত্রে পরনিন্দা আরো মারাত্মক। পরনিন্দা বলা হয়- বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একের দোষ অন্যের কাছে লাগানো। পরনিন্দাকারী অন্যকে লাঞ্ছিত করতে গিয়ে একসময় নিজেও লাঞ্ছিত হয়; যখন মানুষ তার আসল উদ্দেশ্য জেনে যায়। পরনিন্দাকারীর পরিণাম বড় ভয়াবহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- (لا يدخل الجنة نمام) ‘পরনিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
মিথ্যা : মিথ্যা সকল পাপের মূল। মুনাফিকের স্বভাব। মুমিন মিথ্যা বলতে পারে না। মিথ্যার পরিণাম জাহান্নাম।
মিথ্যা সাক্ষ্য : মুমিন কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে পারে না।
মিথ্যা কসম : কসম করা হয় কাউকে কোন কথা বিশ্বাস করানোর জন্য। নিজের কথা বা কাজের সুসত্যতা প্রমাণের জন্য। এখন যার মাধ্যমে সত্য সুপ্রমাণিত করা হয়, সেটির ভিত্তি যদি মিথ্যার উপর হয়, তখন এটি কতই না মারাত্মক অন্যায় বলে গণ্য হয়। তাছাড়া কসম হয় আল্লাহর নামে। মিথ্যা, আবার আল্লাহর নাম নিয়ে মিথ্যা। চুরি আবার সিনাজুরি। এটি চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যবানের যাবতীয় অনিষ্ট হতে রক্ষা করুন। এই নেয়ামতকে ভালো কাজে ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন। আমীন।
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَامِرٍ الْعَقَدِيُّ، قَالَ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ بِلاَلٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم قَالَ “الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ”.
হাদীসের তরজমা :
হযরত আবু হুরাইরাহ রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি শাখা।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ০৯)
ঈমানের পরিচয় :
ঈমান আরবী শব্দ। আরবী ‘আমনুন’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। শব্দটির মূল অর্থ- বিশ্বাস করা, স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিশ্বস্ততা বা হৃদয়ের স্থিতি। এছাড়া আনুগত্য করা, শান্তি, নিরাপত্তা, অবনত হওয়া এবং আস্থা অর্থেও ঈমান শব্দটি ব্যবহৃত হয়। (মুয়জামুল মাকায়িসিল লুগাহ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৩৩)
ঈমান মূলত ছয়টি বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর সেগুলো হলো- ১. আল্লাহ। ২. ফেরেশতা। ৩. আসমানী কিতাব। ৪. নবী-রাসূল। ৫. শেষ দিবস ও পুনরুত্থান। ৬. ভাগ্যের ভালোমন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ঈমানের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমামগণের বিভিন্নধর্মী সংজ্ঞা পরিলক্ষিত হয়। সেগুলো হলো-
১. ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ‘আন্তরিক বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকৃতিই হলো ঈমান’।
২. ইমাম গাজালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত সকল বিধি-বিধানসহ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাই হচ্ছে ঈমান’।
৩. ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে, ‘অন্তরের বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং আরকানসমূহ (ইসলামের বিধি-বিধান) কাজে পরিণত করার নাম ঈমান’।
ঈমানের শাখা-প্রশাখার বিবরণ :
উল্লিখিত হাদীসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ঈমানের ৬০-এরও অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। অন্য হাদীসে এসেছে ৭০-এরও অধিক।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হিব্বান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ঈমানের মোট ৭৯টি শাখার কথা উল্লেখ করেছেন। (আল-ইহসান ফি তাকরিরি ইবনে হিব্বান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮৭)
আসল কথা হলো-بِضْعٌ বলতে ৩ থেকে ৯ পর্যন্ত বুঝায়। সে হিসাবে সর্বোচ্চ ৬৯ বা ৭৯টি হয়। এখানে সংখ্যা দ্বারা মূলত সুনির্দিষ্ট কোন সংখ্যা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং বোঝানো উদ্দেশ্য সংখ্যাধিক্য। অর্থাৎ ঈমানের অনেকগুলো শাখা আছে। সুতরাং ষাট বা সত্তরের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা মেলানোর চেষ্টা বৃথা।
উল্লিখিত হাদীস থেকে আরোও বুঝা যায়, ঈমানের সকল শাখা-প্রশাখা সমান নয়, এগুলোর মধ্যে উচু-নীচু স্তরভেদ রয়েছে। মুহাদ্দিসীনে কেরাম বিভিন্নভাবে ঐ শাখাগুলো গণনা করেছেন। ক্বাযী আয়ায সেগুলোকে সংক্ষেপে তিনভাগে ভাগ করেছেন। যথা-
(১) হৃদয়ের আমল। যা আকীদা-বিশ্বাস ও নিয়তের সাথে সংশ্লিষ্ট। এগুলো মোট ২৪টি। যেমন- আল্লাহর উপর বিশ্বাস। যিনি স্বীয় সত্তা ও গুণাবলীতে অনন্য এবং যা অন্য কারো সাথে তুলনীয় নয়। ফিরিশতাদের উপর বিশ্বাস ও অন্যান্য অদৃশ্য বিষয়ক জ্ঞান।
(২) যবানের আমল। এগুলো মোট ৭টি। যেমন- তাওহীদের স্বীকৃতি, কুরআন তেলাওয়াত, ইলম শেখা ও শিখানো, দুআ পাঠ ইত্যাদি।
(৩) দৈহিক আমল। এগুলো মোট ৩৮টি। যেমন- পবিত্রতা অর্জন, সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ, পর্দা করা, সাদাকা করা, পিতা-মাতার সেবা করা, পরিবার পালন করা, নেতার আনুগত্য করা, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করা, দন্ডবিধি কায়েম করা, জিহাদ করা, বাজে কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা ইত্যাদি। (ফাতহুলবারী, ০৯ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)।
ঈমানের শাখা-প্রশাখা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ঐসব কর্ম ও আচরণ এবং বাহ্যিক ও আত্মিক এমন অবস্থা ও গুণাবলী যা ঈমানের সূত্র ধরে মুমিনের মাঝে অর্জিত হওয়া কাম্য।
ঈমানের সর্বোচ্চ শাখা :
বুখারী শরীফের অনত্র বর্ণীত হয়েছে, ঈমানের সর্বোচ্চ শাখা হলো- ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।
অর্থাৎ, এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক, অদ্বিতীয়। তিনি সব পারেন, সব করেন। সব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই অধীন। তিনি সব ধরনের দুর্বলতা, ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। সামান্য থেকে সামান্যতম বিষয়েও সবাই তার মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন- এমন বিশ্বাস লালন করা।
সেই সাথে এ কথাও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং মেনে নেয়া, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তিনি সর্বশেষ নবী। মানুষের হেদায়েতের জন্য মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ পয়গম্বর। তাঁর পরে আর কোনো নবী অথবা রাসূল আসবেন না।
ঈমানের সর্বনিম্ন শাখা :
শুয়াবুল ঈমান সংক্রান্ত অন্য হাদীসে ঈমানের সর্বনিম্ন শাখা বলা হয়েছে- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করে দেওয়াকে। আপাতদৃষ্টিতে এ আমলটি অতি সামান্য মনে হলেও বাস্তবতায় এটি অনেক বড়। কেননা এ কাজটি করা হয় মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থেকে। আল্লাহর বান্দাগণ এ পথে যাতায়াত করতে গিয়ে কষ্ট পেতে পারে, সে চিন্তা থেকেই একজন মুমিন কষ্টদায়ক বস্তুটি সরিয়ে ফেলে। অর্থাৎ সে অন্যের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে শিক্ষাই আমাদের দান করেছেন। তিনি এক হাদীসে বলেন-
المسلمون كرجل واحد، إن اشتكى عينه اشتكى كله، وإن اشتكى رأسه اشتكى كله
‘মুসলিমগণ সকলে মিলে এক ব্যক্তির মত, যার চোখ অসুস্থ হলে সারা শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মাথা অসুস্থ হলে সারা শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে।’ (মুসলিম, হাদীসক্রম : ৬৫৮৯)
এর দ্বারা বোঝা গেল অন্যের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করা প্রকৃত মুমিনের পরিচায়ক। সুতরাং প্রকৃত মুমিন রাস্তায় কষ্টদায়ক বস্তু দেখলে অবশ্যই তা দূর করবে, যাতে অন্য মুসলিম কষ্ট না পায়।
লজ্জাও ঈমানের শাখা :
হাদীসে ঈমানের শাখাসমূহের মধ্য থেকে কেবল লজ্জার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লজ্জার এমন কী বিশেষত্ব, যে কারণে অন্যসব শাখা থেকে বাছাই করে কেবল এর কথাই উল্লেখ করা হল? এর উত্তর মেলে অন্য এক হাদীসে। তাতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
إنَّ ممَّا أدرك النَّاسُ من كلامِ النُّبوَّةِ الأولَى : إذا لم تستحْيِ فاصنَعْ ما شئتَ
‘মানুষ পূর্ববর্তী নবুওয়াতের যে বাণী লাভ করেছে (অর্থাৎ পূর্ববর্তী নবীদের যে শিক্ষা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে) তা হচ্ছে- তুমি যদি লজ্জাই না কর তবে যা চাও করতে পার।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৩৪৮৩)
অর্থাৎ যে ব্যক্তির লজ্জা নেই সে পারে না এমন কোন অপরাধমূলক কাজ নেই। যেকোন অন্যায়-অপরাধ লজ্জাহীন মানুষ অবলীলায় করতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তির লজ্জা আছে, সে সহজে অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত হতে পারে না। লজ্জা তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যখনই কোন মন্দ কাজ করার ইচ্ছা জাগে, তখন লোকে দেখলে কী বলবে এই অনুভূতি তাকে সে কাজ করতে দেয় না। সে মনের ইচ্ছা মনেই দমন করে ফেলে। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কী অর্থপূর্ণ সরল বাণী-
الْحَيَاءُ لاَ يَأْتِي إِلاَّ بِخَيْرٍ
‘লজ্জাশীলতা কেবলই কল্যাণ নিয়ে আসে।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৬১১৭)
লজ্জাশীলতা শুধু ঈমানের শাখাই নয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লজ্জাশীলতাকে দ্বীন ইসলামের মূল চরিত্র হিসেবেই অভিহিত করেছেন-
إِنَّ لِكُلِّ دِينٍ خُلُقًا، وَخُلُقُ الإِسْلاَمِ الْحَيَاءُ.
‘প্রতিটি দ্বীনেরই একটি চরিত্র রয়েছে। ইসলামের চরিত্র হলো লজ্জাশীলতা।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীসক্রম : ৪১৮১)
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT