সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
প্রচণ্ড দাবদাহে পুড়ছে গোটা দেশ। নিদাঘের মধ্যাহ্ন সূর্য যেন প্রকৃতিতে তরল আগুন ঢালছে। প্রতিদিনই বাড়ছে উষ্ণতা। ঘরে-বাইরে প্রশান্তি নেই কোথাও। বাতাসের আর্দ্রতার আধিক্যে ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস দশা। বাড়ছে রোগ-বালাই। হিট স্ট্রোকে মরছে মানুষ। জারি করা হয়েছে ‘হিট অ্যালার্ট‘। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তেমন কেউ গৃহ আবাসের বাইরে যাচ্ছে না। রাস্তাঘাট সড়কে পিচ গলছে। যত দিন যাচ্ছে তাপপ্রবাহ মাঝারি থেকে তীব্র, তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাপপ্রবাহ এতো অধিক পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার পিছনে কারণ কী?
এর অন্যতম কারণ হলো- মানবসভ্যতার উন্নয়ন, প্রগতি ও উৎকর্ষের নামে আমরা নানা সময়ে, নানা কারণে পরিবেশকে বিপর্যস্ত করছি। নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুর ভরাট করে বসতি স্থাপন ও কলকারখানা নির্মাণ করছি। গাছ কেটে বন উজাড় করছি। এসব কাজের বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিতে। তাই দেখা দিয়েছে অসহনীয় তীব্র তাপপ্রবাহ।
অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে আমরা এসব ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারি। কারণ, আমাদের সুস্থভাবে বাঁচার জন্য সুন্দর ও নির্মল পরিবেশ-প্রকৃতি অপরিহার্য। নির্মল পরিবেশ বজায় রাখতে ইসলাম আমাদেরকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পানি ও গাছের ভূমিকা অনন্য। পানি প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রধান উপাদান। পানি ছাড়া প্রাণীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সে জন্য পানিকে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে। নিজেদের কোনো কর্মে যেন পানি দূষিত না হয় সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানিকে পবিত্র, নিরাপদ ও দূষণমুক্ত রাখতে সবাইকে সচেতন করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন আবদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করে অতঃপর সেখানে গোসল না করে।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ২৩৬; মুসলিম, হাদীসক্রম : ৬৮২)
বৃক্ষ-তরুলতা প্রকৃতির প্রাণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। কাজেই এই তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করতে হবে। অপ্রয়োজনে বৃক্ষ-তরুলতাকে নষ্ট করা যাবে না। হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে।’ (বুখারী, আদাবুল মুফরাদ, হাদীসক্রম : ৪৭৯; মুসনাদ আহমদ, হাদীসক্রম : ১৮৩)
অন্য হাদীসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটবে (যে গাছ মানুষের উপকার করত) আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (বায়হাকি, হাদীসক্রম : ১৪০) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃক্ষরোপণ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। এটিকে সাদকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাবির রাযিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে মুসলমান কোনো বৃক্ষ রোপণ করে, তারপর তা থেকে কোনো মানুষ, পশু বা পাখি ভক্ষণ করে, এর বিনিময়ে কিয়ামতে তার জন্য একটি সদকার সাওয়াব রয়েছে।’ (মুসলিম, হাদীসক্রম : ৪০৫৩)
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও তাপপ্রবাহ কমিয়ে আনতে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, বৃক্ষ বাতাসে জলীয়বাষ্পের ক্ষমতা বাড়িয়ে আবহাওয়াকে শীতল রাখে। প্রচুর বৃষ্টিপাতেও বৃক্ষরাজি বিশেষ সহায়ক।
পরিবেশ রক্ষায় মসজিদের ইমাম, খতিব ও ধর্মীয় বক্তাদেরও ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচেতন সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে মসজিদের মিম্বার ও ওয়াজের মঞ্চ হতে পারে চমৎকার ক্ষেত্র। কুরআন-হাদীসের আলোকে গঠনমূলক নির্দেশনা নিয়ে এ ক্ষেত্রে আলেমদেরও এগিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীর ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলাম যে নীতিমালা দিয়েছে, তা যদি মুসলিম স্কলাররা ঐক্যবদ্ধভাবে বিশ্বমানবকে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে তুলে ধরেন, তাহলে হয়তো পরিবেশ সংরক্ষণে মুসলমানেরা আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই তাপপ্রবাহ থেকে হেফাজত করুন এবং পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সবাইকে সচেতন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
-সালাহ উদ্দীন তারেক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মাসিক হেফাজতে ইসলাম
প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জীবনযাপনে অর্থব্যবস্থা মানুষের জীবনধারাকে প্রভাবিত করছে। সমাজব্যবস্থা, নীতি-নৈতিকতা, ধর্ম, শিক্ষা-সর্বত্রই অর্থনীতি প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এক কথায়, মানব জীবনের কোনো দিক ও বিভাগ অর্থনীতির আওতাবহির্ভূত নয়। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবসময় কোনো না কোনো নীতি বা আদর্শকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক ধারা বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, তিনটি উল্লেখযোগ্য অর্থব্যবস্থা সমাজে প্রচলিত ছিল এবং আজও বর্তমান আছে। এগুলো হলো- পুঁজিবাদী অর্থনীতি, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি এবং ইসলামী অর্থনীতি।
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মূল কথা হলো- প্রত্যেক ব্যক্তিই হবে নিজের উপার্জিত ধন-সম্পদের মালিক। এতে অন্যের কোনো অধিকার নেই। ইচ্ছেমতো ভোগ-ব্যয় করতে পারবে। সমাজবাদী অর্থ ব্যবস্থার মূল কথা হলো- এখানে ব্যক্তি মালিকানার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সকল কিছু। ফলে এ ব্যবস্থায় জনগণের চিন্তা, মত ও কর্মের সমস্ত স্বাধীনতা রহিত হয়েছে এবং মানুষ যন্ত্র-মানবে পরিণত হয়েছে। এ দু’টি মতবাদের বিপরীতে ইসলাম মানব জাতির জন্য একটি সুন্দর ভারসাম্য মূলক কল্যাণময় ব্যবস্থা দিয়েছে। এখানে ব্যক্তিকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। ফলে মানুষ এ স্বাধীনতা একটি নৈতিক মানের ভেতর দিয়েই কেবল ভোগ করতে পারে। এ স্বাধীনতা মোটেও অনিয়ন্ত্রিত নয়। কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত।
ইসলামী অর্থনীতিতে ধনী ও দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে যাকাত নামক একটি চমৎকার কর্মসূচির বিধান রয়েছে। যে কর্মসূচির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- সমাজের বিত্তবান ও সচ্ছল লোকদের বাড়তি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত আদায় করে দরিদ্র ও বঞ্চিত লোকদের মধ্যে যথাযথ বণ্টন করে দেওয়া। বলাবাহুল্য, এটি যেমন একটি রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম, তেমনি ইসলামের একটি মৌলিক বিধানও। তাই পবিত্র কুরআনের বহুতর স্থানে নামায প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে যাকাত প্রদানেরও আদেশ করা হয়েছে এবং আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য অশেষ সাওয়াব, রহমত ও মাগফিরাতের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিরও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা সালাত আদায় কর এবং যাকাত প্রদান কর। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে তা আল্লাহর নিকটে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখছেন।” (সূরা বাকারা, আয়াতক্রম : ১১০)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “তোমরা সালাত আদায় কর, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে পার।” (সূরা নূর, আয়াতক্রম : ৫৬)
হাদীস শরীফে একে ইসলামের সেতুবন্ধন বলা হয়েছে। কারণ, এটি ধনী ও গরিবের মাঝে অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন।
সমাজ থেকে দরিদ্রতা দূরীকরণে এবং সমাজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, যাকাত সম্পর্কে স্পষ্টতর ধারণার অভাবে এবং এর বণ্টন পক্রিয়ায় অবহেলার কারণে এই কল্যাণময় ব্যবস্থাটি থেকে আমাদের সমাজ যথোচিতভাবে উপকৃত হতে পারছে না।
আমাদের দেশে গড়ে আদায়যোগ্য যাকাতের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকারও অধিক। যা দ্বারা প্রতিবছর দুই লাখ লোকের পুনর্বাসন সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে এভাবে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।
আসুন, আমরা ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করি এবং যাকাত প্রদানে বিত্তবানদের উৎসাহিত করি। মানবতার কল্যাণ সাধন করে শান্তির সমাজ কায়েম করি। সবাই মিলে পরকালে জান্নাতের পথে এগিয়ে যাই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক দায়িত্ব পালনে তাওফিক দান করুন। আমীন।
-সালাহ উদ্দীন তারেক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মাসিক হেফাজতে ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT