বৈশাখের আকাশ যেমন হঠাৎই ভরে ওঠে মেঘে। ঢাকা পড়ে যায় জোছনাদায়ী চাঁদ। তেমনই আমাদের জীবন। উচ্ছল আনন্দে ভরপুর জীবনাকাশ কখন যে ছেয়ে যায় বিষাদ ও বিপদ-দুর্বিপাকের কালো কালো মেঘে; তার আর গতি প্রকৃতি উপলব্ধ করা যায় না। জীবন সব সময়ই এক গতিতে বহমান নয়, এর চাইতে নির্মম সত্য বুঝি কিছু নেই আর। এই তো জীবন কেটে যাচ্ছে বেশ নির্ঝঞ্জাট। কোনো আপদ নেই, কোনো কলহ নেই, নেই কোনো দুর্গতি। আর ঠিক তখনই আসমান ভেঙে যেন মাথার ওপর নেমে আসে বিপদ মুসিবতের ঘনঘটা। কখন কার ওপর যে কী আপদ নেমে আসবে, মানুষ হিসাবে তার ভবিষ্যদ্বাণী কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। অকস্মাৎ নেমে আসা আপদের মুখে সে কেবল এতটুকুই উচ্চারণ করে উঠতে পারে- এইতো জীবন। জীবন এমনই।
প্রায় প্রত্যেকদিনই কোনো না কোনো বিপদের মুখোমুখি হই না; আমাদের মধ্যে কে আছে এমন? বংশ-কৌলীন্য, কর্মের ক্ষেত্র ও সামাজিক স্টাটাস, এসবের ব্যবধানে আপতিত আপদের রূপ-চরিত্রে পার্থক্য থেকে থাকতে পারে; থাকেও। কিন্তু বিপদের সামনে দাঁড়াতে হয় সকলকেই। সকলকেই শঙ্কিত হতে হয় প্রবল ঝঞ্ঝার চোখ রাঙানির সামনে। বিপদ-আপদ-মুসিবত আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অনুষঙ্গ। বরং বলা ভালো- এটাই জীবন।
যাবতীয় আপদের মুখোমুখি হয়ে মুমিন হিসাবে প্রতিজন ব্যক্তির কর্তব্য সেই কঠিনতম সময়েও মহান রবের স্মরণ নেওয়া। দুর্যোগ, অভাব, অনটন, ক্ষুধা, পিপাসা, জুলুম, অন্যায়, অবিচারসহ সর্বাবস্থায় মুমিনের কর্তব্য আল্লাহকে স্মরণ করা। ধৈর্যের আশ্রয় নেওয়া এবং যুগপৎ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ক্ষুধা পিপাসা অনটনের মাধ্যমে আল্লাহ পরীক্ষা নেন তাঁর বান্দার। তিনি দেখতে চান- এই ঘোরতম দিনেও বান্দা তাঁকে স্মরণ করে কিনা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।
যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।” (সূরা বাকারা, আয়াতক্রম : ১৫৫, ১৫৬)
শেষ আয়াত থেকে বিপদগ্রস্ত মুমিনের জন্য আমরা আল্লাহ তাআলার দুটি নির্দেশ পাই। এক. বিপদে মুমিন ধৈর্য ধরবে। কোনো অবস্থাতেই সে ধৈর্য ও স্থৈর্যহারা হবে না। দুই. সে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করবে। দুআ বাক্যটি পর্যন্ত রাব্বে কারীম শিখিয়ে দিচ্ছেন—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيْهِ رَٰجِعُون
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহার জবানিতে আমরা এই দুআটিকে আরেকটু বিস্তৃত আকারে পাই। নবীজি স্বয়ং তাঁকে দুআটি শিখিয়েছিলেন। সেই দুআর বরকত এমনভাবে তাঁর জীবনকে আন্দোলিত করেছিল ও তাঁকে উন্নীত করেছিল এমন অবস্থানে, কেয়ামত দিবস পর্যন্ত আমরা যার প্রতি কেবল ঈর্ষান্বিতই হতে পারি।
মাতৃভূমি ছেড়ে উম্মে সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা হিজরত করেছেন মদীনায়। স্বামী সংসার নিয়ে দিন সানন্দেই কাটছে। অকস্মাৎ তাঁর জীবন ছেয়ে যায় ঘন কালো অমাবস্যায়। বিভুঁইয়ে চার সন্তান রেখে ইন্তেকাল করেন আবু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহু। স্বামীর এমন মৃত্যুতে অকুল পাথারে পড়ে যান যেন উম্মে সালামা। তবু ধৈর্যহারা হন না। সাহস রাখেন। তিনি জানতেন, মেঘ যত আঁধার কালোই হোক না কেন, একদিন সূর্যটা ঠিক হেসে উঠবেই।
জীবন জড়িয়ে যাবার উপক্রম যখন, তখনই শরণাপন্ন হলেন রাসূলের। রাসূল তো সব জানেনই। আবু সালামা যে তাঁর প্রিয় সাহাবিদের অন্যতম ছিলেন। তেমনি উম্মে সালামাও নবীজির কাছে বিশেষ মর্যাদা রাখেন। তাঁর পরিবার এমন দুর্যোগে পড়েছে, নবীজির হৃদয় যেন ব্যথাভার হয়ে উঠলো।
নবীজি দুআ শিখিয়ে দিলেন উম্মে সালামাকে। বলে দিলেন, বিপদে পড়ে এই দুআ পাঠ করলে আল্লাহ বিপদ দূর করে দেন। আর কিছু খুইয়ে থাকলে তার চাইতেও উত্তম বদল দান করেন। নবীজির শেখানো দুআটি ছিল—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ اؤْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
“আমরা তো আল্লাহর জন্যই এবং আল্লাহর কাছে আমরা ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদের তুমি প্রতিদান দাও এবং তার চাইতেও উত্তম বদল তুমি আমাকে দান করো।”
উম্মে সালামা প্রথম কদিন ভাবলেন, আবু সালামার চাইতে উত্তম বদল আর কী দেবেন আল্লাহ আমাকে, তাঁর মতন স্বামী কি আর আরব দেশে আছে। সমগ্র দুনিয়াতেও আবু সালামার বদল মিলবে না। এমনই ভালোবাসতেন তাঁকে তাঁর প্রিয়তম আবু সালামা।
তবু মতন বলেছেন রাসূল, পাঠ করতে তাতে তো আর হেলা করা চলে না। আমল করতেই হয়। তাই যেদিন নবীজি দুআটি শেখালেন সেদিন থেকেই পাঠ শুরু করলেন। পাঠক, এই দুআর বরকত কী হয়েছিল জানেন কী? আল্লাহ তাআলা উম্মে সালামাকে তাঁর বিপদ থেকে তো উদ্ধার করেই ছিলেন। উপরন্তু আবু সালামার পরিবর্তে এমন স্বামী তাঁকে দান করেছিলেন, কেবল আরব কেন, সমগ্র জগতেই যার তুল্য দ্বিতীয় কেউ নেই। উম্মুল মুমিনীন হওয়ার বিরল সৌভাগ্যে ভূষিত করেন আল্লাহ তাআলা উম্মে সালামাকে। সন্দেহ নেই, তা করেছেন তিনি উল্লিখিত দুআরই বরকতে। অন্তত উম্মে সালামার জবানিতে আমরা এমনই জানতে পাই। (মুসলিম, হাদীসক্রম : ৯১৮)
ফ্লাটফর্ম পেরিয়ে এসেছেন। স্টেশন থেকে বেরোতে যাবেন। অমনি আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে কোনোদিন দেখেননি এমন এক লোক। পরনে তার লজ্জাস্থান ঢাকা যায় পরিমাণ জীর্ণ একটা প্যান্ট। মাথার ওপর চুল বলতে কিছু নেই। ফ্যাকাশে জমাটবদ্ধ এক তাড়া পাটের রশি যেন। গলায় ঝুলছে লোহার মোটা মোটা শেকল। এমন চেহারা নিয়ে অকস্মাৎ সামনে এসে দাঁড়ালে আপনার ভীত হয়ে পড়বার কথা। ভয় আপনি পেলেন। সেই সাথে মানবিকতার পারদ কিছুটা উর্ধ্বমুখী থাকবার কারণে আপনি বিষণ্ন হয়ে পড়লেন। মানুষের এমন বিপন্নতা কাঁদায় আপনাকে। হাতে দশ টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়ে দ্রুত ছেড়ে আসলেন সেই জায়গা।
স্টেশন থেকে বের হয়েছেন। হাতে আপনার সময় কম। গন্তব্যে দ্রুতই পৌঁছতে হবে আপনাকে। অটো রিকশা ডাকলেন। রিকশায় উঠতেই খেয়াল হলো, যে লোকটি চালকের আসনে বসে আছে তার একটি পা নেই।
প্রতিদিন চলার পথে এমনই বিপদগ্রস্ত কত মানুষের সাথে আমাদের দেখা হয়ে যায়। কারুর হাত নেই। কারুর পা নেই। কেউ আবার অন্ধ, মূক, বধির কিংবা বিকারগ্রস্ত। এ সবই এমন আপদগ্রস্ত, হাত পা ওয়ালা সুস্থ আমি আপনি; যার সঠিক উপলব্ধি করতে সমর্থ হবো না।
মানুষের এমন অসহায়ত্ব দেখে আমাদের প্রথম করণীয় কী? প্রথম করণীয় রাব্বে কারীমের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। শুকরিয়া আদায় করা তাঁর তরে যে, তিনি আমাদের সুস্থ রেখেছেন। মুক্ত রেখেছেন এমন কঠিনতম বিপদ থেকে। দ্বিতীয়ত আমাদের কর্তব্য একটি দুআ পাঠ করা। যে দুআটির ব্যাপারে নবীজি বলেন, ‘কেউ যদি হঠাৎ কোনো বিপদগ্রস্থ ব্যক্তিকে দেখে এই দুআটি পাঠ করে, তবে যতদিন সে বেঁচে থাকবে আল্লাহ তাকে সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রাখবেন। (ইবনে মাজাহ, হাদীসক্রম : ৩৮৯২)
দুআটি হলো—
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِه وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا
অর্থাৎ, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, তিনি তোমাকে যে বিপদে লিপ্ত করেছেন তা থেকে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির উপর আমাকে মর্যাদা দান করেছেন।’
আমরা মানুষ মাঝে মধ্যে বড় নির্দয় হয়ে যাই। বিশেষ করে পাশের জনকে যখন বিপদে পড়তে দেখি, প্রতিবেশীকে যখন দেখি আপদের ঘূর্ণিতে জড়িয়ে যেতে, আমাদের নির্দয়তা সেই সময়টাতে সব চাইতে নিষ্ঠুর ও প্রকটভাবে প্রকাশমান হয়। আমরা অন্যের বিপদে আহ্লাদিত হই। অন্যকে মুসিবতগ্রস্ত দেখে বিমল আনন্দে মেতে উঠি। অথচ জানা নাই সেই একই বিপদ আমাকেও আক্রান্ত করবে কিনা!
কাউকে যখন বিপদগ্রস্ত হতে দেখব, তা সে যেই বিপদই হোক- কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার বিপদ, সহায় সম্বলহীন কৃষকের ভূমিহীন হয়ে পড়বার বিপদ কিংবা অন্য যে কারুর যে কোনো প্রকারের মুসিবতে তখন মুমিন হিসাবে আমার প্রথম কর্তব্য তার বিপদমুক্তির জন্য দুআ করা। দ্বিতীয় কর্তব্য নিজের ব্যাপারে চিন্তা করা এবং বিপদ আসবার পূর্বেই আল্লাহ তাআলার কাছে ফরিয়াদ জানানো, যেন তিনি সেই ঘোরতম আপদ আমার ওপর চাপিয়ে না দেন। আমরা তো বড় দুর্বল। পরীক্ষায় উতরানো আমাদের জন্য সহজ কর্ম নয়। আল্লাহর কাছে সব সময় দুআ করা উচিত, কঠিন বিপদ চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি যেন আমাদেরকে পরীক্ষার সম্মুখীন করে না দেন।
আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।