বিয়ের জন্য নির্ধারিত পাত্রীকে দেখার বিষয়টি শরীয়তে অনুমোদিত। আমাদের সমাজেও খুবই গুরুত্বের সাথে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে এই দেখা ও দেখানোর কাজটি সম্পন্ন করা হয়।
যখন কোন মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে ভাবা হয়, আলাপ-আলোচনা হয় অথবা কারো পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে, তখন সর্বাগ্রে যে প্রশ্নটি আসে, তা হচ্ছে- ‘পাত্রী দেখতে কেমন?’
আধুনিক যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে সবকিছুই অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফটোশুট ও ফটো পাঠানোর সহজ মাধ্যমগুলোর সুবাদে বর্তমান সময়ে পাত্রীর ছবি আদান-প্রদানের ব্যাপক প্রবণতা-প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। পাত্রীর রূপের বিষয়টি মুখ্য না গৌণ, সে আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, রূপ-সৌন্দর্যে পাত্রী কতটুকু এগিয়ে বা পিছিয়ে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য পাত্রীর সন্ধান পাওয়ার বা বিয়ে সংক্রান্ত আলাপের সূচনাতেই পাত্রীর ছবি অথবা পাত্রীকে সরাসরি দেখে নেওয়া আদৌ কি উচিত বা জরুরি বিষয়? পাত্র কর্তৃক পাত্রীকে দেখে নেওয়া ব্যতীত সৌন্দর্যের ব্যাপারে ধারণা পাওয়ার কি কোন বিকল্প মাধ্যম নেই? পাত্রীর নিকটস্থ কারো মাধ্যমে কি জেনে নেওয়া যায় না যে পাত্রী দেখতে কেমন? অথবা পাত্র পক্ষের কোন মহিলার মাধ্যমে পাত্রীর গঠন-অবয়বের বর্ণনা শুনে নেওয়া কি খুব কষ্টসাধ্য কোন কাজ?
বিয়ের প্রসঙ্গ এলেই অন্যান্য সকল দিক, সকল হিসেব ছেড়ে রূপের বিষয়টি যাচাই করতে মত্ত হয়ে ওঠি আমরা, তা কতটুকু সুন্দর বা যৌক্তিক বিষয়, তার বিশ্লেষণ এখানে আমার কাম্য না হলেও আমার আপত্তি বা আক্ষেপের জায়গাটি হচ্ছে, একজন নারীর পর্দার বিষয়টিকে আমরা এতটা তুচ্ছ বা সস্তা করে দেখছি কেন? এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দিককে আমরা এতটা মূল্যহীন ও অযথা ভাবছি কেন?
সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক আলেম-উলামার মাঝেও এই প্রবণতা দেখি, বিয়ের জন্য কোন পাত্রীর সন্ধান জানলেই শুরুতেই ছবি চেয়ে বসেন! দাঁড়িয়ে ছবি, বসে ছবি, দূরের ছবি, কাছের ছবি, হাফ ছবি, ফুল ছবি!!
যদি পাত্রী বা পাত্রীপক্ষ এতে অস্বীকৃতি জানান তখন শরীয়তে পাত্রী দেখার অনুমোদনের দিকটি হাইলাইট করে এই অস্বীকৃতিকে ভর্ৎসনা করে আত্মপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন, যেন পাত্রীপক্ষের আপত্তির দিকটি অহেতুক-উদ্ভট কিছু; অতিরঞ্জন কিছু।
হ্যাঁ, আসলেই আমরা আমাদের দুর্বল ঈমান ও স্বার্থকেন্দ্রিক চিন্তাধারার প্রেক্ষিতে সচরাচর শরীয়তের যে-কোন দিককে আপন স্বার্থ ও লাভের বিবেচনায় প্রাধান্য দেই বা পিছিয়ে রাখি। এই সমাজের জন্য আর আমাদের মত মুসলমানদের জন্য এটা খুবই স্বাভাবিক একটি চিত্র।
পাত্রীকে নিরীক্ষার অজুহাতে রেস্টুরেন্ট বা পার্কে গিয়ে পাত্র-পাত্রীর সাক্ষাৎ, অবাধ আড্ডা, একান্ত আলাপ; কিংবা দীর্ঘ ফোনালাপ এসব অতি আধুনিক কার্যকলাপ একজন নারীর মূল্য ও মর্যাদার জন্য কতটা হানিকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যখন আমরা বুঝেও অবুঝ থাকতে চাই, তখন তো বলাটাও অর্থহীন। তবুও স্বস্তির কথা এতটুকু যে, সম্ভবত এ সকল বাড়াবাড়ি সমাজে প্রচলিত থাকলেও এখনো সর্বস্তরে ততোটা ব্যাপকতা পায়নি।
যে দিকটি আমাকে ভাবায়, যে স্থানটিতে আমার অস্বস্তি বোধ হয় তা হচ্ছে- কোন বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া আলাপ আসা মাত্রই পাত্রীর ছবি চেয়ে বসা হয়, বিভিন্নরকম ছবি দেখে কিংবা সপরিবারে গিয়ে খুঁটে খুঁটে পাত্রীকে পরখ-পর্যবেক্ষণ করে দৈহিক বা পারিপার্শ্বিক কোন ঠুনকো অজুহাতে আলাপটিকে অগ্রাহ্য করা হয়! যেমন, ‘পাত্রী খাটো, মোটা, কালো’ এরকম আপত্তি; অথবা ‘পর্যাপ্ত শিক্ষা নেই, বংশীয় মান মানানসই নয়, বাবার পেশার মান নিম্ন, দূরত্ব অধিক, পাত্রের বাবা বা মায়ের পাত্রীকে পছন্দ হয়নি,’ প্রভৃতি কারণ দেখিয়ে কেটে পড়া হয়। একটি বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার শরয়ী অনুমতিকে পুঁজি করে পাত্রপক্ষ থেকে এভাবেই একের পর এক পাত্রীকে দেখা এবং পাত্রীপক্ষ থেকেও একজন পাত্রীর রূপকে একের পর এক পাত্রের সামনে উন্মুক্ত করা, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা কতটা যৌক্তিক? নারীর পর্দা বিনষ্ট হওয়া বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি আমরা কি একবারও বিবেচনা করেছি? বিয়ের প্রসঙ্গকে পুঁজি করে লাগামহীনভাবে এভাবে নারী দেখা বা কোনোরকম সীমারেখার পরোয়া ব্যতীত যার যেমন ইচ্ছে তেমন করে নারীর গ্রহণযোগ্যতার বিচার করার অনুমোদন কি ইসলাম আসলেই আমাদেরকে দিয়েছে?
যদি কারো মাধ্যমে পাত্রীর দৈহিক গড়ন, রং, ওজন, উচ্চতা প্রথমেই যাচাই করা যেত, তবে অন্তত ‘না’ সিদ্ধান্তটা একজন নারীর পর্দাকে বিনষ্ট না করেই নেওয়া সম্ভব হত। ঠিক তেমনি অন্যান্য ভালো-মন্দ দিক পর্যবেক্ষণ করে প্রস্তাবের সূচনায় সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করে নিলে অন্তত পাত্রীর মর্যাদার স্থানটাকে দাগযুক্ত করতে হত না।
এবার ইসলামী শরীয়তে পাত্রী দেখার অনুমতি প্রসঙ্গে সাধারণভাবে জনমনে উত্থাপিত কিছু প্রশ্ন ও তার জবাব উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।
পাত্রীকে দেখতে হয় কখন
ইসলাম পাত্রী দেখা বৈধ করেছে, এ ব্যাপারে উৎসাহিতও করেছে। তবে দেখার পূর্বেই পাত্র বা পাত্রীর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব তথ্যাদি জেনে নেওয়া এবং উক্ত পাত্রীতে বিবাহের সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। যেন দেখার পর অন্য কোন কারণ বা উপকরণকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবকে নাকচ করে দেওয়া না হয়। অথবা বিয়ে হয়ে গেলেও যাতে কোন তথ্য বিভ্রাট কিংবা অস্পষ্টতাকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি না হয়। ইসলাম এই বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছে। বিয়ের ক্ষেত্রে কারো মাঝে থাকা দোষ-ত্রুটির উল্লেখ করলে তা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে না। উভয় পক্ষের সার্বিক দিক পর্যালোচনার পরে যখন কোন পাত্রীর বিষয়ে বিয়ের ইচ্ছে প্রবল ও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যায়, তখন সে নির্দিষ্ট পাত্রীকে দেখে নেওয়ার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। দেখার অনুমতিটি মূলত সর্বশেষ দিক। সুতরাং কাকে বিবাহ করবে, এটা দেখাদেখির পূর্বেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।
হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, ‘আমি একজন আনসারী রমণীকে বিয়ে করতে চাচ্ছি।’ এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘মেয়েটিকে দেখে নাও। কেননা আনসারীদের কারো কারো চোখে আবার সমস্যা থাকে।’ (মুসলিম, হাদীসক্রম : ১৪২৪)
হযরত মুগিরা বিন শো’বা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি জনৈক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। এটা শুনে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ?’ আমি বললাম, ‘না দেখিনি।’ তখন তিনি নির্দেশ দিলেন যে, ‘তুমি তাকে দেখে নাও। তোমার এই দর্শন তোমাদের মাঝে দাম্পত্য জীবনের প্রণয়-ভালোবাসা গভীর হওয়ার সহায়ক হবে।’ (তিরমিযী, হাদীসক্রম : ১০৮৭)
পাত্রীকে একান্তে নির্জনে দেখার বিধান
দেখাদেখির জন্য কোন নির্জন স্থানে পাত্র-পাত্রীর একান্ত অবস্থান বৈধ নয়। বরং সাক্ষাৎ কালে পাত্রীর অভিভাবক বা পাত্রের কোন মাহরাম মহিলা বা পাত্রীর মাহরাম পুরুষের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। কেননা, বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত তারা পরস্পরের জন্য বেগানাই। আর ইসলাম বেগানা নারী-পুরুষের নির্জনে একত্রিত হওয়াকে নিষিদ্ধ করেছে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কোন মহিলার সাথে তার মাহরাম ছাড়া নির্জনে অবস্থান না করে।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৩০০৬)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনে অবস্থান না করে। কারণ, এমনটি হলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (তিরমিযী, হাদীসক্রম : ১১৭৩)
পাত্রীকে কে বা কারা দেখতে পারবেন
পাত্র পক্ষের যে কোনো নারীই চাইলে পাত্রীকে দেখতে পারবেন। তবে স্বয়ং পাত্র ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষ সদস্যের জন্য পাত্রীকে দেখা বৈধ নয়। কুরআনে কারীমে নির্দেশ এসেছে—
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ
“ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে।” (সূরা নূর, আয়াতক্রম : ৩১)
হাদীস শরীফে এসেছে—
عَنْ عَبْدِ اللهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتْ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘নারী জাতি হলো আপাদমস্তক সতর। যখন সে বের হয়, তখন শয়তান তাকে চমৎকৃত করে তোলে।’ (সুনানে তিরমিযী, হাদীসক্রম : ১১৭৩; মুসনাদুল বাজ্জার, হাদীসক্রম : ২০৬৫; সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীসক্রম : ১৬৮৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীসক্রম : ৫৫৯৮)
عَنْ عَائِشَةَ: أَنَّهَا كَانَتْ تَطُوفُ بِالْبَيْتِ وَهِيَ مُنْتَقِبَةً
‘হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাযিয়াল্লাহু আনহা বাইতুল্লাহ তওয়াফ করতেন পর্দাবৃত অবস্থায়।’ (মুসন্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীসক্রম : ৮৮৫৯)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কোন নারীর জন্য সকল পরপুরুষের ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় পর্দার বিধান প্রযোজ্য। আর পর্দার উদ্দেশ্যই হলো নারীর রূপ-সৌন্দর্যকে পরপুরুষের দৃষ্টি হতে অন্তরাল রাখা।
ইসলাম ধর্মে নারীর জন্য ১৪ জন পুরুষকে মাহরাম নির্ধারণ করা হয়েছে। যারা হলেন—
(ক) বাবার সমপর্যায়ের ৪ জন— (১) বাবা, (২) চাচা, (৩) মামা, (৪) শ্বশুর।
(খ) ভাইয়ের সমপর্যায়ের ৫ জন— (৫) সহোদর ভাই, (৬) নিজ দাদা, (৭) নিজ নানা, (৮) নিজ নাতি, (৯) দুধভাই।
(গ) ছেলের সমপর্যায়ের ৫ জন— (১০) ছেলে, (১১) ভাইয়ের ছেলে, (১২) বোনের ছেলে, (১৩) মেয়ের জামাই, (১৪) দুধ-ছেলে।
এই ১৪ জন ব্যতীত সবসময় সকল পুরুষের দৃষ্টি হতে আপন সৌন্দর্যকে আবৃত-অন্তরাল রাখা নারীর জন্য ফরয। বেগানা হওয়া সত্ত্বেও পাত্রের জন্য বিয়ের পূর্বে পাত্রী দেখার অনুমতি রয়েছে, তবে সে অনুমতি পাত্র হওয়ার কারণে তার একার জন্যই বিশেষ। পাত্রের জন্য অনুমতি থাকার দ্বারা পাত্রপক্ষের অন্য কোন পুরুষ আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের সম্মুখে পাত্রীর পর্দা লঙ্ঘনের অনুমতি থাকার কোন কারণ বা যুক্তি থাকতে পারে না। এমনকি পাত্রের পিতার জন্যও বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত পাত্রীকে দেখা বৈধ নয়। হ্যাঁ, বিয়ে হয়ে গেলে সম্পর্কে শ্বশুর হওয়ার মাধ্যমে মাহরামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়াটা ভিন্ন কথা।
পাত্র পাত্রীকে কতবার বা কতটুকু সময় ধরে দেখতে পারবে
যদি পাত্র পাত্রীকে একবার দেখেই আশ্বস্ত হয়ে যায়, তবে তার জন্য একবারের অতিরিক্ত দেখা হারাম। কারণ এই দেখা হালাল করা হয়েছে অনিবার্য প্রয়োজনে। সুতরাং এখানে অনিবার্য প্রয়োজনটাই বিবেচ্য। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৩৭০)
আর সময়ের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, সেটা ক্ষণকাল বা আচমকা দৃষ্টিপাতের মত। সাহাবায়ে কেরামের জীবনী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী বিশ্লেষণ করলে পাত্রী দেখার স্থায়িত্বকাল খুব সামান্যই অনুমিত হয়। দেখার সময় কখনো প্রয়োজনীয় স্বল্প কথা হলেও দীর্ঘ আলাপচারিতার কোন উদাহরণ নেই। কাজেই পরস্পরকে জানা-বোঝার অজুহাতে দেখার সময়কালকে প্রলম্বিত করার কিংবা দীর্ঘ আলাপের কোন অনুমতি বা সুযোগ নেই।
বিয়ের জন্য যে মেয়ে দেখা যায়, এটাতেও অনেক সাহাবীয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমা অবাক হয়েছেন। হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জনৈক মেয়েকে বিবাহ করার জন্য প্রস্তাব দেই এবং বিষয়টা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছো?’ আমি বললাম, ‘না’। তিনি বললেন, ‘তুমি তাকে দেখে এসো। কারণ এ দেখাটা তোমাদের মাঝে সৌহার্দ্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে বেশ উপযোগী হবে।’ ফলে আমি মেয়েটিকে দেখার জন্য যাই। তখন তার বাবা-মা সেখানে ছিলেন এবং মেয়েটি পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। তিনি বলেন, তখন আমি বললাম, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেয়েটিকে দেখার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার এ কথায় তার বাবা-মা নীরব রইলেন।’ অন্য বর্ণনায় আছে, ‘যেন তারা আমার এ কথাকে অপছন্দ করলেন।’ (অর্থাৎ তারা বিবাহের আগে পাত্রীকে দেখানোর পক্ষে ছিলেন না।)
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মেয়েটি বললো, ‘যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য আপনাকে আদেশ করে থাকেন, তাহলে আপনার দেখার সুবিধার্থে আমি আপনার সামনে আসছি। আর যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য আপনাকে নির্দেশনা না দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি আমার দিকে দৃষ্টি দিবেন না।’ হযরত মুগীরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘এরপর আমি তাকে দেখি এবং তাকে বিবাহ করি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীসক্রম : ১৮৬৬)
পাত্রীর কতটুকু অংশ দেখা বৈধ
পাত্রের জন্য কনের শুধু মুখ ও উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখা বৈধ। আবৃত অবস্থায় শরীরের সামগ্রিক অবয়ব দেখে নিলেও অসুবিধা নেই। ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে, ‘চেহারা এবং হাতসহ পা দেখাও বৈধ।’ (আল জাওহারাতুন নায়্যিরাহ, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ১৬৩; আল-মাবসুত লিসারাখসী, খণ্ড : ১২, পৃষ্ঠা : ৩৭১)
আর মহিলারা পাত্রী দেখলে সতরের অংশটুকু বাদ দিয়ে শরীরের যে কোনো অংশ দেখতে পারবেন। কোনো অঙ্গের ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দিলে শালীনতা বজায় রেখে সেটাও পরখ করার অনুমতি রয়েছে। (হিদায়া, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা ৪৪৩; আল মুগনী, খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ৭৪)
পাত্রী সাজগোজ করতে পারবে কিনা
পাত্রীর জন্য গঠন-অবয়বে পরিবর্তন সাধন করে না এমন যে কোন সাজগোজ গ্রহণের অনুমতি রয়েছে। তবে তাও যেন সীমাতিরিক্ত না হয় যাতে পাত্রীর রূপ-সৌন্দরে্যর ব্যাপারে ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়ে পাত্রপক্ষের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে, সুবাইয়াহ বিনতে আবি বারযাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর স্বামী ইন্তেকালের পর দ্বিতীয় বিয়ের সময়, যখন আবু সানাবেল রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন, ঐ সময়ে তিনি খেজাব লাগিয়েছিলেন ও সুরমা দিয়েছিলেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদীসক্রম : ২৭৪৩৮)
এর দ্বারা প্রতীয়মান হয়, আকৃতির পরিবর্তন ব্যতীত সাধারণ সাজগোজের দ্বারা নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার অনুমতি রয়েছে।
ইসলাম প্রদত্ত পাত্রী দেখার পদ্ধতিটি সূক্ষ¥ভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের মত এই ক্ষেত্রটিতেও ইসলাম নারীকে কতটা সম্মানের সাথে মূল্যায়ন করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ইসলামী নির্দেশনাগুলোকে তার স্থলে অব্যবহৃত রেখে ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবন থেকে প্রাপ্ত স্বার্থকেন্দ্রিক রীতিনীতিগুলোকেই আমরা ধারণ ও পালন করি।
সাধারণ মুসলমান তো বটেই, আমরা যারা দ্বীনী শিক্ষা অর্জন বা দানের সাথে জড়িত, কিংবা আমরা যারা নিজেকে শরয়ী বিধানাবলির চর্চাকারী বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি, আমরাও পাত্রী দেখাসহ বিয়ে সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ে শরয়ী বিধানকে জানার ও বোঝার ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে উদাসীন। তদুপরি আমাদের মাঝে জেনে-বুঝেও সমাজের প্রচলিত রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে শরীয়তের বিধানকে উপেক্ষা করার লজ্জাজনক প্রবণতা দেখা যায়। যা খুবই আক্ষেপ ও অনুতাপের বিষয়।
অবশেষে আল্লাহ পাকের শাহী দরবারে আমাদের সামগ্রিক দুর্বলতার জন্য ক্ষমা, তাঁর সকল আদেশ-নিষেধের আন্তরিক আনুগত্য ও পরিপূর্ণ হিদায়াত কামনা করছি।