সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
হাদীসে জিবরাঈল–এর তরজমা
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ একজন আগন্তুক এসে উপস্থিত হলো। তাঁর পরিধেয় পোশাক ছিল ধবধবে সাদা, (মাথার) চুল ছিল কুচকুচে কালো। তাঁর গায়ে সফরের কোনো চিহ্ন দৃষ্ট হয়নি। অথচ আমাদের মধ্য হতে কেউই তাঁকে চিনতে পারেনি। অবশেষে লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে এসে বসল এবং তার হাঁটুদ্বয়কে রাসূলের হাঁটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে এবং তার দু হাত তাঁর দু উরুর উপর রাখল। অতঃপর লোকটি বলতে লাগল, ‘হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘ইসলাম হচ্ছে-তুমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল, নামায প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত আদায় করবে, রামাদান মাসের রোযা রাখবে এবং পথ খরচে সামর্থ্য হলে হজ পালন করবে।’ রাসূলের জবাব শুনে লোকটি বলে উঠল, ‘আপনি সত্যিই বলেছেন।’
বর্ণনাকারী (উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম যে, লোকটি (অজ্ঞের মতো) প্রশ্ন করছে এবং (বিজ্ঞের মতো) উত্তরের সত্যায়ন করছে। লোকটি পুনরায় বলল, ‘আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, ‘ঈমান হচ্ছে-আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ রাসূলগণ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।’ জবাব শুনে আগত লোকটি বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’ এরপর লোকটি বলল, ‘আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।’ জবাবে রাসূল বললেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তাহলে বিশ্বাস রাখবে যে, তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।’ অতঃপর লোকটি বলল, ‘আমাকে কিয়ামাত সম্পর্কে অবহিত করুন।’ রাসূল বললেন, ‘এ বিষয়ে যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি অবহিত নয়।’ সে বলল, ‘তাহলে আমাকে কিয়ামাতের নিদর্শন সম্পর্কে অবহিত করুন।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তার নিদর্শন হচ্ছে-দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে, তুমি দেখতে পাবে যে, যাদের পায়ে জুতা ও পরনে কাপড় ছিল না, নিঃস্ব ও বকরির রাখাল, তারা বড় বড় প্রাসাদ তৈরিতে পরস্পর প্রতিযোগিতা করছে।’
উমর বলেন, এরপর লোকটি চলে গেল এবং বেশ কিছু সময় আমরা হতভম্ব হয়ে বসে থাকলাম। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, ‘হে উমর! তুমি কি জানো প্রশ্নকারী লোকটি কে?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।’ রাসূল বললেন, ‘লোকটি হলেন জিবরাঈল আ.। তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য আগমন করেছেন।’ (মিশকাত, হাদীস-ক্রম : ২)
হাদীসে জিবরাঈলের পরিচয়
আলোচ্য হাদীসটি মিশকাত শরীফের ঈমান অধ্যায়ের প্রথম হাদীস। হযরত জিবরাঈল আ.-এর স্বশরীরে অবস্থান ও তাঁর প্রশ্নের মাধ্যমে এ হাদীসটির অবতারণা হয়েছে বলে একে হাদীসে জিবরাঈল বলা হয়। এ হাদীসকে উম্মুস সুন্নাহ (হাদীসের মূল) নামে নামকরণ করা হয়। কেননা, এ হাদীসে সমস্ত হাদীসের সার-নির্যাস উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনিভাবে সূরা ফাতিহায় সমস্ত কুরআনের সার-নির্যাস থাকায় তাকে উম্মুল কুরআন বা কুরআনের মূল বলা হয়।
إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ : জিবরাঈল আ.–এর আগমন
আরবী ভাষায় কারো আগমন বোঝানোর জন্য جَاءَ অথবা أَتَى শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জিবরাঈলের আগমন প্রকাশের জন্য جَاءَ ব্যবহার না করে طَلَعَ ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ আগমন করা নয়; বরং উদিত হওয়া। তিনি এটি এজন্য ব্যবহার করেছেন যে, আগমনকারী কোনো মানুষ ছিলেন না; বরং নুরের সৃষ্টি ফেরেশতা ছিলেন। মানুষ আগমন করে, আর নূর বা আলো উদিত হয়। সূর্য যেহেতু আলো ছড়ায়; বিধায় সূর্যের ক্ষেত্রে جَاءَتِ الشَّمْسُ ব্যবহার হয় না; বরং طَلَعَتِ الشَّمْسُ ব্যবহার হয়। মোটকথা, আগমনকারী যেহেতু নূরের সৃষ্টি ফেরেশতা ছিলেন, তাই উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ (হঠাৎ আমাদের সামনে এজন লোক উদিত হলেন) বলেছেন।
শিক্ষকের সামনে ছাত্র কীভাবে বসবে?
জিবরাঈল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আগমন করলেন এবং বসে পড়লেন। তিনি কীভাবে বসেছেন? উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
فَأَسْنَدَ رُكْبَتَيْهِ إِلَى رُكْبَتَيْهِ وَوَضَعَ كَفَّيْهِ عَلَى فَخِذَيْهِ
অর্থাৎ জিবরাঈল আ. তাঁর দুই হাঁটুকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাঁটুর দিকে ফিরিয়ে নিজের রানের উপর দুই হাত রেখে আদবের সাথে বসেছিলেন। এর দ্বারা জিবরাঈল আ.-এর উদ্দেশ্য ছিল এটা শিক্ষা দেওয়া যে, শিক্ষকের সামনে ছাত্রকে এভাবে বসতে হয়।
وَقَالَ يَا مُحَمَّدُ : হে মুহাম্মাদ বলার বিধান
জিবরাঈল আ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ‘হে মুহাম্মাদ’ বলে সম্বোধন করেছেন, অথচ রাসূলকে এভাবে সম্বোধন করা নিষেধ, যা শিষ্টাচার-পরিপন্থী। এর জবাবে মুফাসসিরীন এবং মুহাদ্দিসীন বলেন, নিষেধাজ্ঞা শুধু মানুষের জন্য; ফেরেশতাগণ এ-নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নন।
নবী–পত্নীগণের বিশেষত্ব : রাসূলকে ‘হে মুহাম্মাদ’ বলে ডাকা শুধু উম্মতের জন্য নিষেধ; ফেরেশতাদের জন্য নিষেধ নয়। এর ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হবে। কুরআনুল কারীমের ইরশাদ হয়েছে-
﴿ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَرْفَعُوْۤا اَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِیِّ وَلَا تَجْهَرُوْا لَهٗ بِالْقَوْلِ کَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ اَنْ تَحْبَطَ اَعْمَالُكُمْ وَ اَنْتُمْ لَا تَشْعُرُوْنَ ﴾
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠের উপর তোমাদের কণ্ঠ উঁচু করো না এবং তোমরা নিজেরা পরস্পর যেমন উচ্চকণ্ঠে কথা বলো, তাঁর সাথে সেরকম উচ্চকণ্ঠে কথা বলো না। এ আশঙ্কায় যে, তোমাদের সকল আমল নিস্ফল হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।” (সূরা হুজরাত, আয়াত-ক্রম : ২)
আমাদের আকাবির ও আসলাফ বলেন যে, কুরআনের এ নির্দেশটি সাধারণ উম্মতের জন্য প্রযোজ্য; নবী-পত্নীগণ এ নির্দেশের আওতাভুক্ত নন। তাঁরাও উম্মত; কিন্তু তাঁদের আধিকার আর আমাদের অধিকার এক নয়। রাসূলের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু নবী-পত্নীগণের এ অধিকার রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেন, ‘তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট, নাকি অসন্তুষ্ট সেটা আমি তোমার কথা থেকে বুঝতে পারি।’ আয়েশা বললেন, ‘কীভাবে?’ রাসূল বললেন, ‘তুমি সন্তুষ্ট থাকলে বলো- وَرَبِّ مُحَمَّدٍ -মুহাম্মাদের প্রভুর শপথ। তখন আমি বুঝে নিই যে, তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট। আর অসন্তুষ্ট থাকলে এভাবে বলো- وَرَبِّ إِبْرَاهِيْمَ -ইবরাহীমের প্রভুর শপথ। তখন আমি বুঝতে পারি যে, আজ আয়েশা আমার প্রতি অসন্তুষ্ট।’ (বুখারী, হাদীস-ক্রম : ৫২২৮)
এরকম কেন? কারণ, তাঁরা উম্মতও আবার স্ত্রীও বটে। আর স্ত্রীদের বিষয়টি সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা।
ইসলাম কী?
জিবরাঈল আ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললেন, ‘আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন (ইসলাম কাকে বলে?)।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের পরিচয় দিতে গিয়ে পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন-
اَلْإِسْلَامُ : أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ، وَتُقِيْمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ، وَتَصُوْمَ رَمَضَانَ، وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيْلًا.
‘ইসলাম হচ্ছে- তুমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল, নামায প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে, রামাদান মাসের রোজা রাখবে এবং পথ খরচে সামর্থ্য হলে হজ পালন করবে।’
এ পাঁচটি বিষয়কে বলা হয় ইসলামের রোকন বা স্তম্ভ। অর্থাৎ কালেমা, নামায, যাকাত, রোযা এবং হজ-এগুলো হলো ইসলামের স্তম্ভ।
হজের ক্ষেত্রে সামর্থ্যবান হওয়ার শর্তারোপ করা হল কেন?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ইসলাম হলো-কালেমা পড়া, নামায আদায় করা, যাকাত দেওয়া, রোযা রাখা; কিন্তু হজের কথা বলার সময় বলেছেন-সামর্থ্যবান হলে হজ করবে। প্রশ্ন হলো, সব বিষয়ে তো সামর্থ্য থাকা শর্ত। কেননা,
* কালেমা তখন পড়বে, যখন সামর্থ্য থাকবে। সামর্থ্য না থাকলে পড়বে না।
* নামায পড়বে, যখন নামায পড়ার সামর্থ্য থাকবে। সামর্থ্য নেই, তো পড়বে না।
* জাকাত দেবে, যখন সামর্থ্য থাকবে। সামর্থ্য নেই, তো দেবে না।
* রোজা রাখবে সামর্থ্য থাকলে। সামর্থ্য না থাকলে রাখবে না।
সুতরাং কালেমা, নামায, রোজা এবং জাকাতের ক্ষেত্রেও সামর্থ্য থাকা চাই। কিন্তু শুধু হজের ক্ষেত্রে কেন বললেন-‘যদি তোমার হজ করার সামর্থ্য থাকে, তাহলে হজ করবে?’ এর কারণ হলো, কালেমা, নামায, রোযা এবং যাকাত হলো মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। এগুলো ব্যক্তিসত্তার সাথে জড়িত। কিন্তু হজ এমন একটি ফরয বিধান যে, ব্যক্তি বিবাহিত হলে সেটা ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত থাকে না; বরং বিবি-বাচ্চাদের সাথেও সম্পৃক্ত থাকে। হজে তখন যাবে, যখন নিজের জন্য সফর-সামগ্রীও থাকবে এবং ঘরে বিবি-বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে। হজে যাওয়ার মতো টাকা আছে; কিন্তু এ টাকা দিয়ে হজ করলে বিবি-বাচ্চা ক্ষুধার্ত থাকবে; অন্যদের কাছে হাত পাতবে। এমন পরিস্থিতিতে হজ ফরয হয় না। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তুমি হজ করবে, যখন হজে যাওয়ার মতো তোমার সামর্থ্য আছে।’ অর্থাৎ তুমি হজে গেলেও তোমার বিবি-বাচ্চা চলার মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা আছে। আমরা সাধারণত নিজের অবস্থা দেখি; কিন্তু বিবি-বাচ্চাদের প্রতি তেমন একটা খেয়াল রাখি না। তাই নিজের খরচেরও টাকা থাকতে হবে এবং ঘরে বিবি-বাচ্চার খরচেরও টাকা থাকতে হবে।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : গনীমতের মাল হালাল হওয়া
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমার জন্য গনীমতের (যুদ্ধলব্ধ) সম্পদ হালাল করা হয়েছে।’
গনীমতের মাল হালাল হওয়ার তাৎপর্য হলো, মুসলমানগণ যুদ্ধের ময়দানে কাফেরদের সাথে জিহাদ করে বিজয় লাভের পর শত্রুবাহিনীর যে সম্পদ তাদের হস্তগত হয়, তা-ই হলো গনীমতের মাল। পূর্বেকার নবীগণের জন্য গনীমতের মাল হালাল ছিল না। মূসা আ.-এর কওম জিহাদ করেছিল; কিন্তু গনীমতের মাল তাদের জন্য হালাল ছিল না। তদ্রুপ পূর্বেকার নবীগণের জন্য এই নিয়ম ছিল যে, যুদ্ধে যে গনীমতের মাল অর্জন করা হতো, তা একটি স্থানে জমা করা হতো এবং আকাশ থেকে অগ্নি এসে তা জ্বলিয়ে দিত। এটা ছিল জিহাদ কবুল হওয়ার লক্ষণ। অন্যথায় জিহাদ কবুল হয়নি বলে গণ্য করা হতো।
মাকবূল হজের লক্ষণ–কঙ্কর গায়েব হয়ে যাওয়া
অনুরূপ একটি মুজিযা আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও রয়েছে। তাঁর দুটি মুজিযা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। একটি হলো আল-কুরআন, আর দ্বিতীয়টি হলো, যাদের হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে জামারাতে তাদের নিক্ষিপ্ত কঙ্করগুলো নিজে নিজে গায়েব হয়ে যায়; তা উঠিয়ে ফেলতে হয় না। এখন লোকেরা আশ্চর্যবোধ করে যে, কিছু কিছু পাথর তো সরাতে হয়। আমি বলি, সুদের টাকা দ্বারা হজ করলে কঙ্কর গায়েব হয় না; বরং তা সরাতে হয়। হজ যখন ইবাদাত না হয়ে ফ্যাশন হবে, তখন কঙ্কর নিজে নিজে গায়েব হয় না; বরং সরাতে হয়।
গনীমতের মাল হালাল ও পবিত্র
যাই হোক, আমি বলছিলাম যে, পূর্বেকার নবীগণের শরীয়তে গনীমতের মালের এই বিধান ছিল যে, তা নির্দিষ্ট একটি স্থানে সমবেত করা হতো এবং আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বলিয়ে ফেলত। এটা ছিল জিহাদ কবুল হওয়ার আলামত। কিন্তু আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানার্থে তাঁর শরীয়তে গনীমতের মাল হালাল ও পবিত্র করা হয়েছে। ব্যবসায়ী ব্যবসার মাধ্যমে যে হালাল মাল উপার্জন করে, তা সম্ভবত এতো পবিত্র নয়, যতটুকু গনীমতের মাল পবিত্র। কেননা, কুরআনে গনীমতের মালের জন্য দুটি শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে- حَلَالًا طَيِّبًا অর্থাৎ গনীমতের মাল হালালও আবার পবিত্রও। আজ আমরা আশ্চর্য হচ্ছি এ কারণে যে, এ আমলটি আমাদের থেকে উঠে গেছে। তাই আমরা এ বিষয়টি শোনামাত্র আশ্চর্যবোধ করি, আমল করা তো দূরের বিষয়।
গনীমতের মাল হালাল হওয়ার কারণ
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কী পরিমাণ সম্মান-একটু ভাবুন! পূর্বেকার নবীগণের জন্য গনীমতের মাল ব্যবহার করা হালাল ছিল না; কিন্তু আমাদের নবীজি সা.-এর জন্য তা হালাল। এর কারণ হল, পূর্বেকার নবীগণ একেকজন ছিলেন একেকটি এলাকার নবী। তাঁরা ব্যবসাও করেছেন, আবার জিহাদও করেছেন। কিন্তু আমাদের নবী নির্দিষ্ট এলাকার নবী নন, তিনি হলেন সমগ্র বিশে^র নবী। তাই তাঁর উম্মত জিহাদে বের হলে এমনও পরিস্থিতি দেখা দেবে যে, জিহাদে বের হলে ব্যবসা চলবে না, আর ব্যবসায় বসে থাকলে জিহাদ চলবে না। এ রকম তো নয় যে, জিহাদে চলে গেলে পেছন থেকে টাকা পৌঁছবে। এখন এ জাতি কী করবে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদেরকে পেছন দিক থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিলেন। তারা জিহাদের জন্য যেখানে যাবে সেখানে তাদের উপার্জন করতে হবে না; বরং উপার্জন করবে কাফের-মুশরিকরা, আর মুসলমানগণ তা ভোগ করবে। আল্লাহ তাআলা নবীজি সা.-এর উম্মতকে এই মর্যাদা দান করেছেন যে, তারা নিজ বাড়ি থেকে বের হবে; কিন্তু পেছন থেকে টাকা-পয়সা আসার প্রয়োজন নেই। কেননা, আমাদের প্রিয় নবী সা.-এর নবুওয়তের পরিধি ব্যাপক তথা বিশ্বের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ব্যপ্ত। এ জন্যেই সাহাবীগণ মদীনা থেকে বের হয়েছেন এবং সমুদ্রের শেষ কিনারায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, আমরা যতটুকু আসার ছিল এসেছি, এর সামনে যাওয়া আমাদের সাধ্য নেই।
এখন বলুন! সাহাবী আফ্রিকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হয়েছেন। তাহলে মদীনার সম্পদ আফ্রিকায় পৌঁছবে কীভাবে? মদীনা থেকে বের হয়েছেন, গন্তব্য খোরাসান। এখন মদীনার ব্যবসার টাকা সেখানে পৌঁছবে কীভাবে? এটা তো সম্ভব ছিল না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই দয়া করলেন যে, তিনি গনীমতের মাল হালাল করে দিয়েছেন যে, এখন পেছন থেকে জিহাদের ময়দানে টাকা-পয়সা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন এই কাফেরদের উপার্জিত অর্থ-সম্পদ নিজেরাও খাও এবং নিজেদের বাড়িতেও দাও। তোমাদের এ সন্দেহ যেন না হয় যে, এ অর্থ-সম্পদ হারাম; বরং এ অর্থ-সম্পদ হালালও, আবার পবিত্রও বটে। পূর্বের নবীগণের প্রয়োজন ছিল না; বিধায় তাদের জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হয়নি। পক্ষান্তরে আমাদের নবীর প্রয়োজন ছিল; বিধায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর জন্য গনীমতের মাল হালাল করে দিয়েছেন। আমাদের নবীজির জন্য হালাল কেন? কারণ, তিনি হলেন শেষ নবী। তাঁর পরে কোনো নবী সৃষ্টি হবেন না। তাঁর উম্মতগণ জিহাদের জন্য দূর থেকে বহুদূর যাবে। সেখানে উপার্জন করবে কীভাবে? তাই আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন যে, কাফেররা উপার্জন করবে, আর তোমরা তাদের উপার্জিত অথ-সম্পদ ভোগ করবে।
তোমাদের খুন মিষ্ট
হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। তিনি এক যুদ্ধে ছিলেন মুসলমানদের কমান্ডার। সামনে ছিল ইরানের শত্রুবাহিনী। তাদের কমান্ডার বলল, ‘খালিদ! একটি কথা বলো, তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছ, তোমরা এই দুর্বল তরবারি দ্বারা যুদ্ধ করবে কীভাবে?’ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ বললেন, ‘যুদ্ধ তরবারি দ্বারা হয় না; যুদ্ধ হয় বাহুর শক্তি দ্বারা।’ সে বলল, ‘তোমরা এখানে এসেছ কেন?’ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ জবাব দিলেন, ‘শুনেছি তোমাদের খুন মিষ্ট। তাই আমরা এখানে এসেছি।’ এটা যুদ্ধের ময়দানের কথা; তাহাজ্জুদের কথা নয়। আমরা বড়ই আজীব লোক, আমরা কেবল সাহাবীগণের ক্রন্দন, তাকওয়া এবং রাতের তাহাজ্জুদ দেখি; কিন্তু তাঁরা যে জিহাদের ময়দানে ছিলেন অশ্বরোহী-সেটা দেখি না। তাঁদের জীবনের শুধু একটি দিক না দেখে সকল দিক দেখা আমাদের জন্য বাঞ্ছনীয়। তাঁরা ছিলেন-রাতের বেলায় ইবাদাত-গুজার আর দিনের বেলায় অশ্বরোহী।
সেই কমান্ডার খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু আনহুক জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তোমরা মদীনা থেকে এখানে এসেছ, তোমাদের রশদপত্র কি মদীনা থেকে এখানে আসবে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আসবে না।’ প্রশ্ন করল, ‘তোমাদের কি অস্ত্রশস্ত্র মদীনা থেকে আসবে?’ তিনি বললেন, ‘না, আসবে না।’ সে আবার প্রশ্ন করল, ‘তাহলে খাবার কি মদীনা থেকে আসবে?’ তিনি বললেন, ‘না, আসবে না।’ কমান্ডার বলল, ‘তাহলে তোমরা কোন ভরসায় এখানে এলে?’ খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ চমৎকার জবাব দিলেন-‘সাহায্য মদীনা থেকে আসে না; সাহায্য আসে আকাশ থেকে। আমি স্বচক্ষে তা দেখতে পাচ্ছি।’ (তারীখে দিমাশক, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠাক্রম : ৯৬)
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : সমস্ত জমিন পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমার জন্য সমস্ত জমিন পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
পূর্বেকার নবীগণের জন্য তায়াম্মুমের অনুমতি ছিল না। একমাত্র উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য তায়াম্মুমের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। পূর্বেকার নবীগণের উম্মতেরা পানি দ্বারা ওযু-গোসল করতে হতো। তায়াম্মুমের কোনো বিধান ছিল না। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য পানির অবর্তমানে ওযু-গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করার সুযোগ রয়েছে। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার জন্য সমস্ত জমিন পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ পূর্বের উম্মতরা পানি দ্বারা যে কাজ সম্পন্ন করেছে, এই উম্মত সেই কাজ মাটি দ্বারাও সম্পন্ন করছে। এর কী প্রয়োজন ছিল? পূর্বেকার একেক নবী একেক জনপদে প্রেরিত হয়েছিলেন। আর জনপদে অবশ্যই পানি থাকে। যে জনপদে পানি নেই সেই জনপদ ‘জনপদ’ নয়। মানুষের বসবাসের উপযুক্ত স্থানকেই জনপদ বলে। বসবাসের উপযুক্ত না হলে সেটা জনপদ নয়। আর বসবাসের উপযুক্ত হতে হলে সেখানে অবশ্যই পানি থাকতে হবে।
মোটকথা, পূর্বের নবীগণ ছিলেন নির্দিষ্ট একটি এলাকার নবী। অতএব, যে নবী যে এলাকায় থাকবেন সেই এলাকায় পানি থাকবে। তাই তাঁদের জন্য তায়াম্মুমের প্রয়োজন ছিল না। পক্ষান্তরে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দিষ্ট কোনো এলাকার নবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের নবী। অর্থাৎ আমাদের নবী এবং পূর্বেকার নবীদের মধ্যে পার্থক্য হলো, পূর্বেকার নবীগণ ও তাঁদের উম্মতরা নিজের এলাকায় নামাজ আদায় করতেন। এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। পক্ষান্তরে উম্মতে মুহাম্মাদীগণকে সেখানেও যেতে হয়, যেখানে পানি নেই অথবা পানি আছে; কিন্তু ওযু-গোসলের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাহলে এই উম্মত কী করবে? তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দয়া করেছেন যে, ওযু-গোসলের প্রয়োজন; কিন্তু পানি নেই, এ ক্ষেত্রে ওযু-গোসলের পরিবর্তে মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও। এটা তোমাদের বৈশিষ্ট্য।
মক্কায় ক্ষেত–কৃষি হয় না
এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, হযরত ইবরাহীম আ. স্বীয় স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈলকে মক্কার মরুপ্রান্তরে রেখে যাওয়ার সময় দুআ করেছিলেন,
رَبَّنَاۤ اِنِّیْۤ اَسْکَنْتُ مِنْ ذُرِّیَّتِیْ بِوَادٍ غَیْرِ ذِیْ زَرْعٍ عِنْدَ بَیْتِكَ الْمُحَرَّمِ ۙ
তরজমা : হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে। (সূরা ইবরাহীম, আয়াত-ক্রম : ৩৭)
ইবরাহীম আ. এখানে غَیْرِ ذِیْ زَرْعٍ বলেছেন। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আমার পরিবার-পরিজনকে এমন স্থানে রেখে যাচ্ছি, যেখানে ক্ষেত-কৃষি হয় না। মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন, ইবরাহীম আ. غَیْرِ ذِیْ زَرْعٍ বলেছেন; غَیْرِ ذِیْ مَاءٍ বলেননি। অর্থাৎ এ কথা বলেছেন যে, এখানে ক্ষেত-কৃষি হয় না; কিন্তু এরূপ বলেননি যে, এখানে পানি নেই। আজও মক্কায় ক্ষেত-কৃষি নেই। কিন্তু পানি আজও সেখানে আছে। মক্কা ক্ষেত-কৃষির অনুপযুক্ত হলেও পানির উপযুক্ত ছিল। আজও মক্কা থেকে গোটা বিশ্বে পানি সাপ্লাই হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য জায়গা থেকে মক্কায় তরি-তরকারি রপ্তানি হচ্ছে, আর মক্কা থেকে বিশ্বে পানি সাপ্লাই হচ্ছে। মক্কা একটি জনপদ, আর জনপদে পানি থাকতে হয়। পানি ছাড়া জনপদের কল্পনা করা যায় না। পূর্বেকার নবীগণ যেহেতু নির্দিষ্ট জনপদে প্রেরিত হয়েছিলেন, তাই তাঁদের জন্য তায়াম্মুমের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আমাদের নবীজি হলেন গোটা বিশ্বের নবী। তাঁর উম্মত বিশ্বের আনাচে-কানাচে বিচরণ করবে। তাদেরকে এমন স্থানেও যেতে হবে যেখানে পানি নেই। এ ক্ষেত্রে তাদের তায়াম্মুমের প্রয়োজন পড়বে বিধায় মহান আল্লাহ এ উম্মতের জন্য তায়াম্মুমের বিধান নাযিল করেছেন।
কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াবের প্রমাণ
আমরা পরস্পর আলোচনা করে থাকি যে, কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে এর সওয়াব মৃতকে বখশিয়ে দিতে পারবে কি না? এক কথায় কুরআন তিলাওয়াত করে ঈসালে সওয়াব জায়েয আছে কি না? আমরা এর উত্তরে বলি, বান্দা কুরআন পড়ে এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে বখশিয়ে দিতে পারবে। আল্লাহ তাআলা এই সওয়াব মৃতকে দান করবেন। উল্লেখ্য যে, বান্দা নিজের আমলের প্রতিদান নিজে গ্রহণ করলে সেটাকে ‘সওয়াব’ বলা হয়। পক্ষান্তরে নিজে আমল করে এর প্রতিদান অন্যকে দিলে সেটাকে বলা হয় ‘ঈসালে সওয়াব’ (সওয়াব বখশিয়ে দেওয়া)।
এবার আমাদের জানার বিষয় হলো, কুরআনের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াবের প্রমাণ কী? একটু মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর দিন একটি পশু জবাই করলেন আর বললেন, ‘হে আল্লাহ! এই কুরবানী আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মধ্যে যে কুরবানী দিতে পারেনি তার পক্ষ থেকে।’ [মুসনাদু আহমাদ ইবনি হাম্বাল, হাদীস-ক্রম : ১৪৮৯৩]
এবার বলুন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর পশু জবাই করে এর সওয়াব উম্মতকেও বখশিয়ে দিয়েছেন কি না? (অবশ্যই দিয়েছেন)। তিনি মাংস দেননি; বরং দিয়েছেন এর সওয়াব। সুতরাং মাংসের সওয়াব পৌঁছতে পারলে কুরআনের সওয়াব পৌঁছতে পারবে না কেন?
যদি তিনি কুরআন পড়ে এর সওয়াব বখশিয়ে দিতেন, তাহলে মাংসের সওয়াব পৌঁছবে কি না, তা বুঝা যেত না। কিন্তু তিনি মাংসের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াবের মাসআলা শিখিয়ে দিয়েছেন। এতে আপনাআপনিই কুরআনের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াবের মাসআলা বোঝা গেল। একটি মাসআলা বলে দিয়েছেন, এতে আরেকটি মাসআলা আপনাআপনি সাব্যস্ত হয়ে গেল। (এটাই জাওয়ামিউল কালিম, যা নবীজির অনন্য এক বৈশিষ্ট্য)।
শিং, পশম ও খুরের সওয়াব বর্ণনা করার দ্বারা মাংসের সওয়াব আপনাআপনি বুঝে আসা
তদ্রুপ একটি হাদীস আপনি শুনে থাকবেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা সূত্রে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর ফযীলত সম্পর্কে বলেছেন, ‘কুরবানীর দিন (পশু জবাইয়ের মাধ্যমে) রক্ত প্রবাহিত করা অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় মানুষের কোনো আমল নেই। কিয়ামাতের দিন উক্ত পশু তার শিং, পশম ও পায়ের খুর-সব নিয়ে উপস্থিত হবে। [জামে তিরমিযী, কুরবানীর ফযীলত অধ্যায়]
হাদীসের ভাবার্থ হলো, বান্দা কুরবানীর দিন যে পশু আল্লাহর নামে জবাই করেছে, আল্লাহ তাকে ওই পশুর শিংয়েরও সওয়াব দেবেন, এর পশমেরও সওয়াব দেবেন এবং খুরেরও সওয়াব দেবেন। (সুবহানাল্লাহ!)
এবার বলুন, কুরবানী দিলে কেউ কি এর পশম, শিং কিংবা খুর খায়? নিশ্চয় না! খায় বরং পশুর মাংস। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাংসের সওয়াব না বলে পশমের সওয়াব বলেছেন। কেন? এর কারণ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি কলিজা কিংবা মগজের সওয়াব বলতেন, তাহলে পশমের সওয়াব বুঝে আসত না। এ কথা যে-কারো বলার সুযোহ থাকত যে, ‘ভাই! কলিজা তো খাবারের বস্তু! এটা নিজেও খাওয়া যায় এবং অপরকেও আহার করানো যায়। তাই এর সওয়াব অবশ্যই হবে। কিন্তু পশম তো খাওয়া যায় না। তাহলে এর কি কোনো সওয়াব নেই?’ তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাংসের সওয়াব না বলে শিং, পশম ও খুরের সওয়াব বলে দিয়েছেন। এতে মাংসের সওয়াব এমনিতেই বোঝা গেছে।
এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনন্য বৈশিষ্ট্য ‘জাওয়ামিউল কালিম’। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে জাওয়ামিউল কালিম (তথা স্বল্প কথা অথচ ব্যাপক অর্থবোধক) কথা বলার যোগ্যতা দান করা হয়েছে।’ তিনি একটি হাদীস বলেন, আর তা থেকে মাসআলা বের হয় একাধিক। প্রশ্ন হতে পারে যে, ‘জাওয়ামিউল কালিম’ কেবল আমাদের নবীজির বৈশিষ্ট্য কেন? পূর্বেকার নবীগণকেও কেন তা দেওয়া হয়নি? এর জবাব হলো, হাদীসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার মাধ্যমে নবীগণের আগমনের সিলসিলার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। (আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না)।’ অর্থাৎ তিনি হলেন শেষ নবী। তাই কিয়ামাত অবধি সময়ের জন্য তাঁকে এমন কিছু কথা দান করা হয়েছে যে, সেগুলো নিয়ে যুগ যুগ ধরে গবেষণা চলবে এবং মাসআলা-মাসাইল বের করা হবে। এ ক্ষেত্রে না কোনো নবীর প্রয়োজন, আর মাসআলা বের করার জন্য না কোনো অতিরিক্ত শব্দ-ভাণ্ডারের প্রয়োজন। এটা আমাদের নবীর বিশেষ মর্যাদা। শব্দ-ভাণ্ডার মজুদ আছে, তুমি কেবল মাসআলা বের করতে থাকো!
হাদিস–ভাণ্ডার থেকে মাসআলা বের করবেন কে?
এবার একটি কথা লক্ষ করুন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে হাদীসের যে বিশাল ভাণ্ডার দান করেছেন, সেগুলো থেকে মাসআলা বের করবেন কে? যে-কারো এই সামর্থ্য নেই যে, সে হাদীসের গভীরে পেঁৗছে মাসআলা বের করবে। দেখুন, আল্লাহ তাআলা ভূ-গর্ভে এই পরিমাণ পানি রেখেছেন যে, কিয়ামাত পর্যন্ত আগত লোক তা থেকে পানি বের করতে থাকবে; কিন্তু না পানি শেষ হবে, আর না নতুন কোনো জমিনের প্রয়োজন পড়বে। বরং এই জমিনের গর্ভেই পানি মজুদ করা আছে। এভাবে কিয়ামাত পর্যন্ত যে পরিমাণ পেট্টোলের প্রয়োজন ছিল, সেই পরিমাণ পেট্টোল তিনি রেখে দিয়েছেন জমিনের গভীরে। এর জন্য নতুন কোনো জমিনের প্রয়োজন পড়বে না এবং পেট্টোলও শেষ হবে না। তদ্রুপ কিয়ামাত পর্যন্ত মানুষের যে পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন ছিল, সেই পরিমাণ গ্যাস তিনি রেখে দিয়েছেন মাটির নিচে।
এই জমিন যেহেতু কিয়ামাত পর্যন্ত থাকবে, তাই কিয়ামাত পর্যন্ত যতটুকু পানির প্রয়োজন, ততটুকু পানি তিনি তাতে মজুদ করে রেখেছেন। যতটুকু পেট্টোলের প্রয়োজন, ততটুকু পেট্টোল মাটির নীচে রেখেছেন। নতুন জমিন আর আবিষ্কৃত হবে না; বরং এই জমিনের নিচেই মজুদ রয়েছে এ সকল পদার্থ। ঠিক তদ্রুপ কোনো নতুন নবী যেহেতু আর আসবেন না; বরং কিয়ামাত পর্যন্ত যত মাসআলার প্রয়োজন পড়বে, এই শেষ-নবীর (রেখে যাওয়া) শব্দ-ভাণ্ডারের গভীরেই রয়েছে সে-সকল মাসআলা। এখন কেবল মাসআলা আবিষ্কারক থাকা চাই, যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস-ভাণ্ডার থেকে মাসআলা বের করবেন। এটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। মাসআলা বের করাকে ‘ফিকহ’ বলা হয়। আর যিনি বের করেন তাঁকে ‘ফকীহ’ বা ‘মুজতাহিদ’ বলা হয়।
ফকীহ–এর কাজ
এটা আমি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করব। ধরুন, আপনি একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন। তো মুসল্লীদের ওযু-ইস্তিঞ্জার জন্য পানির প্রয়োজন। পানি তো এই জমিনের নিচেই আছে; কিন্তু তাই বলে আপনি পানি বের করতে পারবেন না। এর জন্য আপনাকে যোগাযোগ করতে হবে একজন টিউবওয়েল মিস্ত্রির সাথে। এভাবে মসজিদের বিদ্যুতের জন্য আপনাকে যেতে হবে ইলেক্টিক্যাল মিস্ত্রির কাছে। তদ্রƒপ আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের গভীরে রেখে দিয়েছেন বহু মাসআলা-মাসাইল। আর সেগুলো বের করার জন্য উম্মতকে দান করেছেন ফুকাহা-মুজতাহিদগণকে। তাঁদের সাথে যোগাযোগ রাখবেন, তো মাসআলা বের হবে। তাঁদেরকে গালি দেবেন, তো মাসআলা বের হবে না।
প্রতিটি শাস্ত্র–বিশেষজ্ঞের প্রতি আস্থা রাখা জরুরি
ধরুন, আপনি জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের নিকট গিয়েছেন। ডাক্তার চেকাপ করে বললেন, ‘আপনাকে ইনজেকশন নিতে হবে।’ আপনি বললেন, ‘ইনজেকশন কেন নেব?’ ডাক্তার বললেন, ‘আপনার শরীরে ১০৫ ডিগ্রি জ্বর।’ আপনি বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব! আপনি কেমন করে জানলেন যে, আমার শরীরে ১০৫ ডিগ্রি জ্বর?’ ডাক্তার বললেন, ‘আরে মিয়া! আপনাকে এটা বুঝাতে পারব না। আপনাকে এটা বিশ্লেষণসহ জানতে হলে আমাদের ক্লাসে আসতে হবে। তখন বুঝিয়ে দেবো। ফার্মেসিতে কেবল ঔষধ দেওয়া হয়; এখানে বুঝানো হয় না। এখানে বুঝাতে গেলে সময় নষ্ট হবে।’
উলামায়ে কেরামের প্রতি আস্থা রাখুন
আমাকে বড় দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, অনেক মানুষ উলামায়ে কেরামের প্রতি আস্থা রাখে না। তারা বলে, ‘আমাদেরকে তাহকীক বা অনুসন্ধান করতে হবে।’ এদের কাউকে কাউকে আমি বলি, ‘তাহকীক-অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের মারকাযে এসো।’ সে বলে, ‘জ্বি না, আমার সময় নেই। এখনই মাসআলাটি বুঝিয়ে দিন।’ আমি বলি, ‘ডাক্তার তোমাকে তো তাৎক্ষণিক বুঝিয়ে দেয় না, তাতে তোমার কোনো আপত্তি থাকে না; কিন্তু একজন আলিমের পেছনে এই বলে লেগে আছ যে, এখনই বুঝিয়ে দাও!
যাইহোক, আমি বলছিলাম, যেভাবে আল্লাহ তাআলা মাটির নিচে পানি রেখেছেন, আর তা বের করে আনার জন্য বান্দাকে ইঞ্জিনিয়ার দান করেছেন; তদ্রুপ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের গভীরে অনেক মাসআলা রেখেছেন। আর সেগুলো বের করে আনার জন্য উম্মতকে মুজতাহিদীনে কেরাম দান করেছেন। আমরা যে মুজতাহিদের অনুসরণ করে থাকি, তিনি হলেন ইমাম আযম আবু হানীফা নুমান ইবনু সাবিত রাহিমাহুল্লাহ। তিনি তাহকীক-গবেষণা করে হাদীস-ভাণ্ডার থেকে মাসআলা-মাসাইল বের করেছেন। সেই মাসআলাসমূহের নাম ‘ফিকহে হানাফী’। তাই আমরা বলে থাকি যে, ‘ফিকহে হানাফী’ কুরআন-হাদীসের বাইরের কিছু নয়।
আমরা গত সংখ্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনন্য ও অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘জাওয়ামিয়ুল কালিম’ (সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক কথা বলার যোগ্যতা) সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলাম। এ সংখ্যায় আমরা এ বৈশিষ্ট্যের দু-চারটি উদাহরণ পেশ করব, যাতে বিষয়টি পাঠকদের সামনে আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- إنما الأعمال بالنيات ‘সকল আমল নিয়তের উপরই নির্ভরশীল।’ (বুখারী, হাদীস-ক্রম : ১)
এটি রাসূলের বাণী। এ থেকে কয়েকটি মাসআলা বের হয়, একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আমাকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল যে, ‘আপনারা জানাযার নামাযের সময় জানাযা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে কি প্রায়ই মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে এ ঘোষণা করে থাকেন-আপনারা আল্লাহ তাআলার জন্য চার তাকবীরের সাথে এই ইমামের পেছনে জানাযার নামায পড়ার নিয়ত করুন?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আমরা এই ঘোষণা দিয়ে থাকি।’ লোকটি বলল, ‘আপনারা এই যে নিয়ত করিয়ে থাকেন এটা কোথায় লেখা আছে?’ আমি বললাম, ‘সহীহ বুখারীতে লেখা আছে।’ জানতে চাইল, ‘বুখারীর কোন হাদীসে?’ আমি বললাম, ‘বুখারীর প্রথম হাদীসে।’ লোকটি বলল, ‘তাহলে হাদীসটি শোনান।’ আমি শোনালাম-‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- إنما الأعمال بالنيات “সকল আমল নিয়তের উপরই নির্ভরশীল।” নিয়ত যেভাবে আমলও হবে সেভাবে।’
লোকটি এবার বলল, ‘আপনি আমার প্রশ্নটি বুঝেননি।’ আমি বললাম, ‘আমি আপনার প্রশ্ন বুঝতে পেরেছি, কিন্তু আপনি আমার উত্তর বুঝেননি।’ সে বলল, ‘তাহলে একটু বুঝিয়ে বলুন।’ আমি বললাম, ‘আপনার প্রশ্ন ছিল, আমরা মুখে যে নিয়ত করি তা কোথায় পেয়েছি, এই তো?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, এটাই আমার প্রশ্ন।’ আমি বললাম, ‘আমি এজন্যই বলেছি যে, আমি তোমার প্রশ্ন বুঝেছি, কিন্তু আপনি আমার উত্তর বুঝেননি।’
এবার আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘বলুন তো, আমরা কী বলি? “নিয়ত করো” বলি, নাকি “নিয়ত বলো” বলি?’ সে বলল, ‘আপনারা “নিয়ত করো” বলেন।’ আমি বললাম, ‘একটি হলো “করা” আর আরেকটি হলো “বলা”। “করা” হয় অন্তর দিয়ে, আর “বলা” হয় মুখ দিয়ে। যদি আমরা এরকম বলতাম যে, “নিয়ত বলো”, তাহলে তোমার প্রশ্নটি যথার্থ হতো যে, এটা কোথায় লেখা আছে? কিন্তু আমরা তো “নিয়ত করো” বলি। আর এটা সহীহ বুখারীর প্রথম হাদীস দ্বারাই সুপ্রমাণিত।’
নিয়ত করার প্রমাণ
লোকটি আমাকে আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনারা যে বলেন, “নিয়ত করো” এটা কোথায় লেখা আছে?’ আমি বললাম, ‘এটাও উপরোক্ত হাদীসে আছে।’ বলল, ‘কীভাবে?’ আমি বললাম, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বলেছেন, নিয়ত যেরকম আমলও সেরকম, তাহলে এবার বলুন, কোন আমলের জন্য কোন নিয়ত হবে? যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক আমলের জন্য পৃথক পৃথক নিয়ত বলে দিতেন, তাহলে বলো তো বুখারী শরীফের কলেবর কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেতো? শুধু এই একটি মাসআলার জন্য বুখারী শরীফ কত বিশাল হয়ে যেত না?
‘উদাহরণত ভোরে ঘুম থেকে উঠে কী নিয়ত করবেন, বাইতুল খালা বা ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় কী নিয়ত করবেন, ওযু করার সময় কী নিয়ত করবেন, কায়লুলা বা দুপুরের বিশ্রাম গ্রহণের সময় কী নিয়ত করবেন, দোকানে গেলে কী নিয়ত করবেন, শুধু এ বিষয়ে যে, কোন আমলের জন্য কী নিয়ত করতে হবে, যদি রাসূল নিজেই বাক্যগুলো বলে দিতেন, তাহলে শুধু এই একটি মাসআলার উপর কত বড় কিতাব হয়ে যেত! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- أعطيت جوامع الكلم “আল্লাহ তাআলা আমার উপর এ অনুগ্রহ করেছেন যে, আমাকে মাসআলা দান করেছেন অনেক; কিন্তু শব্দাবলি দান করেছেন অল্প।” আল্লাহ তাআলা অল্প কথায় অনেক মাসআলা রেখেছেন। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ মর্যাদা।’
খাবারপাত্রে পোকামাকড় পড়ে গেলে
আরেকটি উদাহরণ বোঝার চেষ্টা করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘যখন তোমাদের কারও কোনো খাবারপাত্রে মাছি পড়ে, তখন তাকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেবে, তারপরে ফেলে দেবে। কারণ, তার এক ডানায় থাকে আরোগ্য, আর আরেক ডানায় থাকে রোগ। (বুখারী : ২/৮৬০)
এখানে দুটি মাসআলা। প্রথমত খাবারে মাছি ডুবিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়ত ডুবিয়ে দেওয়ার পর তা বাইরে ফেলে দেওয়া, তারপর ওই খাবার ব্যবহার করা। তন্মধ্যে একটির কারণ রাসূল নিজেই বলে দিয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয়টির কারণ তিনি বলেননি। খাবারপাত্রে মাছি পড়ে গেলে তা ডুবিয়ে দিতে হবে কেন? এর কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, মাছির দুটি ডানা থাকে। একটিতে আছে আরোগ্য, অপরটিতে রোগ। তো মাছিটি যখন ডুবিয়ে বাইরে ফেলে দেবে, তখন খাবার পূর্বের মতো হয়ে যাবে। বর্তমান আধুনিক যুগের ভাষায় এটাকে এভাবে বলা যেতে পারে যে, মাছিটি ডুবানোর কারণে খাবারের ভারসাম্য রক্ষা হয়েছে। খাবার প্রথমে বিশুদ্ধ থেকে থাকলে মাছি পড়ার কারণে দূষিত হয়ে গেছে। তো আপনি যখন মাছিটি পুরোপুরি খাবারে ডুবিয়ে দেবেন, তখন ওই আরোগ্য বিশিষ্ট ডানাটিও ডুবে যাবে। এবার রোগ চলে গেল!
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো প্রথম কথাটি বুঝিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু মাছিটি ফেলে দেওয়ার পর ওই খাবার খাওয়াও বৈধ, এর কারণ তিনি বলেননি। এর কারণ বলেছেন ইমাম আযম আবু হানীফা। তিনি বলেন, ‘যদি খাবারে মাছি পড়ে যায়, তাহলে ওই খাবার খাওয়া জায়েয আছে। কেননা, মাছির দেহের ভেতর প্রবাহমান রক্ত থাকে না। কাজেই যে-সকল প্রাণীর শরীরে প্রবাহমান রক্ত থাকে না তাদের বিধান মাছির বিধানের অনুরূপ।’ (সারাখসী রচিত আল-মাবসুত : ১/৯১)
এবার বলুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি একেকটি প্রাণীর মাসআলা একেকটি হাদীসে আলাদা আলাদা করে বলতেন, তাহলে কত বড় কিতাবের প্রয়োজন হতো! যদি রাসীল বলতেন, খাবারে মশা পড়লেও খাবার খাওয়া জায়েয। মাছি পড়লেও জায়েয।
এ পৃথিবীতে হাজার হাজার ছোট প্রাণী বাস করে। বলুন তো, নবীজি যদি একেকটি ছোট ছোট প্রাণীর বিধান আলাদা করে বলতেন, তাহলে কত বিশাল কিতাব হয়ে যেত? নবীজি বলেছেন- أعطيت جوامع الكلم ‘আল্লাহ আমাকে জাওয়ামিয়ুল কালিম দান করেছেন।’ অর্থাৎ আমি একটি শব্দ বলি আর তা থেকে হাজার হাজার মাসআলা নির্গত হয়।
এবার কিছু আকীদা ও মাসআলা সংক্রান্ত বিষয় বুঝাবার চেষ্টা করব, যাতে আমাদের আকীদাও ঠিক থাকে এবং মাসআলাও ঠিক থাকে।
হায়াতুন নবীর আকীদা
আমাদের আকীদা-বিশ্বাস হলো, সমস্ত নবী তাঁদের নিজ নিজ কবরে যিন্দা। কেউ প্রশ্ন করতে পারে, দলীল কী? আমরা বলব, কুরআনে আছে-
ولا تقولوا لمن يقتل في سبيل الله أموات بل أحياء ولكن لا تشعرون
এ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত।
দেখুন, কুরআনে শহীদদেরকে জীবিত বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও জীবিত বলে স্বীকার করতে হবে। কেননা, শহীদগণ যে মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন তা তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমেই লাভ করেছেন। যদি তাঁরা রাসূলের কালেমা না পড়তেন এবং নিহত না হতেন, তাহলে তাঁরা কখনোই এ সম্মানের অধিকারী হতে পারতেন না। তাঁরা রাসূলের কালেমা পড়ে নিহত হয়েছেন বলেই তো এই মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন। এর দ্বারা বোঝা গেল, শহীদগণ যিন্দা হলে নবীজি আরও বহুগুণ উত্তমভাবে যিন্দা। এখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যিন্দা বললাম আর শহীদগণের যিন্দা হওয়াকে দলীল হিসেবে পেশ করলাম।
‘নবী যিন্দা’ বললে ‘শহীদগণ যিন্দা’ বুঝে আসত না
এখন কেউ বলতে পারেন যে, দেখুন, আপনি দাবি করেছেন নবী যিন্দা আর তার পক্ষে শহীদগণের যিন্দা হওয়ার বিষয়টি দলীল হিসেবে পেশ করেছেন। তাহলে সরাসরি আল্লাহ কুরআনে বলে দিলেন না কেন যে, নবী যিন্দা? আমি বলি যে, কুরআনে বলা হয়েছে শহীদগণ যিন্দা, আর এর দ্বারা প্রমাডুত হয়েছে যে, নবী যিন্দা। শহীদগণ যিন্দা বলার দ্বারা নবীর যিন্দা হওয়ার বিষয়টি বুঝে এসেছে। পক্ষান্তরে নবী যিন্দা এ কথা বললে শহীদগণ যে যিন্দা তা বোধগম্য হতো না। এই যে আমি বললাম, নবী যিন্দা বললে শহীদগণ যিন্দা বোধগম্য হতো না, এর উদাহরণ যেমন, একজন ব্যক্তি যাকে কোনোদিন নামায পড়তে দেখা যায়নি এবং তার মুখেও দাড়ি নেই, সে রাসূলের জন্য জীবন দিলো এবং শাহাদত বরণ করল। তো সে কীভাবে যিন্দা? আমরা তাকে যিন্দা বলি না। হ্যাঁ, নবী যিন্দা। কেননা, তিনি নিষ্পাপ। তাঁর নিকট জিবরাঈল আগমন করেন। নবী যিন্দা এটা তো বুঝে আসে, কিন্তু ওই লোকটিকে যে যিন্দা তা কে মানবে? মানুষ কি এরকম প্রশ্ন করত না? অবশ্যই করত। তাই ‘নবী যিন্দা’ বললে ‘শহীদ যিন্দা’ বোধগম্য হতো না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, শহীদ যিন্দা আর এর দ্বারা অনায়াসে ‘নবী যিন্দা’ প্রতীয়মান হয়েছে।
কাযা নামাযের মাসআলা
আরেকটি উদাহরণ দেখুন। যদি কেউ ভুলে অথবা নিদ্রায় থাকার কারণে নামায ছেড়ে দেয়, তাহলে স্মরণ হওয়া মাত্র অথবা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া মাত্র ওই কাজা নামায পড়ে নেবে। এতে প্রতীয়মান হলো যে, কেউ যদি স্বেচ্ছায় নামায ছেড়ে দেয়, তাহলে অবশ্যই তাকে ওই নামাযও কাজা পড়তে হবে। কিন্তু সা¤প্রতিক কালের কিছু লোক বলে যে, ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দিলে ওই নামাযের কাজা নেই। তারা বলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘যদি কোনো ব্যক্তি ভুলে অথবা ঘুমে থাকার দরুণ নামায ছেড়ে দেয়, তাহলে যখন নামাযের কথা স্মরণ হবে, তখন পড়ে নেবে।’
তারা বলে, এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেননি যে, ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দিলে কাযা করতে হবে।
আমরা বলি, ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দিলে নামাযের কাযা করতে হবে এর পক্ষে আমাদের কাছে আরও দলীল আছে। আমরা শুধু একটি দলীল পেশ করব।
খন্দকের যুদ্ধে নবীজি ও সাহাবীগণ পরিখা খনন করছিলেন। সে সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একত্রে কয়েক ওয়াক্ত নামায কাযা হয়ে যায়। তিনি পরে এর কাজা আদায় করে নেন।
লক্ষ করুন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে কাযা আদায় করে নেন। অথচ তিনি ঘুমিয়ে যাননি এবং নামায ভুলেও যাননি। কেবল ধর্মীয় কাজে ব্যস্ত থাকার দরুণ চার ওয়াক্ত নামায ছুটে গিয়েছিল। পরে তা কাজা আদায় করে নেন।
আমাদের কাছে আরও দলীল রয়েছে। তবে শুধু নিম্নোক্ত দলীল নিয়ে আলোচনা করে ইতি টানব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-‘কেউ নামায পড়তে ভুলে গেলে স্মরণ হওয়া মাত্র পড়ে নেবে। তদ্রূপ যদি ঘুমিয়ে যায় এবং ঘুমন্ত অবস্থায় নামায ছুটে যায়, তাহলে জাগ্রত হওয়া মাত্র তা কাজা করে নেবে ।
সাধারণ অবস্থায় মানুষের ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমাযোগ্য। কিন্তু নামায এত গুরুত্বপূর্ণ বিধান যে, তা ভুলে ছুটে গেলেও মাফ হয় না; কাজা আদায় করতে হয। তাহলে যে ইবাদাত ভুলবশত ছুটে গেলেও মাফ হয় না, সেটা ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দিলে মাফ হবে কীভাবে?
যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে বলতেন যে, জেনে-বুঝে নামায ছেড়ে দিলে কাজা আদায় করতে হবে, তাহলে এর দ্বারা ঘুমন্ত অবস্থায় নামায ছুটে যাওয়ার মাসআলা জানা যেতো না। কেউ তখন বলতো, আমি জেনে-বুঝে নামায তরক করিনি; আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম, আমার চোখ খুলেইনি, তাই আমার নামায কাযা হয়ে গেছে। আবার কেউ এরূপ বলত যে, আমি তো নামায পড়তে ভুলেই গেছি, আমার স্মরণই নেই। তাই নামায ছুটে গেছে।
কাজেই যদি জেনে-বুঝে নামায তরক করার মাসআলা বলে দেওয়া হতো, তাহলে ভুলে নামায তরক করার মাসআলা জানা যেত না। নবীজি ভুলবশত নামায পরিত্যাগের মাসআলা বলেছেন, আর এর দ্বারা জেনে-বুঝে নামায পরিত্যাগের মাসআলা বোধগম্য হয়েছে। তিনি শব্দ বলেছেন একটি আর মাসআলা বোধগম্য হয়েছে দুটি।
আয়াত ও তরজমা
وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى
(১) শপথ রাতের, যখন তা আচ্ছন্ন করে।
وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّى
(২) শপথ দিনের, যখন তা আলোকিত হয়।
وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى
(৩) এবং শপথ তাঁর, যিনি নর-নারীকে সৃষ্টি করেছেন।
إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّى
(৪) নিশ্চয় তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকারের।
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى
(৫) অতএব, যে কেউ দান করে এবং ভয় করে চলে।
وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى
(৬) এবং যে ভালো কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে।
فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى
(৭) আমি তার জন্যে সহজ পথকে সুগম করে দেব।
وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى
(৮) কিন্তু যে কেউ কার্পণ্য করে এবং বেপরোয়া হয়ে থাকে।
وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى
(৯) আর যা উত্তম, তাকে মিথ্যাজ্ঞান করে।
فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى
(১০) আমি তার জন্যে সুগম করে দেব কঠোর পরিণামের পথ।
সূরার নামকরণ :
সূরার প্রথম আয়াতেরاللَّيْلِ শব্দ থেকেই উক্ত সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
সূরার ফযীলত :
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মাআয রাযিআল্লাহু আনহু-কে এ সূরা দ্বারা ইমামতি করতে উৎসাহিত করেছিলেন। এর দ্বারা বুঝা যায় সূরাটি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ। যদি কোন ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যে, সে এ সূরাটি পাঠ করছে, তবে সে অভাবগ্রস্ত হবে না। তার কর্তব্য হলো, নিদ্রাভঙ্গ হলেই উঠে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করবে।
সংক্ষিপ্ত আলোচনা :
আলোচ্য সূরাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে বিশ্ব-জগতের মধ্যে অবস্থিত রহস্যরাজি ও মানব-প্রকৃতির মধ্যে বিদ্যমান বৈশিষ্টগুলো বর্ণনা করা এবং তার সঠিক কাজ ও তার ফল কী হবে সে বিষয় নিশ্চিত জ্ঞানদান করা। সূরাটির শুরুতেই মহান আল্লাহ তাআলা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের শপথ করেছেন, যে সময়গুলোতে মানুষ বিভিন্ন আমল করে থাকে। আমল সম্পাদনের দিক দিয়ে পৃথিবীতে মানুষ দু’ধরণের হতে পারে। এক. যাদেরকে আল্লাহ তাআলা সঠিক পথে চলার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। এরাই সফলকাম এবং তাদের তিনটি গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে। দুই. যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ভ্রান্তপথে চলার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। এরা ব্যর্থকাম এবং এদের তিনটি দোষ বর্ণনা করা হয়েছে।
আল্লাহর শপথ :
“কসম নিশীথ রাতের, যখন তা ঘনীভূত অন্ধকারে (সব কিছুকে) আচ্ছন্ন করে। আর শপথ উজ্জ্বল দিবালোকের, যা আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে গেলো।” এখানে রাতের ‘আচ্ছন্ন করা’ এবং দিনের ‘আলোকিত হওয়া’র শপথ করে আল্লাহ তাআলা এ দুয়ের কল্যাণকর বিষয়ে চিন্তা-গবেষণার প্রতি যেমন বান্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তেমনি দুনিয়ায় নেক আমলের মাধ্যমে আখিরাতে মুক্তির পথ বেছে নেয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন।
এই আয়াতে দুটি কালের ব্যবহার হয়েছে। ‘ইয়াগশা’ ভবিষ্যত বা নিত্য বর্তমান এবং ‘তাজাল্লা’ অতীত। আল্লাহ তাআলা এই উভয় সময়ের কসম খেয়ে এবং দুটি সময়ের জন্য দুই ধরনের কাল ব্যবহার করে অনাগত মানুষকে বলতে চেয়েছেন যে, প্রতিনিয়ত আগত অন্ধকারের ঘনঘটার মধ্য থেকে নিশ্চিতভাবে যখনই হেদায়াতের আলোর আভা বিচ্ছুরিত হবে তখন যতো কষ্টই হোক না কেন গাফলতির চাদরকে দূরে নিক্ষেপ করে তাকে আলোর পথে আসতে হবে।
পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “এবং শপথ তাঁর, যিনি নর-নারীকে সৃষ্টি করেছেন।” এখানে আল্লাহ তাআলা নিজ সত্ত্বার শপথ করেছেন। কেননা তিনি হলেন নর নারী উভয়ের সৃষ্টিকর্তা। এ ক্ষেত্রে ما মাওসূলা الذي বা যিনি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ما মাসদার বা ক্রিয়ামূল হলে অর্থ হবে শপথ নর নারী সৃষ্টির। (তাফসীরে সা’দী)
মোটকথা, আল্লাহ তাআলা নর নারী সৃষ্টি করেছেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ “আমি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি জোড়ায়-জোড়ায়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” (সূরা যারিয়াত : আয়াতক্রম : ৪৯)
শপথসমূহের জবাব :
“অবশ্যই তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির।” বাক্যটি শপথের জবাব। এর অর্থ : হে মানুষ! কর্মপ্রচেষ্টা অনুসারে তোমাদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে দুটি স্থান জান্নাত ও জাহান্নাম। তাই তো দেখা যায়, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ জাহান্নামের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে ব্যস্ত। আর কেউ কেউ তৎপর জান্নাতের উন্নততর স্তর সন্ধানে।
বাগবী লিখেছেন, হযরত আবু মালেক আশরারী বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ সকালে বাড়ি থেকে বের হয়। তারপর বিক্রয় করতে থাকে নিজেকে। এভাবে কেউ নিজেকে মুক্ত করে জাহান্নাম থেকে, আবার কেউ নিজেকে নিক্ষেপ করে জাহান্নামে।’ (মাযহারী)
জান্নাত লাভের পথ :
“সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা উত্তম তা সত্য বলে গ্রহণ করলে, আমি তার জন্য সুগম করে দিবো সহজ পথ।”
এখানে ‘দান করলে’ অর্থ আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করলে। আর ‘মুক্তাকী হলে’ অর্থ যে সকল অপকর্মের জন্য শাস্তি অবধারিত, সে সকল অপকর্ম থেকে বিরত থাকলে। হযরত বারা বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা একটি খেজুরের অর্ধেক দান করে হলেও নরকাগ্নি থেকে পরিত্রাণের প্রয়াস পেয়ো।’
‘আল হুসনা’ অর্থ যা সুন্দর। আবদুর রহমান আসলামা ও জুহাক বলেছেন, এখানে ‘আল হুসনা’ অর্থ কলেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। কেউ বলেছেন এর অর্থ জান্নাত। এভাবে বক্তব্যটির অর্থ দাঁড়ায়- যারা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপনকারী, তিনি তাদেরকে দান করবেন জান্নাত।
মোটকথা, যে ব্যক্তি নেক রাস্তায় অর্থ ব্যয় করে, অন্তরে আল্লাহকে ভয় করে, ইসলামের ভালো কথাগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং এই সুসংবাদকে সত্য-সঠিক বলে বিশ্বাস করে, তার জন্য আল্লাহ তাআলা নেকীর পথকে সহজ করে দেবেন আর শেষ পরিণতিতে নিতান্ত সুখ-শান্তির স্থানে তাকে পৌঁছিয়ে দেবেন, যার নাম হচ্ছে জান্নাত।
জাহান্নামের পথযাত্রী হবে যারা :
“কিন্তু যে কেউ কার্পণ্য করে এবং বেপরোয়া হয়ে থাকে, আর যা উত্তম, তাকে মিথ্যাজ্ঞান করে, আমি তার জন্যে সুগম করে দেব কঠোর পরিণামের পথ।”
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় অর্থ ব্যয় করেনি এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও আখেরাতের সাওয়াবের পরোয়া করেনি, ইসলামের বাণী ও আল্লাহর ওয়াদাকে মিথ্যা মনে করেছে, তার অন্তর দিন দিন সংকীর্ণ ও কঠিন হয়ে যাবে। নেকীর তাওফীক রহিত হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে খোদায়ী আযাবের কঠোরতায় পৌঁছে যাবে। এটাই আল্লাহর স্বভাব যে, ভাগ্যবানরা যখন নেক অবলম্বন করে আর হতভাগারা যখন চলে বদ আমলের দিকে, তখন উভয়ের জন্য সে পথই সহজ করে দেয়া হয়, খোদায়ী তাকদীর অনুযায়ী যা তারা নিজেরাই পছন্দ করে নিয়েছে নিজেদের ইচ্ছা-অভিপ্রায়ে। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, “তারা যেমন প্রথমবারে তাতে ঈমান আনেনি আমিও তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দেব এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াতে দেব।” (সূরা আনআম, আয়াতক্রম : ১১০)
হযরত আলী রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা কোন এক জানাযায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আমরা ছিলাম। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের স্থান জান্নাতে বা জাহান্নামে নির্ধারিত করা আছে।’ সাহাবী বললেন, ‘তার উপর নির্ভর করে থাকব না?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা আমল করে যাও কারণ প্রত্যেকের জন্য সেই আমলই সহজ করে দেয়া হয়েছে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।’ তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতগুলো পাঠ করলেন।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৪৯৪৫)
আয়াত ও তরজমা
كَذَّبَتْ ثَمُودُ بِطَغْوَاهَا
(১১) সামুদ জাতি তাদের নাফরমানীর কারণে (সত্যকে) অস্বীকার করেছিল।
إِذِ انْبَعَثَ أَشْقَاهَا
(১২) তাদের মধ্যে সর্বাধিক হতভাগা ব্যক্তিটি যখন তৎপর হয়ে উঠেছিল।
فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ نَاقَةَ اللَّهِ وَسُقْيَاهَا
(১৩) তখন আল্লাহর রাসূল তাদেরকে বলেছিলেন, আল্লাহ পাকের উষ্ট্রী এবং তার পানি পান করানোর সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থাক।
فَكَذَّبُوهُ فَعَقَرُوهَا فَدَمْدَمَ عَلَيْهِمْ رَبُّهُمْ بِذَنْبِهِمْ فَسَوَّاهَا
(১৪) কিন্তু তারা রাসূলকে মিথ্যাজ্ঞান করলো এবং উষ্ট্রীকে হত্যা করলো। তাই তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দিলেন, তাদের পাপাচারের কারণে।
وَلَا يَخَافُ عُقْبَاهَا
(১৫) এবং এর পরিণামের জন্যে আল্লাহ পাকের আশঙ্কা করার কিছুই নেই।
সংক্ষিপ্ত তাফসীর
আলোচ্য আয়াতগুলোতে ওই সকল লোকের উদাহরণ পেশ করা হয়েছে, যারা নিজেদেরকে নানা প্রকার পাপ কাজের দ্বারা কলুষিত করেছে এবং হেদায়াতের আলো থেকে নিজেদেরকে আড়াল করে আপন সম্মানকে লাঞ্ছিত করেছে। উক্ত আয়াতগুলোতে সামুদ জাতির গযবপ্রাপ্ত হওয়া ও আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্যে আসা শাস্তি এবং অবশেষে তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বলা হচ্ছে, ‘সামুদ জাতি (নবীকে) অস্বীকার করলো, মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলো ও উপেক্ষা করলো তাদের অহংকার ও সীমালংঘন করার মাধ্যমে (তারা বাড়াবাড়ি করলো)। স্মরণ করে দেখো সেই সময়ের কথা, যখন তারা তাদের সব থেকে দুষ্ট লোকটিকে (তাদের দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করার জন্য) পাঠালো। তখন তাকে আল্লাহর রাসূল বললেন, ছেড়ে দাও আল্লাহর উটনীকে, তাকে তার নিজ হিসসার পানি খেতে দাও। কিন্তু তারা তাকে হত্যা করলো। এর ফলে তাদের রব, তাদের অপরাধের দরুন উপর্যুপরি আযাবের কশাঘাত হানলেন এবং তাদের শহর-নগরগুলোসহ তাদেরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন। এভাবে নাফরমান জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে বিশ্বপালক আল্লাহ তাআলা কাউকে ভয় করেন না, ভয় করার তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই, যেহেতু তাঁর ওপর কথা বলার ক্ষমতা কারো নেই। সামুদ জাতি ও তাদের নবী সালেহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কুরআন পাকের বহু স্থানে অল্প-বিস্তর বর্ণনা এসেছে।
সামুদ জাতির পরিচয় ও তাদের ধ্বংসের বিবরণ
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও এর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
সামুদ সম্প্রদায়ের লোকেরা একবার এক স্থানে সমবেত হয়। ঐ সমাবেশে নবী সালেহ আলাইহিস সালাম আগমন করেন এবং তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান, উপদেশ দান করেন, ভীতি প্রদর্শন করেন, নসীহাত করেন এবং তাদেরকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন। উপস্থিত লোকজন তাঁকে বলল, ‘ঐ যে একটা পাথর দেখা যায়, ওর মধ্য থেকে যদি অমুক অমুক গুণসম্পন্ন একটি দীর্ঘকায় দশ মাসের গর্ভবতী উটনী বের করে দেখাতে পার, তবে দেখাও।’ সালেহ আলাইহিস সালাম বললেন, ‘তোমাদের বর্ণিত গুণসম্পন্ন উটনী যদি আমি বের করে দেই তাহলে কি তোমরা আমার আনীত দীন ও আমার নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে?’ তারা সবাই বলল, ‘হ্যাঁ, বিশ্বাস করব।’ তখন তিনি এ কথার উপর তাদের থেকে অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। এরপর সালেহ আলাইহিস সালাম দাঁড়িয়ে যান এবং আল্লাহর নিকট তাদের আবদার পূরণ করার প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন এবং ঐ পাথরকে কেটে অনুরূপ গুণসম্পন্ন একটি উটনী বের করে দেয়ার নির্দেশ দেন। যখন তারা স্বচক্ষে এরূপ উটনী দেখতে পেল, তখন অনেকেই ঈমান আনল, কিন্তু অধিকাংশ লোকই তাদের কুফরী, গুমরাহী ও বৈরিতার উপর অটল হয়ে থাকল।
অতঃপর হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে বললেন, ‘এটি আল্লাহর উটনী, তোমাদের জন্য নিদর্শন। একে আল্লাহর যমীনে চরে খেয়ে বেড়াতে দাও এবং এর অনিষ্ট সাধন করো না। অন্যথায় এক নিকটবর্তী আযাব তোমাদেরকে পাকড়াও করবে।’ তারপর অবস্থা এই দাঁড়াল যে, এ উটনীটি তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা চরে বেড়াত, একদিন পর পর পানির ঘাটে অবতরণ করত। যেদিন সে পানি পান করত সেদিন কূপের সমস্ত পানি নিঃশেষ করে ফেলত। তাই সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের পালার দিনে পরের দিনের জন্যে প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলন করে রাখত।
দীর্ঘদিন যাবত এ অবস্থা চলতে থাকায় সম্প্রদায়ের লোকেরা অধৈর্য হয়ে পড়ে। এর থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য তারা একদা সমবেত হয় ও পরামর্শ করে। তারা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত করে যে, উটনীটিকে হত্যা করতে হবে। এর ফলে তারা উটনীটির কবল থেকে নিষ্কৃতি পাবে এবং সমস্ত পানির উপর তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। শয়তান তাদেরকে এ কাজের যুক্তি ও সুফল প্রদর্শন করল। ফলে তারা উটনীটিকে হত্যা করে ফেললো।
এরপর তারা সংকল্পবদ্ধ হলো সালেহ আলাইহিস সালাম-কে হত্যার করার জন্য। যে কয় ব্যক্তি সালেহ আলাইহিস সালাম-কে হত্যা করতে সংঘবদ্ধ হয়েছিল, আল্লাহ প্রথমে তাদের উপর পাথর নিক্ষেপ করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন। পরে গোটা সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন। যে তিনদিন তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়েছিল তার প্রথমদিন ছিল বৃহস্পতিবার। এই দিন আসার সাথে সাথে সম্প্রদায়ের সকলের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। দ্বিতীয় দিন শুক্রবারে সকলের চেহারা লাল রঙ ধারণ করে। তৃতীয় দিন শনিবারে সকলের চেহারা কাল রঙ ধারণ করে। সন্ধ্যাবেলা তারা বলাবলি করে যে, জেনে নাও, নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। রবিবার সকালে তারা খোশবু লাগিয়ে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষায় থাকল- কী শাস্তি ও আযাব-গযব নাযিল হয় তা দেখার জন্যে। তাদের কোনই ধারণা ছিল না যে, তাদেরকে কী করা হবে এবং কোন দিক থেকে আযাব আসবে। কিছু সময় পর সূর্য যখন উপরে এসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তখন আসমানের দিক থেকে বিকট আওয়াজ এলো এবং নিচের দিক থেকে প্রবল ভূকম্পন শুরু হল। সাথে সাথে তাদের প্রাণবায়ু উড়ে গেল, সকল নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল এবং যা সত্য তাই বাস্তবে ঘটে গেল। ফলে সবাই লাশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।
উটনীকে হত্যাকরীর পরিচয়
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “তাদের মধ্যে সর্বাধিক হতভাগা ব্যক্তিটি যখন তৎপর হয়ে উঠেছিল।”
একথার অর্থ- উটনীকে হত্যার ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহী ছিল এক হতভাগ্য। সে নিজ হাতে উটনীকে হত্যা করবে বলে পণ করেছিল এবং গ্রহণ করেছিল কার্যকর উদ্যোগ।
হতভাগ্য লোকটির নাম ছিল- কাজার ইবনে সালিক। সে ছিল বেঁটে, গৌরবর্ণ ও নীল চক্ষুবিশিষ্ট। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জামআ থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সালেহ নবীর উষ্ট্রীসংহার পর্ব প্রসঙ্গে বললেন। একথাও বললেন যে, উষ্ট্রীটি বধ করতে উদ্যত হয়েছিল তাদের সম্প্রদায়ের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। যেমন আবু যামআ।
হযরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সালেহ নবীর উষ্ট্রী বধকারী লোকটিই মানবজাতির মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক হতভাগা। আর হতভাগা হযরত আদম নবীর ওই সন্তান, যে হত্যা করেছিল তার আপন ভাইকে। হত্যাকাণ্ডের প্রথম প্রচলন ঘটায় সে। সেকারণে পরবর্তী সময়ের সকল হত্যাকাণ্ডের পাপের একটা অংশ বহন করতে হবে তাকে।’ (মাযহারী)
আয়াত ও তরজমা
فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا
(৮) এরপর তিনিই তাকে জ্ঞান দান করেছেন, মন্দ কাজের এবং তা থেকে আত্মরক্ষা করার।
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا
(৯) নিশ্চয় সে-ই সফলকাম হয়েছে, যে আত্মসংশোধন করেছে।
وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
(১০) এবং সে-ই ব্যর্থ হয়েছে যে নিজেকে কলুষিত করেছে।
তাফসীর
“এরপর তিনিই তাকে জ্ঞান দান করেছেন, মন্দ কাজের এবং তা থেকে আত্মরক্ষা করার।” এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ তাআলা বুঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষকে ভাল বা মন্দ গ্রহণ করার এক সজ্ঞান ও সজাগ শক্তি দেয়া হয়েছে, যা তার এখতিয়ারাধীন এবং যে তাকে পরিচালনা করতে সক্ষম। এ শক্তি তার অনাগত প্রকৃতি প্রদত্ত যোগ্যতাকে কল্যাণের কাজে যেমন এগিয়ে দিতে পারবে, তেমনি এগিয়ে দিতে পারবে অকল্যাণকর কাজেও। এ পর্যায়ে এসে স্বাধীনতার সাথে তার দায়িত্ববোধ সক্রিয় হয়ে উঠবে। তাকে বিবেক ও বুঝশক্তি দেয়ার সাথে বিশেষ দায়িত্ববোধও দেয়া হয়েছে। যার দ্বারা সে মন্দ কাজ থেকে নিজের আত্মরক্ষা করতে পারবে।
মানুষের ওপর আল্লাহ রহমত সদা-সর্বদা আছে বলেই তিনি তাকে প্রকৃতিগতভাবে প্রাপ্ত বুঝ ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করার জন্য ছেড়ে দেননি অথবা যে শক্তিকে কাজে লাগানোর এখতিয়ার তাকে দেয়া হয়েছে, সেই শক্তির ওপর পরিপূর্ণ নির্ভর করার জন্য তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেননি বরং রেসালাত-রূপ নেয়ামত তাকে দেয়া হয়েছে, যাতে করে সে কঠিনভাবে ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা লাভ করে এবং ঈমানের দাবী অনুযায়ী সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে চলতে পারে। একইভাবে রেসালাত (আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ওহীর জ্ঞান) তার অন্তরের মধ্যে সঠিক পথ চেনার যুক্তিপ্রমাণ হাযির করে এবং আশেপাশের সবকিছু থেকে সে জ্ঞান পেতে পারে। এই ওহীর জ্ঞানের কারণে সে কৃপ্রবৃত্তির বলগাহীন আবেগ থেকে রেহাই পেয়ে সত্যকে তার আসল ও সঠিক চেহারায় দেখতে সক্ষম হয়। আর এভাবে তার সত্য সঠিক পথ এমনভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তার মনের মধ্যে সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ বা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে না। তখন সে তার সচেতন শক্তিকে উদ্ঘাটনের জন্য এবং সঠিক পথ-প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তাকে কাজে লাগিয়ে সেই পথে চলতে থাকে। মোটকথা, আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার সীমিত সাধ্যের মধ্যে থেকে যা সে করে তাই তার কাছে আল্লাহ তাআলার দাবী এবং এতোটুকুর জন্যই আল্লাহ তাআলা তাকে মর্যাদা দান করবেন।
সাঈদ ইবনে যোবায়ের এবং ইবনে যায়েদ এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন এরকম- ‘আল্লাহপাক মানুষের জন্য অপরিহার্য করে দিয়েছেন মিতাচার ও অমিতাচারকে। সে যা আকাঙ্খা করে, তার অন্তরকে আল্লাহপাক সেদিকেই ধাবিত করে দেন। অথবা তিনি প্রবৃত্তিকে দান করেন সংযমী হওয়ার সামর্থ্য। হৃদয়ে সৃষ্টি করেন সংযম-স্পৃহা। অথবা অসহায়ভাবে প্রবৃত্তিকে ছেড়ে দেন দুষ্কর্মাবলীর দিকে এবং হৃদয়েও সৃষ্টি করে দেন দুর্বৃত্তি।’
হযরত ইমরান ইবনে হোসাইন বলেছেন, ‘একবার মুজাইনা গোত্রের দু’জন লোক নিবেদন করলো, হে আল্লাহর বচনবাহক! মানুষ যা করে বা করার চেষ্টা করে, তা কি তার নিয়তির বিধানানুসারে? না তা আপনার আনীত শরীয়তের বিধানানুসারে ঘটিতব্য ভবিষ্যতের কর্মযোগ? অবাধ্যতার কারণে তো আমাদের বিরুদ্ধ দলীল-প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, মানুষের সকল কর্ম তার নিয়তির অনুসরণেই সম্পাদিত হয়। একথার প্রমাণ রয়েছে আল্লাহর কালামে। যেমন ‘শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও তার সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন।’
হযরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বললেন, মানুষের অন্তঃকরণ সর্বোতোভাবে আল্লাহর করতলগত। তিনি মানবহৃদয়কে যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে ঘুরিয়ে দেন। এরপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রার্থনা করলেন, হে হৃদয়সমূহের বিবর্তক! আমাদের হৃদয়সমূহকে তোমার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দাও।’ (মুসলিম)
আত্মার পরিশুদ্ধি
“নিশ্চয় সে-ই সফলকাম হয়েছে, যে আত্মসংশোধন করেছে।” এখানে আত্মার পরিশুদ্ধির পথ সরাসরি মানুষ আল্লাহর কাছ থেকেই পায়। আর তখন সে যেন তাঁর নূরের আলোকে অবগাহন করতে থাকে এবং মানুষের অস্তিত্বকে ধ্বংস করা ও তাকে ভুল পথে পরিচালনার জন্য যে সকল স্রোতধারা মানব সমাজে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, সেগুলো থেকে আল্লাহ তাআলাই তাকে বাঁচান।
নাফসকে পরিপাটি করা আর পাক করা হচ্ছে এই যে, কামনাশক্তি আর ক্রোধশক্তিকে জ্ঞান-বুদ্ধির বাধ্য-অনুগত করতে হবে এবং করতে হবে খোদায়ী শরীয়তের অনুগত। যাতে রূহ আর কলব উভয়ই খোদায়ী নূরের আলোকে আলোকিত হতে পারে।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে শুনেছি, ‘ওই নফস সফল, যাকে আল্লাহ পবিত্র করে দিয়েছেন।’ জুয়াইবিরের পদ্ধতিতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইবনে জারীর। সুপরিণত সূত্রে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ এবং ইবনে আবী শায়বা বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, ‘ইয়া ইলাহী! আমি তোমার নিকট আশ্রয় যাচনা করি অস্বস্তি, আলস্য, অপৌরুষ, অতিবার্ধক্য ও কবরের শাস্তি থেকে। হে আমার আল্লাহ! আমার হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে দাও সংযম ও পবিত্রতা দিয়ে। তুমিই প্রবৃত্তি-পবিত্রতাকারী হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ। তুমিই প্রবৃত্তির সকল কর্মের অধিকর্তা ও অভিভাবক। হে আমার পরম প্রভুপালক! আমি পরিত্রাণ প্রার্থনা করি ওই জ্ঞান থেকে, যা শুভপ্রসূ নয়, ওই হৃদয় থেকে যা বিনয়াবনত নয়, ওই প্রবৃত্তি থেকে যা পরিতৃপ্ত নয় এবং ওই প্রার্থনা থেকে যা গ্রহণযোগ্য নয়।’
বর্ণিত ব্যাখ্যার আলোকে আয়াতখানির মর্মার্থ দাঁড়ায়- ‘আল্লাহপাক তাঁর গুণবত্তার জ্যোতিসম্পাত দ্বারা যে নফসকে পবিত্র করেছেন, সেই নফস হয় আল্লাহ ও তাঁর বিধানে পরিতুষ্ট এবং তাঁর স্মরণ ও আনুগত্যে প্রশান্ত। সে বিরত থাকে আল্লাহ ও তাঁর পথের সকল প্রতিবন্ধকতা, সকল নিষেধাজ্ঞা থেকে। এরকম প্রবৃত্তির অধিকারী যারা, তারাই সফল।’ হাসান বসরী বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে পরিশুদ্ধ করেছে, করেছে পুণ্য ও আনুগত্যমণ্ডিত, সে-ই সফলতার অধিকারী।’ সম্ভবত হাসান বসরী এখানকার ‘যাক্কা’ শব্দসংযুক্ত সর্বনামটি ‘হা’ কে সম্পৃক্ত করেছেন এখানকার ‘মান’ এর সঙ্গে। প্রথমোক্ত ব্যাখ্যার প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, আলোচ্য আয়াতে ওই সকল লোকের অবস্থা বিবৃত হয়েছে, যারা হয়ে গিয়েছে আল্লাহর শুভদৃষ্টির লক্ষ্য। নিজস্ব অভিপ্রায় বলতে তাদের কিছুই নেই। তারা সম্পূর্ণতই আল্লাহর অভিপ্রায়নির্ভর। আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যার প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, এখানে ব্যক্ত করা হয়েছে ওই সকল লোকের কথা, যারা সর্বোতোরূপে আল্লাহর অভিপ্রায়প্রত্যাশী। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তাকে মহিমময় করে দেন। আর যারা তাঁর অভিমুখী হয়, তিনি তাদেরকে পথ দেখান।
পরের আয়াতে বলা হয়েছে- “এবং সে-ই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” একথার অর্থ-আল্লাহপাক যাকে পথ দেখাবেন না, সে অবশ্যই হবে অসফল। তারা অপরিশুদ্ধ, তাই ধ্বংসের উপযুক্ত। অথবা মর্মার্থ হবে- যারা হয়েছে ভ্রষ্টপথানুগামী, তারা ডেকে এনেছে নিজেদেরই ধ্বংস।
এখানকার ‘দাসসাহা’ তথা ধূলায় ধূসরিত করার তাৎপর্য এই যে, নাফসের রশি একেবারেই কামনা আর ক্রোধের হাতে ছেড়ে দেবে, জ্ঞান আর শরীয়তের সঙ্গে কোন সম্পর্কই রাখবে না। যেন কামনা-বাসনা আর লোভ-লালসার দাসে পরিণত হয়ে পড়ে। এমন ব্যক্তি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট এবং ঘৃণ্য।
আয়াত ও তরজমা
وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا
(১) শপথ সূর্যের এবং তার কিরণের।
وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا
(২) শপথ চন্দ্রের, যখন তা সূর্যের পেছনে ছোটে।
وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَاهَا
(৩) শপথ দিনের, যখন সে তাকে আলোকিত করে।
وَالنَّهَارِ إِذَا جَلَّاهَا
(৪) শপথ রাতের, যখন সে তাকে আচ্ছাদিত করে।
وَالسَّمَاءِ وَمَا بَنَاهَا
(৫) শপথ আসমানের এবং যিনি তা নির্মাণ করেছেন তাঁর।
وَالْأَرْضِ وَمَا طَحَاهَا
(৬) শপথ পৃথিবীর এবং যিনি তাকে বিস্তৃত করেছেন তাঁর।
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا
(৭) শপথ মানুষের এবং শপথ তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন।
সূরার নামকরণ ও আমল
সূরার প্রথম আয়াতের “الشَّمْسِ” শব্দ থেকেই উক্ত সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরায় সফলকামদের বৈশিষ্ট্য এবং ব্যর্থদের ব্যর্থতার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে।
যে ব্যক্তি কোন কর্মের পরিণতি সম্পর্কে অবগত হতে চায়, সে যেন রাত্রিকালে পবিত্র পোশাক পরিধান করে কেবলামুখী হয়ে সূরা আস শামস, সূরা ওয়াল লাইল, সূরা ওয়াত ত্বীন এবং সূরা এখলাছ সাতবার করে পাঠ করে এবং আল্লাহ পাকের দরবারে বিনীত হয়ে এ আরজী পেশ করে যে, হে আল্লাহ! আমাকে এ কাজটির পরিণতি জানিয়ে দাও। এভাবে এ আমলটি সাতদিন করবে। এ আমল সম্পর্কে কাউকে অবহিত করবে না। আশা করা যায় আল্লাহ পাক এর বরকতে তার কাম্য বিষয় সম্পর্কে তাকে অবগত করবেন।
সংক্ষিপ্ত আলোচনা
ছোট্ট সূরাটির মধ্যে আল্লাহ তাআলা বিশ্ব-প্রকৃতির মধ্য থেকে বেশ কয়েকটি সুন্দর ছবি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। এছাড়াও মানব সৃষ্টির রহস্য ও তার প্রকৃতিগত শক্তিনিচয়, তার ঝোঁক প্রবণতা, তার পছন্দ ও ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে তার নিজস্ব দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে এক বিশদ আলোচনা ফুটিয়ে তুলেছেন, যা সূরাটিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
এরপর আলোচনা এসেছে সামুদ জাতির ইতিহাস নিয়ে। কিভাবে তারা তাদের রাসূলকে মিথ্যাবাদী সাজালো, ভয়-ভীতি প্রদর্শন করলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত উটনীকে কিভাবে পা কেটে দিয়ে হত্যা করলো, তার পরিণতিতে কিভাবে তাদের ওপর ধ্বংস ও সামগ্রিক অধঃপতন নেমে এলো। এগুলো সবই ছিল সে হতভাগাদের ব্যর্থতা ও ধ্বংসের উদাহরণ, যারা পাপাচারী তাদের পাপ কাজ করার জন্য আল্লাহ তাআলা কিছু ঢিল দেন, যার কারণে বহু পাপ কাজে তারা লিপ্ত হয়ে যায়। আল্লাহর ভয়-ভীতিকে তারা শিকেয় তোলে রাখে, যেমন এই সূরার প্রথম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘অবশ্যই সাফল্য লাভ করলো সে, যে নিজেকে পবিত্র রেখেছে এবং ব্যর্থ হলো সে, যে তার নফসকে কলুষিত করেছে।
তাফসীর
সূরাটিতে আল্লাহ তাআলা ধারাবাহিকভাবে তাঁর সাতটি বড় বড় মাখলুক নিয়ে কসম করেছেন। এই কসমের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে- সৃষ্টিলোকের সব কিছুর মধ্যেই যে বিশেষ বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, তা ফুটিয়ে তোলা এবং সেদিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, যাতে মানুষ সে সব কিছুর তাৎপর্য বুঝার চেষ্টা করে এবং এগুলোর সাথে মানুষের সম্পর্ক কী তা নিয়ে ভাবতে পারে।
সূর্য ও চন্দ্রের শপথ
প্রথমেই আল্লাহ তাআলা সূর্য ও তার উজ্জ্বল আলোকের শপথ করেছেন। এটা আল্লাহ তাআলার একটি অন্যতম বড় মাখলুক এবং নিদর্শন। সাধারণভাবে সূর্যের কসম খাওয়া হয়ে থাকে, কিন্তু এখানে সূর্যের কসম খাওয়ার সাথে সাথে দিকচক্রবালে উদীয়মান সদ্যস্নাত প্রভাত-বেলার এই স্নিগ্ধ আলো বড়োই মধুর, বড়ই মনোমুগ্ধকর একথা বলা হয়েছে। আরও মিষ্টি লাগে তখন যখন শীতের সকালের স্বচ্ছ আকাশে উদীয়মান সূর্য মুঠো মুঠো রূপালী আলো ছড়িয়ে শীতক্লিষ্ট শরীরগুলোকে উত্তপ্ত করে তোলে। আর গ্রীষ্মকালে এশরাকের নামাযের সময়ে প্রভাতের আলোর সৌন্দর্য বড়ই চমৎকার লাগে, যেহেতু দুপুরের প্রাণান্তকর তাপের ছোঁয়া লাগার পূর্বেই এ সময়ের সুশীতল স্নিগ্ধতা হৃদয়-মনকে পুলকিত করে। এ আলোর ছটায় আশপাশের সবকিছু স্বচ্ছ ও আলোয় ঝলমল হয়ে ওঠে।
অবশ্য কাতাদাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন- এখানে ‘দ্বুহা’ দ্বারা সারা দিন উদ্দেশ্য। ‘কামুস’ অভিধানে লেখা রয়েছে ‘দ্বাহিয়্যাতু’ অর্থ- ক্রমবর্ধমান দিবস। ‘দ্বুহা’ এবং ‘দ্বিহা’ উভয় শব্দের অর্থ- দ্বিপ্রহরের পূর্বক্ষণ।
‘শপথ চন্দ্রের, যখন তা সূর্যের পর আবির্ভূত হয়’। বলা বাহুল্য চন্দ্র উদ্ভাসিত হয় সূর্যাস্তের পরেই। আর তার এ অবস্থা থাকে চান্দ্রমাসের প্রথম অর্ধাংশে। অথবা কথাটির মর্মার্থ হবে- ওই সময়ের চন্দ্রের শপথ! যখন তা হয় ষোলো কলায় পরিপূর্ণ, প্রায় সূর্যের মতো উজ্জ্বল ও গোলাকার। আর চন্দ্রের এরূপ সৌন্দর্য ফোটে চান্দ্রমাসের তের, চৌদ্দ ও পনের তারিখের রাতে।
চাঁদের সাথে মানুষের মনের গভীর ভালোবাসা বহু প্রাচীন কাল থেকে কিংবদন্তীর মতো প্রচলিত রয়েছে। এ ভালোবাসা মানব মনের গভীরে প্রথিত। চাঁদের এ আলো মানুষের মনের গহীনে বরাবরই প্রেম-ভালোবাসার আবেগ জাগায়।
এই চাঁদনী রাতেই প্রেমিক মন আল্লাহ তাআলার মহব্বতের সুধা পান করে তাঁর প্রেমগাথা গাইতে গাইতে মুগ্ধ আবেগে আত্মহারা হয়ে যায়, বিধৌত হয়ে যায় তার কলুষিত মন। জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলোকে অবগাহন করে প্রেমাস্পদ আল্লাহ তাআলার আলিঙ্গনে নিজেকে সঁপে পরম পরিতৃপ্তির নিশ্বাস ছাড়ে।
দিন ও রাতের শপথ
‘শপথ দিবসের, যখন সে তাকে প্রকাশ করে’। একথার অর্থ- শপথ দিবসের, যা উজ্জ্বল করে দেয় সূর্যকে, অথবা অন্ধকারকে, কিংবা পৃথিবীকে। সমুজ্জ্বল করার সঙ্গে এখানে দিবসের সম্পৃক্তি ঘটেছে রূপকার্থে।
কুরআন পাক বিশেষভাবে আরও যে বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে তা হচ্ছে, সূর্য উদয়ের সাথে সাথে আশেপাশের সব কিছু আলোকজ্জ্বল হয়ে যায় এবং এগুলো মানুষের হৃদয়ানাভূতিতে বিপুল সাড়া জাগায়। মানুষের অবচেতন মনে তার অজান্তেই আলোকোজ্জল দিন এমন এক আনন্দানুভূতি সৃষ্টি করে, যা ব্যক্ত করতে মানুষের ভাষা সত্যিই অক্ষম। মানুষের জীবনে দিনের আলোর প্রয়োজন ও প্রভাব যে কতো গভীর, তা প্রত্যেক মানুষই জানে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই দিনের সৌন্দর্য ও তার প্রভাব সম্পর্কে উদাসীন থাকে। এজন্যই এখানে তাদের অনুভূতিতে সাড়া জাগানোর উদ্দেশ্য এবং কতো ব্যাপকভাবে এসব জিনিস মানুষের জীবনে ক্রিয়াশীল, সে বিষয়ে সজাগ করার জন্য এই বিষয়গুলোর অবতারণা করা হয়েছে।
এমনি করে কসম খেয়ে বলা হয়েছে, ‘রাতের কসম যখন তা পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলে’। আচ্ছন্ন করে ফেলা উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করার বিপরীত। রাতের ঢেকে ফেলা বলতে বুঝায় রাতের আগমনে সব কিছু অন্ধকার হয়ে যাওয়া। যেমন দিনের আলো মানুষের মনকে প্রভাবিত করে, তেমনি রাতের অন্ধকারও বিভিন্নভাবে মানুষের মনের ওপর ক্রিয়াশীল।
আকাশ ও পৃথিবীর শপথ
‘শপথ আকাশের এবং যিনি তা নির্মাণ করেন, তাঁর’। লক্ষণীয়, এখানে আকাশের উল্লেখ করা হয়েছে তার সৃষ্টিকর্তার আগে। তাই প্রশ্ন জাগে, এটা কি সৌজন্য বিরোধী নয়? স্রষ্টার পূর্বে সৃষ্টির উল্লেখ কি সমীচীন? এর উত্তরে বলা যায়- হ্যাঁ, এটাই তো নিয়ম। এ হচ্ছে ছোট থেকে বড়র দিকে, নিচু থেকে উচ্চতার দিকে যাত্রার প্রক্রিয়া। অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার দিকে গমনই তো অধিক সৌজন্যসম্মত ও সমীচীন।
এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে- ‘শপথ পৃথিবীর এবং যিনি তাকে বিস্তৃত করেছেন, তাঁর’। এখানেও ‘মা’ অব্যয়টি ব্যবহৃত হয়েছে ‘মান’ অর্থে। অর্থাৎ ভূমি ও তার সম্প্রসারণকারীর শপথ। অথবা শপথ ভূপৃষ্ঠের এবং ভূপৃষ্ঠস্থিত সকল কিছুর। এরূপে ব্যাখ্যারীতি প্রযোজ্য হবে পরবর্তী আয়াতেও।
পরের আয়াতে বলা হয়েছে- ‘শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন’। একথার অর্থ- শপথ মানবপ্রবৃত্তির এবং তাঁর, যিনি প্রবৃত্তির স্রষ্টা ও বিন্যাসক। তিনিই তো মানব প্রবৃত্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বৈপরীত্যের সমতা, সুসাম্য ও যথা-উপযোগিতা।
সকল সৃষ্টবস্তুর মধ্যে সৃষ্টি-নৈপুণ্যের বিশেষ বিশেষ দিক চিন্তাশীল হৃদয়কে সত্যিই চমৎকৃত করে, কিন্তু মানব সৃষ্টির মধ্যে যে নৈপুণ্য বর্তমান রয়েছে তার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে তার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে চিন্তা করলে মানুষ দেখতে পাবে যে, এর কোনো একটিকেও যদি নিজস্ব স্থান থেকে সরিয়ে অন্য কোনো জায়গায় স্থাপন করা হয়, তাহলে গোটা দেহযন্ত্রটা বিকল হয়ে যাবে। মহা শিল্পী আল্লাহর সৃষ্টি পরিকল্পনার এ এক অত্যাশ্চর্য দিক যে, দেহযন্ত্রের মধ্যে যে যন্ত্রাংশটি যেখানে সর্বাধিক খাপ খায়, সেখানেই সেটিকে বসানো হয়েছে। এর যেকোনো বিকল্প চিন্তা শুধু বিপর্যয়ই ডেকে আনতে পারে। তারপর তার মধ্যে তিনি দিয়েছেন যুগপৎ পাপ-প্রবণতা ও আল্লাহভীতি এমতাবস্থায় সে-ই সাফল্যমণ্ডিত হবে, যে নিজের প্রবৃত্তিকে পবিত্র রাখলো। আর ব্যর্থতায় ভরে গেলো তার জীবন, যে এ প্রবৃত্তিকে অন্যায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে কলুষিত ও অপবিত্র করলো।
আয়াত ও তরজমা
فَلَا اقۡتَحَمَ الۡعَقَبَۃَ
(১১) তবু সে বন্ধুর গিরিপথ অবলম্বন করতে পারেনি।
وَمَاۤ اَدۡرٰىکَ مَا الۡعَقَبَۃُ
(১২) (হে রাসূল!) আপনি কি জানেন বন্ধুর গিরিপথ কি?
فَکُّ رَقَبَۃٍ
(১৩) এটি হলো দাসমুক্তি,
اَوۡ اِطۡعٰمٌ فِیۡ یَوۡمٍ ذِیۡ مَسۡغَبَۃٍ
(১৪) অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে খাবার খাওয়ানো।
یَّتِیۡمًا ذَا مَقۡرَبَۃٍ
(১৫) এতীম আত্মীয়কে।
اَوۡ مِسۡکِیۡنًا ذَا مَتۡرَبَۃٍ
(১৬) অথবা দারিদ্র-পীড়িত নিঃস্বকে,
ثُمَّ کَانَ مِنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ تَوَاصَوۡا بِالصَّبۡرِ وَ تَوَاصَوۡا بِالۡمَرۡحَمَۃِ
(১৭) এরপর সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যারা ঈমান এনেছে। যারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় সবর অবলম্বনের এবং দয়া-দাক্ষিণ্যের।
اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡمَیۡمَنَۃِ
(১৮) এরাই তো পরম সৌভাগ্যবান।
وَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِنَا هُمۡ اَصۡحٰبُ الۡمَشۡـَٔمَۃِ
(১৯) আর যারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে, তারাই হতভাগা।
عَلَیۡهِمۡ نَارٌ مُّؤۡصَدَۃٌ
(২০) তারাই হবে অগ্নিতে অবরুদ্ধ।
তাফসীর
(অন্যায়ের গিরিপথটি পার হওয়ার এবং ন্যায়ের উচ্চাসনে ওঠার) সে কোনোদিনই হিম্মত দেখায়নি। অর্থাৎ এত বিপুল পরিমাণ নেয়ামতের বৃষ্টিবর্ষণ আর হেদায়াতের কার্যকারণ বর্তমান থাকতেও দ্বীনের ঘাটিতে কুদে পড়ার তাওফীক তার হল না। তাওফীক হলো না তার উন্নত চরিত্রের পথ অতিক্রম করে কল্যাণ আর সাফল্যের সুউচ্চ স্থানে পৌঁছার। এখানে ‘আক্বাবাহ’ শব্দ দ্বারা বুঝানো হয়েছে গিরিপথকে, যা সাধারণত হয় বন্ধুর।
হযরত ইবনে ওমর রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, এই বন্ধুর গিরিপথটি হচ্ছে জাহান্নামের একটি পার্বত্য পথ। হাসান ও কাতাদা বলেছেন, ‘আক্বাবাহ’ হচ্ছে জাহান্নামের সেতু পারাপারের একটি গিরিপথতুল্য পথ, যা অতিক্রম করা যায় কেবল আল্লাহপাকের আনুগত্যের দ্বারা।
মুজাহিদ, যুহাক ও কালাবী বলেছেন, জাহান্নামের উপরে স্থাপিত সেতুর নাম আক্বাবাহ, যা তলোয়ারের ধার অপেক্ষা তীক্ষ্ণ এবং যার চড়াই-উত্রাই ও দৈর্ঘ্যের পরিমাণ তিন হাজার বছর পথের দূরত্বের সমান। তার দু’পাশে রয়েছে শাদা বৃক্ষের কণ্টকসদৃশ কণ্টক ও বাঁধানো আংটি। কেউ সে পথ অতিক্রম করবে অনায়াসে, কেউ ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে। কেউ অশ্বারোহীর মতো দ্রুতগতিতে। আবার কেউ অধোমুখী হয়ে পড়ে যাবে জাহান্নামের আগুনে। কেউ চলবে ঝড়ের বেগে, কেউ পদব্রজে কেউ নিতম্ব ঘষতে ঘষতে। কেউ কেউ আবার কাটার আঁচড়ে জখম হতে হতে এক সময় লুটিয়ে পড়বে জাহান্নামে।
ইবনে জায়েদ বলেছেন, ‘সে তো বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেনি’ অর্থ- সে তো চলেনি পরিত্রাণের পথে।
মানবতার অতন্দ্র প্রহরী একমাত্র ইসলাম
এরপর, এ লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্ব ও মাহাত্ম তুলে ধরা হয়েছে এই আয়াতে, ‘(হে রাসূল!) আপনি কি জানেন বন্ধুর গিরিপথ কি?’ আসলে এ কথার দ্বারা এই পথের জটিলতা তুলে ধরাই শুধু উদ্দেশ্য নয়, বরং আল্লাহর কাছে আসল গুরুত্ব হচ্ছে কষ্টকর হলেও এই পথটি পার হতে হবে একথাটি বলা। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বলতে চান, এ পথটি অত্যন্ত কঠিন সন্দেহ নেই, কিন্তু তোমাদেরকে এ পথটি পার হতেই হবে। কারণ সে পথটি অতিক্রম করতে পারলেই মনযিলে মকসুদে উপনীত হতে পারবে।
এই পর্যায়ে আরও একটি কথা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে, মূল্যবান জিনিস মূল্য দিয়েই গ্রহণ করতে হয়। চাওয়া-পাওয়ার লক্ষ্যবস্তু যতো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান হবে তা অর্জন করতে ততো বেশি কষ্ট করতে হবে ও অজস্র ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে একথাটিও এখানে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সে কঠিন পথ-পরিক্রমা তথা কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার কখনও বৃথা যেতে পারে না। সর্বশক্তিমান ও সবকিছুর মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এ আশ্বাসবাণী পাঠকের মনকে অবশ্যই উৎসাহিত করবে। আশার আলোকে উদ্ভাসিত করবে তার গোটা দেহ মনকে। আল্লাহ তাআলার এই চিত্তাকর্ষক ভাষার মাধ্যমে ‘আক্ববাহ’র যে ছবিটি এখানে ফুটে উঠেছে, তা মানুষকে আলোচ্য সত্য সঠিক লক্ষ্য বস্তুর গুরুত্ব ও মাহাত্ম বুঝতে সাহায্য করেছে এবং সেই দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই আয়াতগুলোতে এক মধুর আবেগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
ছিন্নবস্ত্র ও অসহায় মানব সন্তান গোলামীর জিঞ্জীর পরে তোমার দুয়ারে কী করুণ অবস্থায় দাড়িয়ে আছে। চেয়ে দেখো একবার হে সভ্যতাগর্বী মানুষ! মানবতার এ নিদারুণ ব্যথা দূর করার জন্য তুমি কি এগিয়ে আসবে না? সৃষ্টিকর্তার রহস্য প্রত্যাশী হে মুমেনরা! বস্ত্রহীন সেই অসহায় মানুষকে গোলামী থেকে মুক্ত করা, অন্নকষ্টে জর্জরিত বুভুক্ষু আদম সন্তানকে অনুদান করা, ব্যাধিগ্রস্ত, রোগক্লিষ্ট, শক্তিসামর্থহীন, পথের কাংগাল, যারা সকল যামানায় বিত্তশালী ও যুলুমবাজদের হিংগ্র ব্যবহারে নিষ্পিষ্ট, তাদের উদ্ধারকল্পে এবং মানবতার গৌরবাসনে তাদেরকে পুনরায় সমাসীন করতে তোমরা এগিয়ে এসো। হে মুমেন, মুছে দাও অবহেলিত মানবতার এই নিদারুণ গ্লানি, তবেই তো তুমি রহমানুর রহীমের করুনা ধারা পাবে। মানবতার এই মুক্তি ধারায় যারা সঠিক অবদান রাখতে পেরেছে তাদের জন্য পরবর্তী আশ্বাসবাণী ‘তারপর তারা ওই সকল ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে, সবর করার জন্য ও যথাযথভাবে দুস্থ মানবতার প্রতি দয়াপরবশ হওয়ার জন্যও একে অপরকে উপদেশ দিচ্ছে।’
দাস আযাদ করার ফযীলত
আলোচ্য (১৩নং) আয়াতে বলা হয়েছে- ‘এটা হচ্ছে দাসমুক্তি’। ‘ফাককু রকাবাতিন’ এর শাব্দিক অর্থ- গ্রীবামুক্তি। মর্মার্থ- দাসমুক্তি। বক্তব্যটি সাধারণার্থক। এর অর্থ একজন ক্রীতদাসকে পূর্ণরূপে মুক্ত করে দেওয়া, অথবা তাকে মুক্ত করে দেওয়া তার মূল্য পরিশোধ করে। অথবা লিখিত শর্তে মুক্তি প্রাপ্য দাসকে মুক্তির ব্যাপারে আর্থিক সহায়তা দান। কিংবা যে ক্রীতদাসের মুক্তিপণের কিছু অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় আছে, তার সেই অপরিশোধিত অংশ পরিশোধ করে দেওয়া। অর্থাৎ সকল ধরনের ক্রীতদাস মুক্তিই আলোচ্য আয়াতের বক্তব্যভূত।
মক্কায় ইসলামের চরম দুর্দিনে এ আয়াতগুলো নাযিল হয়। ইসলামী শরীয়তের বিধিবিধান চালু করার জন্যে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রক্ষমতা তখনও রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাতে আসেনি আর সেই সময় সাধারণভাবে আরবের সে সমাজে দাস-প্রথা চালু ছিল। আরব উপদ্বীপের বাইরে অনেক জায়গাতেও এ বিশ্রী প্রথা চালু ছিল। তখনকার দিনে দাসদেরকে অত্যন্ত কঠিনভাবে খাটানো হতো। তারপর এক সময় তাদের মধ্যে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। যেমন : আম্মার ইবনে ইয়াসের ও তাঁর পরিবার, বেলাল ইবনে রাবাহ, সোহায়ব এবং আরও অনেকে (আল্লাহ তাআলা তাঁদের সবার ওপর সন্তুষ্ট থাকুন)। তাঁদের দাম্ভিক মুনিবরা তাঁদের ওপর অশেষ নির্যাতন চালাতো। ইসলাম গ্রহণ করার পর এই নির্যাতন আরো বাড়িয়ে দিলো। তাঁদের এই দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্ত করার একটিই পথ ছিল আর তা হলো, হৃদয়হীন নিষ্ঠুর মুনিবদের থেকে তাঁদেরকে খরিদ করে মুক্ত করে দেয়া। আবু বকর রাযিআল্লাহু আনহু ছিলেন সেই প্রথম ব্যক্তি, যিনি এ ব্যাপারে সবার আগে এগিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে পাওয়া আল্লাহর এই ডাকে সাড়া দেন। দাস-মুক্তি ও অন্যান্য হুকুম পালনের ব্যাপারে তার সাহসিকতাপূর্ণ কাজ আজও এক নযীরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
হযরত বারা ইবনে আজীব রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, একবার এক বেদুইন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে বললো, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন কিছু করতে বলুন, যা আমাকে নিয়ে যাবে জান্নাতে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার কথা ছোট্ট, কিন্তু এর আবেদন বিশাল। ঠিক আছে, ক্রীতদাস মুক্ত করো। মুক্ত করে দাও গ্রীবা।’ বেদুইন বললো, কর্ম দু’টো কি এক নয়? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘ক্রীতদাস মুক্ত করার অর্থ- পুরোপুরি একজন ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেওয়া। আর গ্রীবা মুক্ত করার অর্থ- কোনো ক্রীতদাস-ক্রীতদাসীকে মুক্তিপণ পরিশোধের ব্যাপারে আর্থিকভাবে অংশ গ্রহণ। আর শোনো, ক্রীতদাস মুক্ত করার সামর্থ্য যদি তোমার না থাকে, তবে অনাহারীকে আহার করিয়ো। পানি পান করিয়ো পিপাসার্তকে। সৎকর্মের আদেশ দিয়ো এবং বিরত থাকার উপদেশ দিয়ো অসৎকর্ম থেকে। তাও যদি না পারো তবে জিহ্বাকে সংযত রেখো। ভালো কথা ছাড়া মন্দ কথা বলো না।’ (বায়হাকী)
ধর্যের অনুশীলন ও দয়া দেখানোর উপদেশ
‘এরপর সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যারা ঈমান এনেছে। যারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় সবর অবলম্বনের এবং দয়া-দাক্ষিণ্যের।’ বাক্যটির যোগসূত্র রয়েছে ‘বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেনি’ অথবা ‘এটা হচ্ছে দাসমুক্তি’ এর সাথে। এখানে ‘ছুম্মা’ (তদুপরি, অতঃপর) হচ্ছে অনুক্রমিক অব্যয়। এর পূর্বাপর বিষয় হয় পৃথক পৃথক। দাসমুক্তি, অনুদান ইত্যাদি পুণ্যকর্ম ও ঈমান পৃথক পৃথক বিষয়। তবে ঈমান হচ্ছে যাবতীয় পুণ্যকর্মের ভিত্তি।
এরপর বলা হয়েছে ‘এরাই তো পরম সৌভাগ্যবান।’ অর্থাৎ এসব লোক বড়ই সৌভাগ্যবান এবং মোবারক, যারা মহান আরশের ডান দিকে স্থান পাবে এবং তাদের আমলনামা দেয়া হবে ডান হাতে।
এরপর বলা হয়েছে ‘তারাই হবে অগ্নিতে অবরুদ্ধ।’ অর্থাৎ এমন আগুন যা তাদেরকে ঘিরে রাখবে। এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, যখন তারা দোযখের আগুনে শাস্তি পেতে থাকবে, তখন তার দরজাগুলো বন্ধ থাকার কারণে তার তাপ বের হওয়ার কোনো রাস্তা থাকবে না, অথবা এর অন্য অর্থ এটা হতে পারে যে, ওরা সে আযাবের জায়গা থেকে কোনোভাবেই আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। কেননা আল্লাহরই হুকুমে ও ব্যবস্থাপনায় তাদের ওখানে আবদ্ধ থাকা। অতএব, সে প্রতিবন্ধকতা দূর করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। অবশ্য দুটি অর্থ একে অন্যের পরিপূরক; বিরোধী নয়।
এই স্বল্প পরিসরে মানুষের সীমিত শক্তি ও ব্যাখ্যার যোগ্যতায় উপস্থাপিত এগুলোই হচ্ছে মানব-জীবনের মৌলিক সত্য, যা ঈমানী দৃষ্টিকোন থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে এবং এগুলো কুরআনের বিশেষ বর্ণনাভংগি ও একক ব্যখ্যায় বর্ণিত চরম সত্য।
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫
কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT