আল্লামা ইকবালের একটি পঙক্তি দিয়ে শুরু করি—
ﻭﺟﻮﺩ ﺯﻥ سے ﮨﮯ ﺗﺼﻮﻳﺮ ﻛﺎﺋﻨﺎﺕ ﻣﻴﻰ ﺭﻧﮓ
ﺍﺳﯽ ﮐﮯ ﺳﺎﺯ سے ﮨﮯ ﺯﻧﺪﮔﯽ ﮐﺎ ﺳﻮﺯ ﺩﺭﻭﻥ
অর্থাৎ, ‘যদি জগৎ-সংসারের ছবি আঁকতে চাও, তাহলে নারী হচ্ছে সেই ছবির বর্ণ। তারই নির্মাণে সৃষ্টি হয় জীবনের হৃদয়োত্তাপ।’
মানবজাতির এক অপরিহার্য অংশ হলো নারী। নারী রূপনগরের রানি, সৌন্দর্যের সমাহার। যদিও পুরুষরা নারীর দায়িত্ব ও কর্তৃত্বশীল, যেমনটি মহান আল্লাহ তার বলিষ্ঠ গ্রন্থে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু একজন পুরুষের ভূমিষ্ঠের রোদন থেকে প্রাণ নির্গতের বিলাপ পর্যন্ত নারী হচ্ছে তার স্তম্ভ, তার যাবতীয় বিষয়ের কাঠামো ও তার জীবনের নিবিড় রহস্য। সুহাসিনী চাঁদ নারীর মুখের চেয়ে মোহনীয় নয়। অমাবস্যার বন তার কেশের চেয়ে অন্ধকার নয়। তার আচলের মেঘে জ্বলজ্বল করে দশটি অঙুলের শুভ্র শিখা। তার দৃষ্টিতে আছে পৃথিবীর সেরা মৌচাক, ভ্রুলতার গোপন তরবারি তাকে পাহারা দিচ্ছে। তার হাসির ভেতর থাকে হাজারো তিরন্দাজ, ধনুক ছাড়াই তারা বিদ্ধ করে বীরের হৃদয়। তার বুকের ভিতর নিখিলের জীবন জমে আছে। তার দুগ্ধে আছে অস্তিত্বের সার। তার রক্ত থেকে তৈরি হয় সভ্যতার ভ্রূণ। তার কপালে একটি অনুপম পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে আছে, যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় পরমের নিপুণ শিল্পকলা। নারীবিহীন ঘর খাঁ খাঁ গোরস্তান। নারীবিহীন হাওয়া জীবনের অস্থিরতা। নারী যদি না থাকতো, তাহলে এই ফুলের বাগান হয়ে যেতো নিথর শোকসভা। ঘাস হয়ে যেতো হলুদ। পাখিরা মাতম ছাড়া সব গান ভুলে যেতো। নারী অসংখ্য বৈপরীত্বের আধার। তার মাঝে লুকিয়ে আছে অগণিত কল্যাণকর গুণাবলি, সেসব গুণাবলীর কারণে তার সুরক্ষা নিয়ে আছে সমূহ চিন্তা। একজন নারী পরিবারের সকল সদস্যের হৃদয়ের অভিভাবক, সন্তানদের ছায়া এবং স্বামীর রক্ষাকবচ।
‘মহিলা’ শব্দটিই তো এসেছে ‘মহল’ থেকে। মহিলা মানেই মহল মে রহনেওয়ালী অর্থাৎ মহলে (ঘরে) থাকে যে। তাই ইসলাম বলে, নারী মঞ্চের প্রদীপ নয়; বরং মহলের প্রদীপ। এখান থেকেই সূত্র নারীর জন্য ইসলামের পর্দা বিধান। পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াত এবং নবীজির অসংখ্য হাদীসে এর প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। শুধু ইসলামেই নয়, পৃথিবীর টপ লেভেলের সব কয়টি ধর্মে এর উপর গুরুত্ব ও কঠোর নির্দেশ রয়েছে।
এক.
খ্রিস্ট ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের নিউটেস্টামেন্টের ১ করিন্থীয়, অধ্যায় : ১১, অনুচ্ছেদ : ৫-৬ তে বলা হয়েছে- ‘ভালো স্ত্রী যদি মস্তক আবৃত না রাখে, সে চুল কাটিয়া ফেলুক, কিন্তু চুল কাটিয়া ফেলা বা মুণ্ডন করা যদি স্ত্রীর পক্ষে লজ্জার বিষয় হয়, তবে মস্তক আবৃত রাখুক।’
তাছাড়া বাইবেলের ১ পিটার, অধ্যায় : ৩, অনুচ্ছেদ : ২-৫ তে বলা হয়েছে- ‘তোমার সৌন্দর্য, তোমার পরিপাটি চুল, দামি গহনা, উন্নত সাজ-সজ্জা কিংবা পোশাক-আশাক থেকে প্রকাশ পাওয়া উচিত নয়।’
ইয়াহুদী ধর্মগ্রন্থ বাইবেল ওল্ডটেস্টামেন্টের আদি পুস্তক, অধ্যায় : ২৪, অনুচ্ছেদ : ৬৪-৬৫ তে বলা হয়েছে- ‘আর বিবিকা চক্ষু তুলিয়া যখন ইসহাককে দেখিলেন, তখন উষ্ট্র হইতে নামিয়া সেই দাসকে জিজ্ঞেস করিলেন, আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে ক্ষেত্রের মধ্য দিয়া আসিতেছেন, ঐ পুরুষ কে? দাস কহিলেন, উনি আমার কর্তা। তখন বিবিকা বোরকা লইয়া আপনাকে আচ্ছাদন করিলেন।’
হিন্দুদের প্রধানধর্মগ্রন্থ ঋগবেদের গ্রন্থ : ১০, অনুচ্ছেদ : ৮৫, পরিচ্ছেদ : ৩০ তে বলা হয়েছে- ‘হে নারী, তুমি নিচে দৃষ্টি রাখ, ঊর্ধ্বে দৃষ্টি করিও না। আপন পদযুগল একত্রে মিলাইয়া রাখ। তোমার নাক যেন কেউ দেখতে না পায়। যদি এমন লজ্জাবতী হতে পার, তাহলে নারী হয়েও তুমি সম্মানের পাত্রী হতে পারিবে।’
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিঠকের ‘গৃহিণী পর্ব’ : নারীদের কর্তব্য : ২৫২-২৫৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- ‘পর পুরুষের প্রতি ভ্রমেও খারাপ মনোভাব নিয়া দৃষ্টিপাত করিবে না। সর্বদা পরিষ্কার বস্ত্র ব্যবহার করিবে। পুরুষ সম্মুখে চুল আঁচড়াইবে না এবং উকুন ধরিবে না।’
দুই.
পর্দা নারীর স্বভাবজাত বিষয়। কেননা লজ্জাশীল ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন যে কোন ব্যক্তিই এ দাবি করে যে, তার স্ত্রী পর্দায় থাকুক। কোন অসভ্য, জংলি মানুষও এটা মেনে নিবে না যে, তার স্ত্রী অন্য পুরুষের সামনে উলঙ্গ চলাফেরা করুক, অন্য পুরুষের ভোগের সামগ্রী হোক। আর এজন্যই শরীয়ত স্বভাবজাত বিষয়সমূহকে অধিক গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেনি। কেননা স্বভাবজাত বিষয়সমূহকে মানুষ নিজ স্বার্থেই মেনে নিবে। তাই দেখা যায় প্রস্রাব-পায়খানা নাপাক এবং তা থেকে পবিত্র হওয়া সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করা সত্ত্বেও কুরআন-হাদীসের কোথাও একথা বলা হয়নি যে, প্রস্রাব-পায়খানা খাওয়া হারাম। কেননা মানুষ স্বভাবগত কারণেই এগুলো খাওয়া থেকে বিরত থাকবে।
উল্লিখিত নিয়মের দাবি তো এটাই যে, শরীয়তের পক্ষ থেকে পর্দার বিধি-বিধান সম্পর্কে কোন আলোচনা করা হবে না; কিন্তু শরীয়ত প্রবর্তকের একথা ভালো করেই জানা ছিল যে, এমন এক সময় আসবে যখন মানবীয় স্বভাব-প্রকৃতির উপর পাশবিকতা জয়লাভ করবে। লজ্জা-শরম কমে যাবে। সর্বত্র বেহায়াপনা ও নির্লজ্জতা ছেয়ে যাবে। তখন মানুষ তার স্বভাবগত চাহিদা পর্দার প্রতি মোটেই সম্মান প্রদর্শন করবে না। এজন্য তিনি পূর্বেই পর্দার যাবতীয় বিধি-বিধান পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণনা করে দিয়েছেন।
শরীয়ত কর্তৃক পর্দার বিধান আরোপ করার মূল কারণ হল, নারীর লজ্জাশীলতা। আর লজ্জাশীলতা নারীর এমনই এক স্বভাবজাত গুণ, যা বর্জন করা নারীর জন্য খুবই কষ্টকর। এজন্য পর্দা বর্জন করতে বললে, নারীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ পায় না, বরং তার উপর নির্যাতন করা হয়। পক্ষান্তরে নারীর স্বভাবজাত গুণের প্রতি লক্ষ্য রেখে তাকে পর্দা করতে বললে তার উপর জুলুম করা হয় না, বরং এর মাধ্যমেই নারীর প্রতি প্রকৃত সহমর্মিতা প্রকাশ করা হয়। এখন কোন নারী যদি পর্দাকে নিজের জন্য ‘অনুগ্রহ’ মনে না করে ‘আত্মনিগ্রহ’ মনে করে, তাহলে বুঝতে হবে যে, সে প্রকৃত পক্ষে নারী নয়। নারীর শ্রেষ্ঠ গুণ লজ্জাশীলতা তার মাঝে বিদ্যমান নেই। আর এ ধরনের নারী সম্পর্কে আমরা আলোচনাও করছি না। আমরা তো সে সকল নারীর ব্যাপারে আলোচনা করছি, যাদের মাঝে লজ্জাশীলতার সহজাত গুণ বিদ্যমান রয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, আমরা এমন এক সময় অতিবাহিত করছি, যখন সহজাত গুণাবলীকেও যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে প্রমাণিত করতে হয়।
পর্দা আবশ্যকীয়তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক দিক হলো, নারী স্বভাব ও প্রচলনগতভাবে পুরুষের অনুগত। আর পুরুষ প্রেম-ভালোবাসা ও হৃদয়াবেগের কারণে নারীর অনুগত। নারীর প্রতি পুরুষের এ আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রেম-ভালোবাসা অবশিষ্ট থাকে। আর প্রেম-ভালোবাসা ততক্ষণই অবশিষ্ট থাকে যতক্ষণ উভয় (নারী-পরুষ) পর্দার বিধান মেনে চলে। এটি কোন বাহুল্য দাবি নয়; বরং যুক্তিগত দিক থেকেও এ দাবি সমর্থিত।
জনৈকা ইউরোপিয়ান নারী তার লেখা এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন— আজকাল নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে বেপর্দা করে রাস্তায় নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে, তা নারী জাতির জন্য এক আত্মঘাতী পদক্ষেপ। কেননা বর্তমানে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই গুরুত্ব প্রদান করার আসল কারণ হলো একজনের প্রতি আরেকজনের গভীর উপলব্ধি, প্রেম-ভালোবাসা ও হৃদয়াবেগ। আর প্রেম-ভালবাসা ও হৃদয়াবেগের দাবি হলো, প্রিয়জনকে একান্ত নিজের করে পাওয়া। অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, যে জিনিস একান্ত নিজের করে পাওয়া যায় না, তার সাথে গভীর হৃদায়াবেগ সৃষ্টি হয় না। নারী-পুরুষের সম্পর্কের ঐকান্তিকতা এবং দুজন দুজনকে একান্ত নিজের করে পাওয়ার বৈশিষ্ট্য একমাত্র ইসলামী পর্দাপ্রথার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। দুজন নারী-পুরুষ যখন যথার্থভাবে পর্দা পালন করে চলে, তখন তাদের প্রেম-ভালোবাসার মাঝে কেউ ভাগ বসাতে পারে না। তাদের প্রেমের বাগানে ফোটা ফুলের সৌরভ শুধু তারাই উপভোগ করে; অন্য কেউ নয়।
প্রকৃতিও আমাদেরকে নারীর পর্দার কথা বলে। আমরা দেখি, ছেলেরা ছোটবেলায় চোর-পুলিশ, দৌড়াদৌড়ি ইত্যাদি খেলতে ভালোবাসে আর মেয়েরা রান্না-বান্না, পুতুল ইত্যাদি খেলতে ভালোবাসে। তাদের নির্মল অন্তর স্বভাবগত গুণের টানেই এমন ভিন্ন ভিন্ন খেলার দিকে ধাবিত হয়। সুতরাং নারীকে পর্দার সুরক্ষা থেকে বাইরের কাজে নিয়ে আসা শুধু অযৌক্তিকই নয়; প্রকৃতিবিরুদ্ধও।
তিন.
উলঙ্গপ্রেমী ইউরোপ ও তাদের দোসররা মুসলিম নারীর জন্য ইসলামের পর্দা বিধানের উপর কু-যুক্তিমূলক কতেক আপত্তি করে থাকে যেগুলো বালখিল্যতা ছাড়া আর কিছু নয়। যেমন—
(ক) পর্দাবিরোধী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মন্তব্য করা হয় যে, পর্দা মহিলাদেরকে চব্বিশ ঘণ্টা ঘরের চার দেয়ালের জেলখানায় আবদ্ধ রেখে অসুস্থ করে ফেলে। না তারা বাইরে মুক্ত বাতাস অনুভব করতে পারে, না স্বাধীনভাবে বাইরে বের হতে পারে। তাদের অবস্থা হয়ে যায় খাঁচাবন্দি পাখির মত। তাদের এই অসুস্থতার প্রভাব সন্তান-সন্ততির ওপর পড়ে। ফলত পর্দানশিন নারীরা একটি জাতি ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আসলে এটি অন্ধ মনের কাল্পনিক রোগ। যারা হাই সিকিউরিটিতে থাকে তাদের ক্ষেত্রেও তো এমন প্রশ্ন হওয়ার কথা। কই, তাদের ব্যাপারে তো এমন প্রশ্ন তুলা হয় না। অথচ তারা ২৪ ঘণ্টা অফিস, গাড়ি, বাসা, অডিটোরিয়াম ইত্যাদির চার দেয়ালের ভেতরেই আবদ্ধ থাকে।
রোগ-ব্যাধি তো বাসা বাধে; যে শরীর কসরত করে না তাতে। পুরুষরা জরুরি কর্মব্যস্ততার জন্য বিভিন্ন কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করে থাকে, অনুরূপ মহিলারাও তাদের স্বভাবানুযায়ী ঘরোয়া কর্মগুলোর জন্য কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করে থাকে। বেকার ও কর্মহীনতা পুরুষের জন্যও ক্ষতিকর, মহিলার জন্যও ক্ষতিকর। আর তাৎক্ষণিক ব্যাধি বা মৌসুমি রোগ-ব্যাধি থেকে নারী-পুরুষ কেউই মুক্ত নয়।
(খ) পর্দাবিরোধীরা বলে পর্দা নাকি বন্দিশালা। এর উত্তরে বলবো, বন্দিত্ব কাকে বলে? মূলত বন্দিত্ব বলে যা স্বভাব বিরুদ্ধ হয়। যা স্বভাব বিরুদ্ধ হয় না তা কখনই বন্দিত্ব না। অন্যথায় মানুষ যে পায়খানায় পর্দা করে বসে থাকে তাকেও বন্দি বলতে হবে। কেননা পায়খানায় থাকাকালে সকলেই অন্যের দৃষ্টির আড়ালে থাকে এবং সকল থেকে পৃথক থাকে। কিন্তু কেউই এই আড়াল হওয়াকে এবং একাকী থাকাকে বন্দিশালা বলে না। কেননা এটা স্বভাববিরোধী না, বরং এটা সকল মানুষেরই স্বভাব চাহিদা, এ সময় সে সকলের দৃষ্টির আড়ালে থাকবে। তাই কেউ এ কথা বলে না যে, আমি আজ এতটা সময় পায়খানায় বন্দি ছিলাম। কিন্তু অপ্রয়োজনে যদি কাউকে পায়খানায় আটকে রেখে বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং একজন পাহারাদার নিযুক্ত করে তাকে বলা হয়, সাবধান! এ লোক যেন কিছুতে এখান থেকে বের হতে না পারে। তাহলে অবশ্যই এটা সকলের স্বভাববিরুদ্ধ হবে এবং এ কারণে এটাকে বন্দি বলা হবে। উপরন্তু আটককারীর বিরুদ্ধে অযথা একজন লোককে বন্দি করে রাখার অপরাধে মামলা দায়ের করাও যেতে পারে।
এখন আপনি নিজেই বলুন, উল্লিখিত অবস্থা দুটির মাঝে পার্থক্য কী? পার্থক্য এই যে, প্রথম অবস্থার ‘বন্দিত্ব’ স্বভাব বিরুদ্ধ নয়। আর দ্বিতীয় অবস্থার ‘বন্দিত্ব’ স্বভাব বিরুদ্ধ। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, প্রত্যেক নিষেধাজ্ঞাকেই বন্দিদশা বলে না। বরং স্বভাব বিরুদ্ধ নিষেধাজ্ঞাকে বন্দিদশা বলে। অতএব আপনাকে অবশ্যই এটা যাচাই করতে হবে যে, মুসলমান নারীদের যারা পর্দায় থাকেন; পর্দা কী তাদের স্বভাববিরুদ্ধ না স্বভাব-সম্মত? তারপর আপনি পর্দা ‘বন্দিদশা’ বা ‘বন্দিদশা না’’ সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারবেন।
থানবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নারীর লজ্জাশীলতার দাবি হলো, সে পর্দা দ্বারা আবৃত থাকবে। এই লজ্জাশীল নারীদেরকে জোর জবরদস্তি ঘরের বাইরে নিয়ে আসাই নারী জাতির স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। এজন্য পর্দাকে ‘বন্দিশালা’ না বলে জোর করে নারীকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসাকেই বন্দিদশা বলা উচিত।
অনেকে ঘরের শান্ত পরিবেশে থাকাকে নিজের জন্য বন্দিদশা মনে করে। আমি বলি, এটাকে বন্দিদশা বলে না; বরং প্রকৃতপক্ষে বন্দিদশা হলো ঘরের শান্ত পরিবেশ ছেড়ে বাহিরের অশান্ত পরিবেশে যাওয়া। কেননা বন্দি বলতে বুঝায় কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোথাও আটকে রাখাকে। নিজের ঘরের মধ্যে থাকাকে কেউ বন্দি থাকা বলে না। অনুরূপভাবে সুস্থ মানসিকতার অধিকারিণী যে কোন নারীর জন্যই ঘরের শান্ত-শিষ্ট পরিবেশ থেকে বাইরের অশান্ত ও উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশে বেপর্দা হয়ে বের হওয়া মৃত্যুতুল্য। এদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, পর্দা কোনোভাবেই বন্দিত্ব নয়; বরং পর্দাহীনতাই বন্দিত্ব।
(গ) প্রগতিবাদীরা বলে, পর্দার কারণে নারী জাতি উচ্চ শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। এর উত্তরে বলবো, তাই তো ‘উপজাতি’ নারীরা যারা মোটেই পর্দার তোয়াক্কা করে না, শিক্ষা-দীক্ষায় খুবই অগ্রসর হয়ে গেছে, ঠিক না?
আসল কথা হলো, শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রগতির সাথে পর্দা-বেপর্দার কোন সম্পর্ক নেই। বরং শিক্ষা-দীক্ষা ও উন্নতি-প্রগতির ক্ষেত্রে মূলকথা হলো একনিষ্ঠতা। কোন জাতি যদি নিষ্ঠার সাথে নারীদেরকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়, তাহলে পর্দার মধ্যে রেখেও তাদেরকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারে। একনিষ্ঠতা না থাকলে নারীদেরকে পর্দাহীন করেও কোন লাভ হবে না। তাছাড়া একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে, পর্দার মধ্যে রেখেই নারীদেরকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করা বেশি সহজ। কেননা শিক্ষার জন্য একাগ্রতা ও চিন্তার নিবিষ্টতা প্রয়োজন। আর একাগ্রতা ও চিন্তার নিবিষ্টতা অর্জন হয় নির্জন পরিবেশে। তাই দেখা যায়, বিদ্বান লোকেরা পড়াশুনার জন্য নির্জন স্থান নির্ধারণ করে রাখেন।
সুতরাং বুঝা গেল, নারীদের শিক্ষা অর্জনের জন্য পর্দা অন্তরায় নয়; বরং অধিক সহায়ক। যারা পর্দাকে শিক্ষা-প্রগতির অন্তরায় মনে করে তাদের বিবেক-বুদ্ধি দেখলে সত্যিই আশ্চর্যবোধ হয়।
চার.
ইউরোপ, তাদের দুসর ও প্রগতিবাদীরা সব কিছুতে বিজ্ঞানের প্রলেপ চায়, তাহলে পর্দার বেলায় কেন বিজ্ঞানকে পেছনে রাখে? এ যুগের বিজ্ঞানও আমাদের বলছে, স্বাস্থ্যকে সুন্দরভাবে রক্ষার জন্য মাথা ঢেকে রাখা একান্ত জরুরি। বিখ্যাত মস্তিষ্ক গবেষক ভি. জি. রোসিন বলেছেন, ১০৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় মস্তিষ্কের ফসফরাস গলতে শুরু করে। মাথা আবরণহীন অবস্থায় প্রচণ্ড সূর্যতাপের মধ্যে একটা বিশেষ সময় পর্যন্ত থাকলে যে-কোন সময় এ উচ্চ তাপমাত্রায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, স্মরণশক্তি লোপ পেয়ে যাওয়ার এবং ব্রেইনের কোন কোন অংশের কর্মপ্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়। সূর্যের আলোতে বিদ্যমান আল্ট্রা ভায়োলেট ultra violet রশ্মি প্রচণ্ড গরমের সময় মেয়েদের নরম ত্বক ও দেহের জন্য ক্ষতিকর। অনাবৃত থাকার কারণে শরীরের খোলা অংশে সূর্যরশ্মির প্রভাবে ত্বক ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। চর্ম ক্যান্সারের পূর্ব রোগ হচ্ছে সলার কেরাটসিস solar keratosis। সূর্যের আলো সরাসরি লাগলেই এই রোগ হয়। অথচ কাপড় দ্বারা আবৃত থাকলে এ রশ্মিগুলো ত্বক ও দেহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। রসায়ন বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শরীরের যে অংশ খোলা থাকে, সে অংশে মেলানিন নামক হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে রং কালো হয় এবং লাবণ্য কমে যায়। কানাডার এক চিকিৎসক বলেছেন, সৌদি আরবের বেশির ভাগ নারী বোরকা পড়ার কারণে ‘ইপস্টেইন বার ভাইরাস’ এ আক্রান্তের হার খুবই কম।
পাঁচ.
এবারে আসি মূল একটি কথায়। মুসলিম নারীদের জন্য প্রগতিবাদীদের এত মায়াকান্না কেন? যেখানে তাদের হাত থেকে ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়ার একটি শিশুও নিরাপদ নয়। কোমলমতি বাচ্চাদের বুক তাদের বুলেটে ঝাঁঝরা। আবু গারীবের মত কুখ্যাত কারাগারে যেখানে মুসলিম যুবতীরা হিংস্র যৌনতার স্বীকার, সেখানে তারা মুসলিম নারীদের পর্দা-কষ্ট নিয়ে এত মাতামাতি করছে কেন? কারণ ইসলামের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে নারীমুক্তির বিষয়টি পশ্চিমাদের বৃহত্তম রণাঙ্গন। তাই নারীমুক্তির নামে তারা সবরকমের অপচষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আল্লাহ তাআলা নারীদেরকে এই ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।