ছয় মঞ্জিল প্রসঙ্গ : আলমে আজসাদ বা দুনিয়ার জগত (৩য় পর্ব)

চরিত্রগঠনে সন্তানাদিকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদান

মা-বাবা সন্তানের শিক্ষা অর্জন ও চরিত্র গঠনের মূল কেন্দ্র। সুশিক্ষা ও সচ্চরিত্রের বিদ্যা শিশুবয়সে বপন করতে পারলে সন্তান আদর্শবান মহৎ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠবে। পক্ষান্তরে সুশিক্ষা ও সচ্চরিত্রে সন্তানকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে সে দুনিয়া-আখিরাতে চরম হতভাগা হবে। পাশাপাশি সংসারজীবনেও নেমে আসবে অশান্তি ও রকমারি সমস্যা। আর এই সন্তানের যাবতীয় অপরাধ ও পাপ কাজের অংশীদার মা-বাবা ও অভিভাবকগণও হবেন। সর্বজন স্বীকৃত কথা হচ্ছে, সন্তানকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে সেভাবে গড়ে উঠবে। তাই অভিভাবকের কর্তব্য হচ্ছে সন্তানের মেজাজ-মর্জির প্রতি লক্ষ্য রেখে তার মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণের আবেগ অনুভূতি জাগ্রত করে দেয়া। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবনীতেই রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শ। পবিত্র কুরআন মজীদে ইরশাদ হচ্ছে- অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”[1]

হাদীস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে- ‘উত্তম চরিত্রে পূর্ণতা বিধানের জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি।’

সন্তানের বয়স সাত বৎসর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তাকে পাক-পবিত্রতা অর্জনের শিক্ষা দেওয়া এবং তাকে এ-কথা বোঝানো যে, পবিত্রতা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেননা, হাদীস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে- ‘পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।’

সন্তানের বয়স সাত বছর পূর্ণ হলে মেয়ে-সন্তানকে স্নেহময়ী মা সাথে নিয়ে নামায পড়াবেন এবং ছেলে-সন্তানকে শ্রদ্ধেয় বাবা সাথে নিয়ে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামায পড়াবেন। এতে নামাযের প্রতি তাদের উৎসাহ সৃষ্টি হবে এবং নামাযের অভ্যাস তৈরি হবে। যদিও তাদের উপর নামায ফরয হয়নি। সন্তানের সাথে মাঝেমধ্যে নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত বিষয়ে আলোচনা করা এবং নামায পড়ার উপকারিতা ও সাওয়াব এবং নামায না পড়ার অপকারিতা ও গুনাহ সম্পর্কে তাদেরও বোঝানো।

শিশু-বয়সেই সন্তানের আমল-আখলাক অর্জনের প্রতি মা-বাবা ও অভিভাবকের সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সন্তানের শিশু-বয়সেই সকল মা বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে যে, আমার সন্তান যেন আদর্শ সন্তান হয় আর আমি যেন সেই আদর্শ সন্তানের গর্বিত অভিভাবক হই। যারা ভবিষ্যৎ-কর্ণধার হবে তাদের শিশু-বয়সে শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো কোনোভাবেই সঙ্গত নয়।

 

আব্দুল কাদির জিলানীর উপর মায়ের শিক্ষার প্রভাব

মনে পড়ে গেল সূফী-সম্রাট শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর শিশু-বয়সের ঘটনা। শিশু আব্দুল কাদিরের মমতাময়ী মা তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন- তাঁকে তিনি আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তুলবেন। ইলমে দ্বীনের মধু আহরণে তাঁকে তৃপ্ত করবেন। সততা ও চারিত্রিক গুণাবলিতে নববী চরিত্রের নমুনা বানাবেন।

স্বপ্ন-মুতাবিক প্রাথমিক শিক্ষা দানে মা স্বীয় প্রজ্ঞা মেধা ও ধার্মিকতার আদলে তাঁকে সুভাসিত করে তোলেন। তাঁকে শিক্ষা দেন কোনোদিন কারো সাথে মিথ্যা কথা বলা যাবে না। কঠিন থেকে কঠিন বিপদ-মুহূর্তেও সত্য কথা বলতে হবে। পাশাপাশি জীবনের সকল ক্ষেত্রে শরীয়ত ও সুন্নতে নববীর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে হবে। এতেই তুমি জীবন সংগ্রামে শতভাগ সফল হবে এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শিশু আব্দুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মহীয়সী মায়ের কাছে অর্জন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনে তাঁকে এবার বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। মা তাঁকে জ্ঞানার্জনে বাইরে পাঠাবেন। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। অল্প কিছু পয়সা খরচের জন্য ব্যবস্থা করলেন। মা তো মা-ই। কলিজা-ছেঁড়া ধন শিশু আব্দুল কাদিরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জনে বাইরে পাঠাতে মা নিজের কোমল হৃদয়টাকে পাথর বানিয়ে নিজেকে সংবরণ করে বিদায়ী উপদেশ দিচ্ছেন। কুরআন-সুন্নাহ ও নববী আদর্শ অনুসরণের উপদেশ গ্রহণ করে শিশু আব্দুল কাদির প্রতিষ্ঠানের পথে যাত্রা শুরু করলেন। মমতাময়ী মায়ের নসীহতকে বুকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানের পথে পায়ে হেঁটে চলতে থাকেন। নীরব, নিভৃত পল্লী পাড়ি দিয়ে মরু এলাকার পথে পৌঁছলে শিশু আব্দুল কাদিরের পথ রুদ্ধ করে সামনে আসে একদল ডাকাত। আটকে দেয় তাঁর পথ চলা। তারা ছিনিয়ে নিতে চায় শিশু আব্দুল কাদিরের যৎসামান্য সামান। মায়াবী চেহারার শিশুটিকে দেখে এগিয়ে আসে ডাকাত-সরদার। জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, তোমার কাছে কি কোনো টাকা-পয়সা আছে?’ তখনই মনে পড়ে গেল শিশু জিলানীর মায়ের উপদেশ। মা তো বলেছিলেন কখনো কারো সাথে কোনো মিথ্যা কথা বলা যাবে না। তাই তিনি অকপটে বলে দিলেন, ‘হ্যাঁ। আমার কাছে টাকা আছে।’ জবাব শুনে ডাকাত-সরদার বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, টাকা থাকার কথা এভাবে বলার রহস্য কী? কারণ, আমাদের কাছে তো কেউ এভাবে স্বীকার করে না! তুমি তো জানো আমরা ডাকাত। আমরা মানুষের সবকিছু নিয়ে যাই। কোন জিনিস তোমাকে বাধ্য করল সত্য কথাটি বলতে?’ শিশু জিলানী তখন বললেন, ‘এটা আমার মায়ের শিক্ষা, মায়ের উপদেশ। মা আমাকে এ উপদেশ দিয়েছেন-আমি যেন কখনো কারো সাথে মিথ্যা কথা না বলি।’ শিশু জিলানীর কথায় আল্লাহপাকের মেহেরবানীতে ডাকাত-সরদারের অন্তরে আসর (প্রভাব) পড়ল। তার অন্তরে প্রভু-প্রেমের ঢেউ বয়ে গেল। সেখানে জাগ্রত হলো আল্লাহ তায়ালার ভয়। সে বলতে শুরু করল— ‘তুমি শিশু হয়ে তোমার মায়ের উপদেশকে এত গুরুত্ব দিলে। অথচ আমি জ্ঞানসম্পন্ন হয়েও আল্লাহ পাকের নির্দেশকে লঙ্ঘন করে চলেছি। আল্লাহ তাআলা তো চুরি-ডাকাতি করতে সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করেছেন।’ তখন সে অন্যান্য ডাকাতদের একত্রিত করে ঘোষণা করল- ‘তোমরা স্বাক্ষী থেকো, আমি আজ থেকে ডাকাতি ছেড়ে দিলাম। আর কখনো এ-পথে পা বাড়াব না। আমি খালিস নিয়তে তাওবা করে নিলাম।’ ডাকাত-সরদারের এই ঘোষণা শুনে অন্যান্য ডাকাতরাও প্রতিজ্ঞা করল-তারাও চিরদিনের জন্য ডাকাতি ছেড়ে দেবে। সকল ডাকাত খালিস নিয়তে আল্লাহপাকের দরবারে তাওবা করে জীবন সংশোধনের পথে ফিরে আসে। সন্ত্রাস ও নাফরমানির পথ ছেড়ে শান্তি-নিরাপত্তা ও আনুগত্য-ইবাদতের কাজে আত্মনিয়োগ করে।

ডাকাত ও নাফরমানের দল রূপান্তরিত হয় আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের দলে।

এভাবে মা-বাবা ও অভিভাবকগণ যদি সন্তানের শিশু-বয়সে ইসলামের মূল শিক্ষার বীজ তাদের অন্তরে বপন করতে পারেন, তাহলে তাদের দ্বারাও ইসলামের বহু কাজ হবে। বহু মানুষ হেদায়তের দিশা পাবে।

[1] সূরা আহযাব : ২১

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT