ইমামে রব্বানী হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন ওয়ালীউল্লাহী চেতনাধারী একজন সংগ্রামী সাধক। ইমামুল হিন্দ হযরত মাওলানা শাহ ওয়ালীউল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর দর্শনের আলোয় সূচিত সংস্কার আন্দোলনের বিপ্লবী সৈনিক। ঘুণেধরা সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে নতুন সমাজ গড়ার কাজে তিনি শুরু থেকেই নিমজ্জিত ছিলেন। ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথম অভিযানেই তিনি ছিলেন সেনাপতি। মুজাহিদগণ গঠিত অস্থায়ী সরকারের তিনি ছিলেন প্রধান বিচারপতি। ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ১২৯৮ হিজরীতে দারুল উলুমের শুরায় যুক্ত হন। দারুল উলুম দেওবন্দে ‘ইফতা বিভাগ’ তারই হাতে স্থাপিত হয়। ১৮৮০ সালে মাওলানা কাসিম নানুতবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর ইন্তেকালের পর তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের পৃষ্ঠপোষক মনোনীত হন এবং ১৯০৫ সালে ইন্তেকাল অবধি যথারীতি দায়িত্ব পালন করেন।
ইলমে ফিকহের সাথে ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর ঘনিষ্টতা সবচেয়ে প্রগাঢ় ছিল। বলাবাহুল্য, হযরতের হাত ধরেই দারুল উলুম দেওবন্দে মুফতি তৈরি হওয়ার ধারা উন্মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ফতোয়া গবেষণা, সঙ্কলন ও গ্রন্থনা ইত্যাদিতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। দারুল উলুম দেওবন্দের স্বপ্নদ্রষ্টা মুহতামিম হযরত মাওলানা কাসিম নানুতবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাকে ‘যুগের আবু হানীফা’ হিসেবে অভিহিত করতেন। হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছাত্রজীবন থেকেই মাওলানা নানুতবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে তদানীন্তন সময়ে বিগত একশ বছরের মধ্যেও হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর সমপর্যায়ের কোনো ফকীহ জন্মগ্রহণ করেননি। ইসলামী ফিকহের বহু নতুন নতুন বিষয়ের সূক্ষ্ম ফায়সালা প্রদানে তিনি সার্থকভাবে অবদান রাখেন। একজন ওলীআল্লাহ তথা পীর ও মুর্শিদ হিসেবে তাসাউফ ও সুলূকের পথে হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি অসামান্য অবদান রেখে গিয়েছেন। আজ সমগ্র পৃথিবীতে যতো জায়গায় বিশুদ্ধ পন্থা অবলম্বনে তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধির সাধনা প্রবহমান আছে সবই তাঁর শাগরেদগণের বরকতময় কীর্তি। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে আত্মশুদ্ধির সাধনা বা তাসাউফকে প্রবাহিত রাখার পেছনেও হযরতের অবদান ছিল অপরিসীম। স্বীয় মুর্শিদ ও পীর সাইয়েদুত তায়েফা মাওলানা হাজী ইমদাদুল্লাহ ফারুকী চিশতী মুহাজিরে মক্কী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে আহরিত মারেফাতের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ তার মাধ্যমেই সাধিত হয়।
ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নিছক একজন আরেফবিল্লাহ ছিলেন না। তিনি ইলমে মারেফাত ও তরীকতের একজন সংস্কারকও ছিলেন। তাযকিয়া ও সুলূকের সাধনায় পীর-মুরীদির ছায়ায় ছায়ায় বেড়ে ওঠা বেদাত-শেরেকের নানা রকম আগাছা-পরগাছার তিনি মূলোচ্ছেদ করেন। হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর তাজদীদ ও সংস্কার তাসাউফ ও সুলূকের সিলসিলায় নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটায়। ভারতীয় উপমহাদেশ তথা পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ মুসলিম উম্মাহের মাঝে তাসাউফ-তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির ময়দানে তিনি অঘোষিত এক সংস্কার আন্দোলনের পয়গাম ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। যার সুফল এখন ইসলামী দুনিয়াজুড়ে জ্বলজ্বল করছে। ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর বরকতময় হাতে বায়েত হওয়ার মাধ্যমে সমকালীন জাহেরি এলেমে আলোকিত শীর্ষসব ওলামা, ফকীহ ও মুহাদ্দিস-মুফাসসিরগণ নিজেদেরকে বাতেনি নূরের দ্বারা নূরান্বিত করেন। হযরতের বিশিষ্ট খলীফাগণ হলেন- শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা খলীল আহমদ সাহারনপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা শাহ আব্দুর রহীম রায়পুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মুফতিয়ে আযম মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ কেফায়াতুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, শাইখুল ইসলাম মাওলানা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা ইয়াহইয়া কান্দলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা জমীরুদ্দীন চট্টগ্রামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা কারী ইবরাহীম উজানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ।
ইতিহাসের শীর্ষ এসব পীর-মাশায়েখ সকলেই ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর দীক্ষা ও দর্শন অনুযায়ী আজীবন মুজাহাদা ও সাধনায় নিমজ্জিত থেকেছেন। পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ও শরীয়তের বহুমাত্রিক খিদমাতের পাশাপাশি মারেফাত ও সুলূকের পথেও গড়ে গিয়েছেন অসংখ্য উত্তরসূরি। শত শত খলীফা এবং লক্ষ লক্ষ মুরীদ ও মুতাআল্লিকীন। সম্মানিত মাশায়েখে কেরামের সকলেই নিজেরা উচ্চআওয়াজে যিকির করতেন এবং নিজেদের মুরীদগণকে সেভাবে যিকিরের তালীম দিতেন। একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহের মাঝে মারেফাত ও তরীকতের যে-সব সিলসিলা হক্কানী পীর-আউলিয়ার নেতৃত্বে জারি আছে তার সমুদয় কিন্তু এসব মাশায়েখে কেরামের খুলাফা ও মুতাআল্লিকীনের অক্লান্ত সাধনার ফসল। হযরত ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর রুহানী ফয়েয ও বরকতের এই ধারা এভাবেই কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীময় ক্রমবিস্তৃতির সাথে অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।
কালের এই পর্বে এসে সমাজের মাঝে দানা বেঁধেছে নানা ভুল বুঝাবুঝি ও বিভ্রান্তি। আজকের আলোচনায় এপর্যায়ে আমরা উচ্চ আওয়াজে যিকির করা প্রসঙ্গে হযরত ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রদত্ত কয়েকটি ঐতিহাসিক ফতোয়া উপস্থাপন করছি। যাতে সকল অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির অপনোদন হয়ে যায়। কারণ, ইসলামী শরীয়তের কোনো বিষয়ে যখনই হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত মাওলানা আব্দুল হাই লক্ষ্মৌভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর ফতোয়া একই রকম হয়ে যায় তখন উপমহাদেশের আলেমসমাজ এমন ফতোয়াকে হানাফী মাযহাবের সর্বসম্মত অভিমতরূপে গ্রহণ করে থাকেন। হযরত লক্ষ্মৌভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তো এব্যাপারে ‘সিবাহাতুল ফিকরি ফিল জাহরি বিয-যিকরি’ নামে স্বতন্ত্র একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে ছিলেন।
০১. ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট ফতোয়া চাওয়া হোল। বলা হোল, উচ্চ আওয়াজে যিকির করা পবিত্র কুরআন এবং হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নাকি পীর-মাশায়েখ ও সুফীগণ নিজেদের তরফ থেকে এই রেওয়াজ চালু করেছেন? কেউ বলেন, উচ্চ আওয়াজে যিকির করা ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে বেদাত। কেউ বলেন, উচ্চ আওয়াজে যিকির করা যেহেতু ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে বেদাত অতএব বড় বড় হানাফী আলেমগণ এভাবে যিকির করার অনুমতি কেনোই-বা দিয়ে থাকেন? যিকিরের অনুমোদিত পদ্ধতি কোনটি?
জবাবে হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘যিকির উচ্চ আওয়াজে হোক কিংবা অনুচ্চ আওয়াজে, উভয় পদ্ধতিই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের আলোকে জায়েয।’
হযরত ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সেইসব স্থানে উচ্চ আওয়াজে যিকির করাকে বেদাত বলেছেন যে-সব স্থান অনুচ্চ আওয়াজে যিকির করার জন্য নির্ধারিত; যে-সকল স্থানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আওয়াজের সাথে যিকির করা প্রমাণিত নয়। উদাহরণ হিসেবে ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাযে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়। তখন অনুচ্চ আওয়াজে তাকবীর বলা হয়। হযরত ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ব্যাপকভাবে উচ্চ আওয়াজে যিকির করাকে নিষেধ করেননি। আল্লাহর যিকির সকলভাবেই করা যায়। (ফতোয়ায়ে রশীদিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৭১)
০২. ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট ফতোয়া চাওয়া হোল। বলা হোল, উচ্চ আওয়াজে যিকির করা কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত? ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কোন প্রেক্ষাপটে বেদাত এবং কোন প্রেক্ষাপটে জায়েয বলেছেন? কেউ বলেন, উচ্চ আওয়াজে যিকির করার কী প্রয়োজন? আল্লাহ পাক কি বধির যে, চুপিসারে যিকির করলে তিনি শুনবেন না? এই মাসআলাটি কুরআন-হাদীসের প্রমাণসহকারে লিখে দিবেন। যেই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে সেই হাদীস অবশ্যই লিখে দিবেন। বিদআত হওয়ার কারণ, জায়েয হওয়ার কারণ, আমাদের জন্য পালনীয় ফতোয়া সবিস্তারে লিখবেন। ইতোপূর্বে আপনি উচ্চ আওয়াজে যিকির করা প্রসঙ্গে যেই ফতোয়া লিখে দিয়েছেন তা বুঝে আসেনি।
জবাবে হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেন, ‘আমি একজন মুফতি। আমার কাছে যেভাবে যেই মাসআলা হক মনে হয়, সেটি সেভাবে বলে দেওয়া ফরয বলেই জানি। মাসআলাসমূহের দলিলাদি লিখার কোনো প্রয়োজন নেই। এটা ওয়াজিব নয়। এ সংক্রান্ত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কিতাবাদিতে রয়েছে। যদি এলেম থাকে তাহলে নিজে সেগুলো খোঁজে দেখে নাও। অন্যথায় দলিলসমূহের দ্বারা আপনার কি লাভ?’
হযরতের জবাবের ভাষা থেকে সহজেই বুঝা যাচ্ছে যে, জাহেলদের প্রশ্নের ধরন দেখে তিনি কিছুটা রাগান্বিত হন। একবার ফতোয়া নেওয়ার পরও পুনরায় একই বিষয়ে ওরা ফতোয়া চাচ্ছে। কেননা, জনসাধারণ কিংবা সীমিত ইলেমের অধিকারী আলেমদের জন্য বড় কারো নিকট দলিল তলব করা একরকম বেয়াদবি বৈ কিছু নয়। এই ফতোয়ার টীকায় লিখিত আছে, ‘চিকিৎসার জন্য দলিল জরুরি হয় না; অভিজ্ঞতার আলোকে উপকারী হওয়া যথেষ্ট।’ (ফতোয়ায়ে রশীদিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৭১, টীকা : ৩১০)
০৩. ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট ফতোয়া চাওয়া হোল। বলা হোল, আওয়াজ দিয়ে যিকির করা, আওয়াজ দিয়ে দুআ করা, আওয়াজ দিয়ে দুরুদ পড়া; চাই সে আওয়াজ হালকা হোক কিংবা সে আওয়াজ তীব্র হোক, যেভাবে নামাযের মধ্যে আওয়াজ দিয়ে কেরাত পড়া হয়, তাকবীর ইত্যাদি বলা হয়, এই বিষয়ে মুহাদ্দিসগণসহ চার মাযহাবের সম্মানিত ইমামগণের নির্দেশনা কী? জায়েয নাকি নাজায়েয?
জবাবে হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘যিকির তা যেকোনো যিকিরই হোক ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে যে-সকল স্থানে আওয়াজ দিয়ে যিকির করা ‘নস’ বা শরয়ী দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়, সেসব স্থানে আওয়াজ দিয়ে যিকির করা মাকরুহ। আর সাহেবাইন তথা ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং অন্যান্য ফকীহগণ ও মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে তা জায়েয; মাকরুহ নয়। তো এব্যাপারে আমাদের মাশায়েখে কেরাম সাহেবাইন প্রমুখের ফতোয়া অনুসরণ করে থাকেন। বিস্তারিত বিবরণের জন্য ‘মারেফে তাসাউফ’ নামক গ্রন্থ পড়া যেতে পারে।’ (ফতোয়ায়ে রশীদিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৭২)
০৪. ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট ফতোয়া চাওয়া হোল। বলা হোল, উচ্চ আওয়াজে যিকির করা অধিক উত্তম নাকি অনুচ্চ আওয়াজে যিকির করা অধিক উত্তম? দলিলসহ জানতে চাই।
জবাবে হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেন, ‘এটা একটা আপেক্ষিক বিষয়। আপেক্ষিক বিবেচনায় উভয় ধরনের যিকিরই ফযীলতপূর্ণ। কোনো বিবেচনায় উচ্চ আওয়াজে যিকির করা অধিক উত্তম আবার কোনো বিবেচনায় অনুচ্চ আওয়াজে যিকির করা অধিক উত্তম। দলিল হোল, মহান আল্লাহ পাক যা একান্ত ব্যাপকতার সাথে সাধারণভাবে বলে দিয়েছেন যে, তোমরা বেশি বেশি করে আল্লাহর যিকির করো। উযকুরুল্লাহা যিকরান কাছীরা। পবিত্র কুরআনের এই নির্দেশনাটি মতলক বা সাধারণভাবে বলার কারণে এর ব্যাপকতায় পৃথকভাবে যিকিরের যত পদ্ধতি আছে সবই আওতাভুক্ত হয়ে গিয়েছে।’
যিকিরের প্রাসঙ্গিক উপকারিতাও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এই উপকারিতা যিকির অনুপাতে হয়, যিকিরের সময় অনুপাতে হয়, যিকিরের ধরন অনুপাতে হয়, যিকিরের ফলাফল অনুপাতেও হয়। জিজ্ঞেস করা হোল, ‘উচ্চ আওয়াজে যিকির করার সময় ‘আল্লাহ’ বলে কী পরিমাণ শক্তির সাথে কলবে আঘাত করতে হবে? এমন শক্তি দিয়ে কি বলতে হবে যাতে কণ্ঠ বসে যায়?’ জবাবে হযরত বললেন, ‘এতো তীব্র আওয়াজে বলার প্রয়োজন নেই।’ (ফতোয়ায়ে শামী, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ২৪৭; ফতোয়ায়ে রশীদিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৭৩)
০৫. ইমামে রব্বানী মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট ফতোয়া চাওয়া হোল। বলা হোল, উচ্চ আওয়াজে যিকির করা হানাফী মাযহাব মতে জায়েয কি-না? দলিলসহ জানতে চাই।
জবাবে হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেন, ‘উচ্চ আওয়াজে যিকির করা সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের কিতাবাদিতে বিভিন্নরকম বর্ণনা রয়েছে। কোনো বর্ণনা দ্বারা মাকরুহ প্রমাণিত হয়, যদি যিকির যথাস্থানে না হয়। কোনো কোনো বর্ণনা দ্বারা জায়েয বলে প্রমাণিত হয় আর এই মতটাই গ্রহণযোগ্য। যে-কেউ এসবের দলিল কামনা করা মূলত বৃথা। কারণ, যেখানে মুজতাহিদগণের মতবিরোধ সেখানে ফায়সালা করবেন কে? কিন্তু জাযেয হওয়ার দলিল হলো মহান আল্লাহর বাণী-
وَٱذْكُر رَّبَّكَ فِى نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ ٱلْجَهْرِ مِنَ ٱلْقَوْلِ بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْءَاصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلْغَٰفِلِينَ : الاعراف ٢٠٥
এখানে আয়াতের ‘দূ-নাল জাহর’ বাক্যটাই আওয়াজ-সহকারে যিকির করা জায়েয হওয়ার দলিল। যেহেতু এই বাক্য আওয়াজের নিম্ন স্তর বুঝাচ্ছে।
হাদীস শরীফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أَيُّهَا النَّاسُ ارْبَعُوا علَى أَنْفُسِكُمْ، إنَّكُمْ ليسَ تَدْعُونَ أَصَمَّ وَلَا غَائِبًا، إنَّكُمْ تَدْعُونَ سَمِيعًا قَرِيبًا، وَهو معكُمْ : بخاری و مسلم
এখানে ‘ইরবাঊ আলা আনফুসিকুম’ বাক্যটাও আওয়াজের সাথে যিকির করা বুঝায়। যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বলেছেন। আর গলা ফাটাতে নিষেধ করেছেন। পেশকৃত আয়াত ও হাদীস সাধারণভাবে আওয়াজের সঙ্গে যিকির করা জায়েয হওয়ার পক্ষে প্রমাণ বহন করছে।’ (ফতোয়ায়ে রশীদিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৭২)
মহামহিম আল্লাহ পাক আমাদেরকে সকলপ্রকার বিভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুন। সঠিক পদ্ধতি অনুসারে সর্বসময়ে মহান আল্লাহর যিকির করার তাওফিক দিন।