এপ্রিল ২০২২

রমযান কারীম শুরু হচ্ছে। সংযমের এই মাস শুরুর আগে আগে আমাদের দেশের বাজারব্যবস্থা বরাবরই অসংযমী হয়ে ওঠে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু এবার রমযান শুরুর বেশ আগ থেকেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজমান। এবং এ অস্থিরতা সম্ভবত অতীতের সকল রেকর্ড চ‚র্ণ করেছে। সাধারণ শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে চ‚ড়ান্ত নাভিশ্বাস। মরে যাওয়ার চেয়ে যেন এখন বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের গতি অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়লেও মানুষের আয় বাড়ছে না, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে আয় বরং কমে যাচ্ছে। সরকারের অসংবেদনশীল মন্ত্রীরা যদিও দাবি করছেন, দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লেও সমস্যা নেই, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে; মাথাপিছু আয় বাড়াকে তাঁরা দলিল হিসেবে উপস্থাপন করছেন; কিন্তু এই মাথাপিছু আয় বাড়াটা তো সাধারণ মানুষের জন্য একটা ধোঁকা। মাথাপিছু আয় বাড়লেও অতি ধনীর হার বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ আছে বিশে^র শীর্ষ তালিকায়। ফলে ব্যাংক-অ্যাকাউন্ট ভারী হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু ধনকুবেরের, সাধারণ মানুষের হাতে সেই অর্থে কোনো টাকাকড়ি থাকছে না। তাছাড়া নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ মাথাপিছু আয় বাড়া দিয়ে করবেটা কী? একজন চাকুরিজীবী, সে সরকারি চাকুরে হোক কিংবা বেসরকারি, মাথাপিছু আয় যতই বাড়–ক, তার আয় কিন্তু বাড়ছে না। বরং করোনার কারণে বেসরকারি অধিকাংশ চাকুরিজীবীর বেতন বাড়ার সুযোগ কমে গেছে। অনেকে তো চাকরিই হারিয়েছে।

আয় বাড়ার সুযোগ ছাড়াই যখন জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, সেটাও আবার অস্বাভাবিক হারে, মানুষের অসহায়ত্ববোধ তখন কতটা প্রকট হয়ে উঠতে পারে, সহজে অনুমেয়। কিছুটা কমমূল্যে পণ্য কিনতে টিসিবির দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে নি¤œবিত্তের সঙ্গে মধ্যবিত্ত মানুষের ধাক্কাধাক্কি সেই অসহায়ত্বকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময় নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষ সাধারণত কী করে? তার অতিরিক্ত খরচটা কমিয়ে দেয়। খাবারের তালিকা থেকে মাছ-গোশত-দুধ-ডিম বাদ দেয়, কিংবা পরিমাণ কমিয়ে আনে, আর শাকসবজির পরিমাণ বাড়ায়। কিন্তু এবার শাকশবজির বাজারেও যেন আগুন লেগেছে! ভোজ্যতেলের বাজারে তো রীতিমতো তেলেসমাতি কাÐ। বাণিজ্যমন্ত্রী বলে রেখেছেন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে তাঁর করার কিছুই নেই। তেলের দাম বাড়ার বিষয়ে তিনি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিচ্ছেন। কিন্তু চাল-মাছ-গোশত-সবজির মতো পণ্যের দাম বাড়তি কেন? কী জবাব দেবেন বাণিজ্যমন্ত্রী?

রাজনৈতিক অচলাবস্থার এই সময়ে মুখ বুজে সয়ে যাওয়া ছাড়া সাধারণ মানুষের আসলে করার কিছু নেই। অনিয়ম-দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষ যে দু কথা বলবে, একটু প্রতিবাদ করে নিজের কষ্টটুকু হালকা করবে, সেই সুযোগ ও সংস্কৃতিটাও যেন লীন হয়ে গেছে।

তবে যেকোনো দুঃসময় ও মুসীবতে মুমিনের আশ্রয়প্রার্থনার সবচেয়ে নিরাপদ ও ভরসাপূর্ণ একটি জায়গা বাকি থাকে। আর সেটা হচ্ছে আল্লাহর দরবার। আমাদের প্রত্যেককে সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে ফেরা উচিত। সকল মুসীবতকে তাঁর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হিসেবে মনে করতে হবে। আর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সহজ পদ্ধতি হলো সর্বান্তকরণে আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করা।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির উত্তাপ থেকে বাঁচতে আমরা নিজেদের চাহিদাকে আরও সীমিত করে ফেলতে পারি। রমযানের খাবার-দাবারে বাহারি আইটেম না রেখে যথাসম্ভব সাদামাটা খাবারে অভ্যস্ত হতে হবে। নিজেদের প্রতিদিনের খাদ্যদ্রব্য নিজেরা উৎপন্ন করার দিকটায় মনোযোগী হওয়া যেতে পারে। গ্রামের দিকে যাঁদের বসবাস, বাড়ির আঙিনা বা টুকরো জমিতে শাকসবজি আর পুকুর থাকলে মাছ চাষ করতে পারি। শহরের বাসিন্দারাও যাঁদের নিজের বাড়ি আছে, বাড়ির ছাদে সবজি চাষের উদ্যোগ নিতে পারেন। নিজেদের নিত্যদিনের খাদ্যের যোগানটা আংশিক হলেও নিজের চাষাবাদ থেকে হয়ে গেলে বাজারের মুখাপেক্ষিতা যেমন কমে আসবে, ভেজালমুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবারও খাওয়া যাবে।

রমযান হলো সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাস। রমযানের উসীলায় খাবারদাবার-সহ যাপিত জীবনের সকল অনুষঙ্গকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রিত করে নিতে পারি, সিয়াম ও কিয়ামুল লাইলের মধ্য দিয়ে যদি সর্বান্তকরণে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হতে পারি, তাহলে এটাই হবে আমাদের এই রমযানের সবচেয়ে বড় অর্জন। আল্লাহ তাআলা আমাদের হিম্মত ও তাওফীক দান করুন। আমীন।

—হামমাদ রাগিব

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT