ফেব্রুয়ারিতে দুটি মৃত্যুর ঘটনা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে কষে একটা থাপ্পড় বসিয়েছে যেন। দুনিয়ার সামান্য ভোগবিলাসিতার জন্য মানুষ যখন বিত্তবৈভবের পেছনে হণ্যে হয়ে ছুটছে, এ দুটি মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—প্রকৃত সুখ কেবল টাকাকড়ি দিয়েই অর্জন করা যায় না, বরং সুখের উৎস অন্য কিছু।
প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে ফেব্রুয়ারির শুরুতে। সেটা ছিল মূলত আত্মহত্যা। রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির এক ব্যবসায়ী ফেসবুক লাইভে এসে মাথায় গুলি করে নিজের প্রাণ বিনষ্ট করেন। ইন্টারনেটের কল্যাণে নির্মম এ দৃশ্য দেখেছে লাখ লাখ মানুষ। দেশ-বিদেশে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল এ ঘটনা। আত্মহত্যার আগে দীর্ঘসময় তিনি লাইভে কথা বলেছেন। নিঃসঙ্গতা এবং আপনজনদের অবহেলা ও বিশ্বাসঘাতকতা তাঁকে পীড়া দিয়েছে। আর এই রাগ থেকেই তিনি আত্মহত্যার জঘন্য সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন বলে জানান। ব্যাবসায়িকভাবে তিনি লোকসানের শিকার হয়েছেন, কিন্তু এটা মূল কারণ ছিল না। মূল কারণ তাঁর নিঃসঙ্গতা। একমাত্র পুত্র মাকে নিয়ে দেশের বাইরে, একমাত্র কন্যাও স্বামী-সন্তান নিয়ে বিশেষ মনোযোগী। তিনি বাসায় একা থাকতেন। স্বাভাবিক বৈভবে ঘাটতি ছিল না। কিন্তু জীবনভর যাদের জন্য খেটেছেন, সেই মানুষগুলোই তাঁকে একা রেখে যখন যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে খুব বেশি, তখন তিনি কষ্ট পেয়েছেন। এ কষ্ট তাঁর কাছে তাঁর জীবনকে মূল্যহীন করে তুলেছিল।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ফেব্রæয়ারির মাঝামাঝি সময়ের। নরসিংদীর সাবেক এক ব্যাংককর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করেন। জীবনভর উপার্জন করেছেন, বাড়ি-গাড়ি করেছেন। আছে কোটি টাকা ব্যাংকব্যালেন্স। সবকিছু দুই পুত্রের জন্য রেখে তিনি পাড়ি জমান পরপারে। কিন্তু মৃত্যুর পর ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তাঁর দাফন-কাফনের কোনো ব্যবস্থা করেনি পুত্ররা। বরং পিতার রেখে যাওয়া সম্পদ কে কতটুকু নেবে, এই দ্বন্দ্বেই তারা ব্যস্ত ছিল। এমনকি মৃত্যুর আগে অবসরজীবনে আসার পর ওই ব্যাংককর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রীকে পুত্ররা রেখেছিল বাড়ির একটি পরিত্যক্ত কামরায়। যে কামরাটি ব্যবহৃত হচ্ছিল বাড়ির স্টোর রুম হিসাবেও! মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পরও সন্তানেরা যখন তাঁর দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করছিল না, এদিকে লাশে পঁচন ধরতেও শুরু করেছে, তখন গ্রামবাসী চাঁদা উঠিয়ে তাঁকে করবরস্থ করার ব্যবস্থা নেয়।
ঘটনা-দুটো কী বার্তা দিয়ে গেল এই সমাজ ও পুঁজিবাদী বাস্তবতাকে, আশা করি বিশ্লেষণের দরকার নেই। আসুন, সন্তানদেরকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করি সবাই। জাগতিক শিক্ষার যে কাঠামো, সেখানে মানুষ হবার সবক নেই এখন আর; আছে রোবট হবার তালিম। জাগতিক শিক্ষার সমাপণান্তে শিক্ষার্থীরা মূলত একেকটি রোবট হয়ে বের হয়; যেখানে অনুভ‚তি, আবেগ কিংবা ভালোবাসার কোনো দখল নেই। তারপরও যতটুকু মনুষ্যত্ববোধ তাদের অনেকের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে, তা থাকে কেবল পারিবারিক ও পারিপাশির্^ক প্রভাবের ফলে। কিন্তু পারিবারিক অবক্ষয় ও সামাজিক অধঃপতন যে হারে বাড়ছে, কিছুদিন পর এ মনুষ্যত্ববোধও হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। যার প্রমাণ উপরোক্ত দুটি ঘটনা।
সুতরাং সন্তানের জন্য বাড়ি-গাড়ি করার আগে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হোন। আর এটা তো আজ সুপ্রমাণিত বাস্তবতা যে, সন্তান মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পারে কেবল দ্বীনী শিক্ষাব্যবস্থার কল্যাণে। সন্তানকে যদি আলিম নাও বানান, জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার আগে অন্তত ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষাটুকু তাঁকে রপ্ত করান। তাহলে শেষজীবনে এসে এমন নিঃসঙ্গতার কষাঘাতে জর্জরিত হতে হবে না, ইনশাআল্লাহ। পুত্রপরিজনের অবহেলারও শিকার হতে হবে না। বরং, আল্লাহ চাহে তো, এক পরিতৃপ্ত জীবনের সমাপ্তি টেনে পৃথিবীকে বিদায় জানাতে পারবেন। পরপারেও পেতে থাকবেন সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব।
—হামমাদ রাগিব