ডিসেম্বর ২০২১

শীতের মওসুম শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ওয়াজ মাহফিল। বিগত কয়েক শতাব্দীর ধারাবাহিকতায় ওয়াজ মাহফিলের চলমান প্রথা এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষের আবহমান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য এক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ-ধরনের অনুষ্ঠান একদিকে যেমন ইসলামের দাওয়াত, শিক্ষা ও হিদায়াতের ক্ষেত্র, অপরদিকে তা সাধারণ মানুষের নির্মল আনন্দ-উৎসবের এক উপলক্ষও বটে। তবে আনন্দ-উৎসবটা নিতান্তই প্রাসঙ্গিক ও গৌণ, মুখ্য নয়। মুখ্য হলো দাওয়াত, তালীম ও হিদায়াত। এবং উলামায়ে কেরাম মূলত এই মুখ্যউদ্দেশ্যের ফলেই এ-ধরনের অনুষ্ঠানের স্বতঃস্ফূর্ত অনুমোদন দেন এবং নিজেরাও অংশগ্রহণ করেন।

চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে আমাদের এই ভ‚খণ্ডে ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। বিগত কয়েক বছরে তো প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে। দেশের এখন প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বছরে অন্তত একবার হলেও মাহফিলের আয়োজন হয়। কিন্তু সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে মুখ্যউদ্দেশ্য থেকে মাহফিলগুলো ক্রমশ দূরে সরে পড়ছে। অনেক জায়গায়ই দাওয়াত তালীম ও হিদায়াতের বদলে এ-ধরনের মাহফিল কেবলই ক্ষমতা, বাহাদুরি ও লৌকিকতা প্রদর্শনের অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আবার বয়ানের জন্য এমন এমন ব্যক্তিবর্গ এখানে সবিশেষ নিমন্ত্রিত ও মূল্যায়িত হচ্ছেন, সুর ও কথার ফুলঝুরি ছিটানো ছাড়া যাঁদের বাড়তি কোনো বিশেষত্ব নেই। ইসলামের সাধারণ দাওয়াত ও তালীমের জন্য যেটুকু ইলম ও যোগ্যতার দরকার, সেটুকুও নেই তাঁদের অনেকের। বিগত কয়েক বছর ধরে ‘শিশুবক্তা’ নামে আরেক ধরনের বক্তার আবির্ভাব ঘটেছে—নিতান্তই অর্বাচীন কিশোর/বালক, সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী, মুখস্থ কিছু কথা বলতে পারে—এরা দেদারসে নিমন্ত্রিত ও বরিত হচ্ছে বিভিন্ন মাহফিলে। এদের কারও না আছে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা, না দাওয়াত ও তাবলীগ করার মতো ন্যূনতম ইলমী যোগ্যতা।

ফলে, প্রকৃত দাঈ ও আলেম যাঁরা, যাঁরা ইসলাহ ও হিদায়াতের যোগ্য রাহবার, তাঁদের হিদায়াত ও রাহবারি অনেক ক্ষেত্রেই অবমূল্যায়িত হচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সুহবত ও সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অনেকেই দ্বীনের প্রকৃত দাঈ ও আল্লাহওয়ালা মুখলিস বুযুর্গদের সঙ্গে অর্বাচীন বক্তা ও কেবলই সুরকে পুঁজি-করা-ওয়ায়েজদের পার্থক্য করেন না বা করতে পারেন না। সুরেলা ওয়াজের বিরোধিতা এখানে উদ্দেশ্য নয়, হকপন্থী অনেক আলিমও এ-ধরনের মাহফিলে সুর দিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন এবং করেছেন। উদ্দেশ্য হলো, ইলম-কালামের ধার না ধেরে কেবলই সুরকে পুঁজি করে যে-শ্রেণিটি অন্তসারশূন্য আলোচনা কিংবা নিতান্তই হাস্যরসের অবতারণা করেন, তাঁদের কথা।

এহেন লক্ষ্যচ্যুতি ও অধঃপতন থেকে দেশের ওয়াজ মাহফিলগুলোকে রক্ষা করা জরুরি। মাহফিলগুলোতে যারা হাস্য-তামাশা ও চিত্তবিনোদনের খোরাকই যোগাচ্ছে কেবল, এ-ধরনের বক্তার ব্যাপারে হকপন্থী নেতৃস্থানীয় আলিমগণ যদি নিজেদের অবস্থান ও বারাআত জনসাধারণ্যে পরিস্কার করে রাখেন, তাহলে সাধারণ মানুষ এদের থেকে সতর্ক থাকার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি আয়োজক কর্তৃপক্ষ যদি মাহফিল আয়োজনের সময় আলোচক বাছাইয়ে একটু সতর্ক থাকেন, কেবলই ইউটিউব দেখে বক্তা নির্বাচন না করে প্রতিবেশী আহলে ইলম ও দ্বীনী বিষয়ে সমঝদার লোকদের কাছ থেকে পরামর্শের ভিত্তিতে আলোচক নির্ধারণ করেন, তাহলে অর্বাচীন ও অযোগ্য বক্তাদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশেই কমে আসবে, ইনশাআল্লাহ।

ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হোক কেবলই ইসলাহ ও হিদায়াতের লক্ষ্যে; ক্ষমতা, বাহাদুরি কিংবা অন্য যে-কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য থেকে আয়োজক-আলোচক-শ্রোতাÑসকলেই আমরা মুক্ত থাকার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন।

 

—হামমাদ রাগিব

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT