সম্পাদকীয়, জুলাই-২৩ সংখ্যা

ধর্মীয় অনুশাসন সঠিকভাবে মেনে না চলায় যুবসমাজে মাদকাসক্তের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। তরুণ সমাজের বহু মেধাবী ও সম্ভাবনাময় প্রতিভা মাদকের নেশার কবলে পড়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের পথ বেছে নিয়েছে। মাদকাসক্তরা শুধু নিজেদের মেধা ও জীবনীশক্তিই ধ্বংস করছে না, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি—শৃঙ্খলাও বিঘ্নিত করছে নানাভাবে। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনাম ছিল— ‘নেশাগ্রস্থ যুবকের গুলিতে জোড়া খুন’, ‘মাদকাসক্ত মেয়ে নিজ হাতে বাবা—মাকে খুন করলো’, ‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় খুন হলেন মা—বাবা।’  এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। ইতিপূর্বেই আমরা দেখেছি ‘মাদকাসক্ত দেবর খুন করল তার ভাবীকে’ অথবা ‘মাদকাসক্ত ছেলের হাত থেকে বাঁচতে মা খুন করলেন ছেলেকে’ অথবা ‘মদ, সিগারেট, পরকীয়া প্রেম ও সম্পদের মোহে স্বামীকে হত্যা করে স্ত্রী।’ সুতরাং, এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, দেশে মাদকাসক্তির কারণে যুব সমাজের নিজেদের জীবন শুধু বিপন্ন হচ্ছে না, বরং এতে গোটা পরিবার ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধুদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে ৫৯ দশমিক ২৭ শতাংশ তরুণ—তরুণী, যুবক—যুবতী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। আর মাত্র ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ যুব সমাজ কৌতুহলবসত মাদক সেবনে ঝুঁকছে।

সমাজের ১৫—৩০ বছর বয়সীদের মাদকাসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। অধিদফতরের ২০২১ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১৬—৪০ বছর বয়সীদের প্রায় ৮৪ দশমিক ২৭ শতাংশ মাদকাসক্ত। এই বয়স সীমার মধ্যে ২১—২৫ বছর বয়সী যুবকরা রয়েছেন ‘সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে’। ১৬—২০ ও ২৬—৩০ বছর বয়সীরা ‘মধ্য ঝুঁকি’; ৩১—৩৫ বছর বয়সীরা রয়েছেন ‘স্বল্প ঝুঁকিতে’।

একটি বেসরকারি হিসাব অনুসারে, বর্তমানে বাংলাদেশের মাদকাসক্ত রয়েছে ৭৫ লাখেরও বেশি। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ যুবক—যুবতী। ৪৩ শতাংশ বেকার, ৬০ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। ৪০ শতাংশ অশিক্ষিত, ৪৮ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী। মাদকাসক্তদের মধ্যে ৯৮ শতাংশ ধূমপায়ী।

মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন—বিস্তার এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্ত’ সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা সারাদেশে ২০২২ সালে ১ লাখ ৩২১টি মামলা দায়ের এবং ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৭৫ জন মাদক চোরাকারবারীকে আইনের আওতায় এনেছে। এই সময়ে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৯ পিস ইয়াবা, ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৬৭ কেজি গাঁজা, ৭ লক্ষ ৬ হাজার ৬১ বোতল ফেন্সিডিলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গত ২০ জুন রাজধানীর পল্টন ও বনশ্রী এলাকা থেকে তিন কেজি আফিমসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা তিন কেজি আফিমের আনুমানিক বাজারমূল্য পৌনে তিন কোটি টাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী মাঝেমধ্যে আফিমের চালান ধরা পড়লেও গত ১০—১২ বছরের মধ্যে একসঙ্গে এত আফিম আর উদ্ধার হয়নি।

মাদকাসক্তি যেহেতু একটি জঘন্য সামাজিক ব্যাধি, তাই জনগণের সামাজিক আন্দোলন, গণসচেতনতা ও সক্রিয় প্রতিরোধের মাধ্যমে এর প্রতিকার করা সম্ভব। যার যার ঘরে পিতা—মাতা থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাড়া, মহল্লা বা এলাকায় মাদকদ্রব্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ঘৃণা প্রকাশের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতে নিয়মিত সভা—সমিতি, সেমিনার, কর্মশালার আয়োজন করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বিধিবিধান—সম্পর্কিত শিক্ষামূলক ক্লাস নিতে হবে। মাদকদ্রব্য উৎপাদন, চোরাচালান, ব্যবহার, বিক্রয় প্রভৃতি বিষয়ে প্রচলিত আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও কঠোর বিধান কার্যকর নিশ্চিত করতে হবে। তবেই সমাজে থেকে মাদকাসক্তির প্রতিরোধ বহুলাংশে সম্ভব।

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT