গুমোটবাঁধা এক স্থবির সময় যাপন করছি আমরা। গত মাস-দুয়েকের ভূতুড়ে পরিস্থিতি ধর্মীয় অঙ্গনে নিদারুণ বিহ্বলতা ও আতঙ্কগ্রস্ততার জন্ম দিয়েছে। এ অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যত হয়তো নতুন কোনো দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে। আমরা ঠিক জানি না, ভবিষ্যত নতুন কোনোদিকে মোড় নিলে তা কতখানি কণ্টকমুক্ত থাকবে। এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের কী করণীয়, কোন কর্মপন্থা অবলম্বন করে আমাদের সামনে এগোনো দরকার, উপমহাদেশের দু-একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে নজর ফেরালে আশা করি বুঝতে পারব।
উদাহরণত শাইখ আহমাদ সেরহিন্দী রাহিমাহুল্লাহ’র সংস্কার-আন্দোলনের কথাই ধরা যাক; মুজাদ্দিদে আলফে সানী নামে যিনি ইতিহাসখ্যাত। তাঁর সফল সংস্কার-আন্দোলন সম্পর্কে কমবেশি আমরা সকলেই অবগত। ষোড়শ শতাব্দীতে মোঘল বাদশাহ আকবর যখন ইসলামের বিকৃতি ঘটিয়ে দ্বীনে এলাহী নামে উদ্ভট এক ধর্ম আবিস্কার করে রাষ্ট্রীয়ভাবে এর প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছিল, উপমহাদেশের মুসলিম জনসাধারণকে বিভ্রান্ত ও বাধ্য করছিল এ ধর্ম অনুসরণের জন্য, একই সঙ্গে ইসলামের আচার-অনুষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল মসজিদ-মাদরাসার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ, ইসলামী জ্ঞান ও আচারের চর্চা এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ধর্মের নামে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও বিদআতী কর্মকাণ্ডে পুরো দেশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। এহেন পরিস্থিতিতে মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহিমাহুল্লাহ এক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। একদিকে তিনি একা, অন্য দিকে মোঘল রাজশক্তির মতো প্রবল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রযন্ত্র, কোনো বিরোধ বা সংঘাতে গিয়ে তিনি পেরে উঠবেন না নিশ্চিত। তিনি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেই পরিবর্তন আনার চেষ্টায় নিমগ্ন হলেন। শুরু করলেন রাষ্ট্রের ছোট-বড় বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের মনন ও মানসিকতায় ইসলামের পরিশুদ্ধ বীজ বপণের কাজ। সেই সঙ্গে প্রজাসাধারণের মধ্যেও পরিশুদ্ধ ইসলামের স্বরূপ তুলে ধরতে থাকলেন। অল্প কয়েক দশকের ব্যবধানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি পর্যন্ত তাঁর এই সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে বাদশাহ আকবর মৃত্যুর পূর্বে তওবা করে ইসলামে ফেরত এসেছিলেন, এবং তা মুজাদ্দিদে আলফে সানীর সংস্কার-আন্দোলনের কল্যাণেই। আকবরের পরবর্তী বাদশাহ জাহাঙ্গীর মুজাদ্দিদে আলফে সানীকে প্রথমে কারারুদ্ধ করলেও পরে নিজ-ভুল বুঝতে পারেন এবং মুজাদ্দিদের সকল দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন। আর এর মধ্যদিয়ে ষোড়শ শতকে গজানো সর্বগ্রাসী এক ভ্রান্ত মতবাদ ও ভূতুড়ে পরিস্থিতির কফিনে ঠোকা হয় শেষ পেড়েক।
দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটের দিকেও যদি আমরা ফিরে তাকাই, এমনই এক ভূতুড়ে পরিস্থিতি দেখতে পাব। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সিপাহী বিপ্লবের পর হাজার হাজার আলেমকে ব্রিটিশরা নির্মম কায়দায় হত্যা করে। দিল্লীর প্রতিটি অলিগলি উলামায়ে কেরামের তাজা খুনে পিচ্ছিল হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা-পুরুষ হযরত কাসেম নানুতুবী রাহিমাহুল্লাহ দেখলেন, এভাবে চলতে থাকলে ইসলামের বাতি যাঁরা জ্বালিয়ে রেখেছেন এই ভূখণ্ডে তাঁদের সকলেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অস্ত্রে-শস্ত্রে শক্তিধর রাষ্ট্রযন্ত্রের মুকাবিলায় সশস্ত্র সংগ্রাম জারি রাখাও মুশকিল। তাই তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ আপাতত মুলতবি রেখে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলেন। প্রতিষ্ঠা পেল দারুল উলূম দেওবন্দ। যার হাজার হাজার শাখা-প্রশাখা আজ উপমহাদেশের জনপদে জনপদে আলোর ফেরি করছে। জিইয়ে রেখেছে ইসলামের শাশ্বত চেতনা। আবার ব্রিটিশ-বিতাড়নেও পরবর্তী সময়ে দারুল উলুমের সন্তানগণ রেখেছেন অবিস্মরণীয় অবদান।
ইতিহাসের এই দুই পাঠকে সামনে রেখে বিধ্বস্ত এই সময়ে আমাদের কৌশল ও কর্মপন্থায় একটু পরিবর্তন আনা দরকার। সাধারণ মানুষের আত্মশুদ্ধি, হিদায়াত, দাওয়াহ, ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসার ও মানোন্নয়ন—এসব ক্ষেত্র এখনও আমাদের দেশে বেশ অবহেলিত। এ ক্ষেত্রগুলোতে অনেক কাজ পড়ে আছে। এই স্থবির সময়ে এ দিকগুলোতে বেশি ফোকাসড হওয়া অন্য যেকোনো কর্মপন্থার চেয়ে বেশি ফলদায়ক ও কার্যকরী ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে। কথাগুলো এজন্য বললাম, কারণ, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মতো অতি সাধারণ অধিকারও যেখানে ভূলুণ্ঠিত, সেখানে সংঘাত-অনিবার্য ধরনের কর্মসূচি এখন অনেকটা আত্মঘাতিই বলা যায়। সশস্ত্র, শক্তিধর ও আগ্রাসী শাসকপক্ষের বিপরীতে কেবলই মৌখিক হুংকার আখেরে ধর্মীয় পরিসরের স্বাধীন কর্মকাণ্ডে চাপ সৃষ্টির উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়। এবং হচ্ছেও।
অবশ্যি পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে ভিন্ন কথা। ফিলিস্তিনের মুসলমানদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই রমযানে দফায় দফায় তাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন। তারাবীর সালাতে হামলা হয়েছে, এমনকি ঈদের রাতেও রক্তভেজা বিভীষিকাময় মুহূর্ত পার করতে হয়েছে তাঁদেরকে। ঈদের পরের টানা কয়েকদিন হয়েছেন ইজরায়েলীদের নৃশংস হামলার শিকার। ঝরেছে প্রায় আড়াইশ তাজা প্রাণ। তবে এবারের লড়াইটা একপাক্ষিক ছিল না, ফিলিস্তিনের অজেয় প্রতিরোধ সংগঠন হামাস নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী পাল্টা জবাব দিয়েছে অনেকগুলো রকেট ছুড়ে। এবং মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের জনগণও ইজরায়েলীদের এ নিপীড়নের তুমুল প্রতিবাদ করেছেন। ফলে ইজরায়েল একপর্যায়ে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এ যুদ্ধবিরতি নতুন কোনো বর্বরতার অশনি-সংকেত কি না, তা এখনই বলা মুশকিল। ফিলিস্তিনের সংগ্রামেতিহাস, ইজরায়েলের বর্বরতা ও বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ে একাধিক রচনা থাকছে এ সংখ্যায়। আমরা দুআ করি, আল্লাহ তাআলা খুব শিগগির যেন আমাদের প্রথম কিবলার ভূমি ফিলিস্তিনকে আবারও ‘আমাদের’ করে দেন।
—হামমাদ রাগিব