নভেম্বর ২০২১

কুমিল্লা শহরের একটি পূজামণ্ডপে মূর্তির পায়ে পবিত্র কুরআন রাখার প্রতিবাদের সূত্রে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়টায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল দেশে। ধর্ম মানুষের আবেগের জায়গা, এই জায়গায় আঘাত লাগলে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি মাত্রই কষ্ট পাবেন, বিক্ষুব্ধ হবেন, এটা স্বাভাবিক। পূজামণ্ডপ কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের প্রথম করণীয়টি ছিল তৎক্ষণাৎ বিষয়টির সুরাহা করে ফেলা। কিন্তু আমরা যতটুকু দেখেছি, মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি প্রথমে আমলেই নেয়নি, আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনও মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত হানার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিচার ও সুষ্ঠু তদারকির বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস প্রদানে কাল-ক্ষেপণ করেছে। ততক্ষণে মূর্তির পায়ে কুরআন রাখার ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে তাওহীদি জনতা রাজপথে নেমে এসেছেন প্রতিবাদের জন্য। সেই প্রতিবাদ পরে সহিংসতায় রূপ নিয়ে পরের কয়েকদিন বেশ উত্তপ্ত হয়ে থাকে পুরো দেশ। চাঁদপুরে অপ্রাপ্ত বয়স্ক দুটি মুসলিম ছেলে-সহ বেশ কয়েকজন মুসলিম নিহত হয়েছেন। হিন্দুদেরও দুজনের সম্ভবত প্রাণ গিয়েছে। রংপুরে পোড়ানো হয়েছে হিন্দুদের কয়েকটি বসতভিটা।

এই ভাঙচুর ও সহিংসতা ইসলাম সমর্থন করে না, একইসঙ্গে এ দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গও এ ধরনের সহিংসতাকে সমর্থন দেন না। তাঁরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বিশ্বাসী। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই যদি প্রশাসন ও স্থানীয় পূজামণ্ডপ কর্তৃপক্ষ মুসলমানদেরকে আশ্বস্ত করতে পারতেন এবং ন্যাক্কারজনক ঘটনা যে কোনোভাবে কাম্য নয় তা পরিস্কার করতেন তাহলে ঘটনা সম্ভবত এতদূর গড়াত না।

বাংলাদেশে ধর্মীয় ইস্যুতে সংঘটিত বিগত আন্দোলন-সংগ্রামগুলো সাক্ষী, সমঝদার ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান কখনোই সহিংস ও উগ্র হন না, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য একটি পক্ষ বরাবরই সহিংসতা-ভাঙচুর চালায় এবং এর দোষ আরোপ করবার চেষ্টা করে আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে থাকা শ্রেণিটির ওপর। এই ঘটনায়ও তাই হয়েছে। মুসলিম জনসাধারণ ও আলেম-ওলামা দেশজুড়ে প্রতিবাদ করেছেন, আবার হিন্দুদের মন্দির ও আবাসে কোনো ধরনের হামলা বা আঘাত না করার ব্যাপারে তাওহীদি জনতাকে জোরালোভাবে সতর্ক করেছেন। তারপরও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলোতে কিছু অতিআবেগী ও অপরিণামদর্শী লোকের সম্পৃক্তি থাকে ঠিক, তবে এসবের মূল হোতা সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত কোনো গোষ্ঠী, যারা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে ভয়ংকর কোনো ষড়যন্ত্রের জাল বোনায় ব্যস্ত। হামলার ধরন ও পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। মুসলিম জনসাধারণকে এই গোষ্ঠীটির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত আসলে প্রতিবাদ করা অবশ্যই দরকারী, কিন্তু আমাদের এই প্রতিবাদের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেউ যেন নাশকতা সৃষ্টি করে এর দায় আমাদের ওপর চাপাতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রত্যেকেরই সচেতনতা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রতিবেশী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথেও শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দেশের অন্য কোনো স্থানে বা দেশের বাইরে তাদের ধর্মাবলম্বী কোনো উগ্র শ্রেণির উগ্রতা, মুসলিম-বিদ্বেষ ও ইসলাম অবমাননার দায় সাধারণভাবে তাদের ওপর বর্তায় না, এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। এ ধরনের কোনো ঘটনা কোথাও ঘটলে প্রতিবেশী সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উপাসনালয় কিংবা বসতভিটায় এর প্রতিক্রিয়া জাহির করা কোনোভাবেই উচিত নয়। আবার সম্প্রীতি দেখাতে গিয়ে তাদের সঙ্গে অধিক মাখামাখি কিংবা তাদের ধর্মীয় রীতি-রেওয়াজে অংশগ্রহণ বা সমর্থনও যোগানো যাবে না। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মাপকাঠি কী হবে, ইসলাম সেটা সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। এই মাপকাঠির ভেতরে থাকলে যেমন বৈরিতায়ও যাওয়া লাগবে না, তেমনি মাখামাখিপূর্ণ বন্ধুতারও দরকার পড়বে না। মাঝামাঝি একটা জায়গায় থাকা যাবে, যা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করবে। তারা থাকবে তাদের মতো, আমরা আমাদের মতো।

 

—হামমাদ রাগিব

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT