একটি সামাজিক ব্যাধির দিকে আপনাদের দৃষ্টিআকর্ষণ করতে চাই। ব্যাধিটি কমবেশি সব পরিবারেই আছে।
ঘরের বউ—তিনি স্ত্রী হোন, পুত্রবধূ হোন কিংবা ভাবি—রমযানে কিংবা এই মৌসুমী ফলের সিজনে তাঁর বাপের বাড়ি থেকে কিছু আসে কি না, পরিবারের সকলেই ইনতেযারে থাকেন; সেই সঙ্গে ইনতেযারে থাকেন পাড়া-পড়শিরাও। এটা আমাদের সমাজের অতি স্বাভাবিক একটা চিত্র। ব্যাপারটা এমন না যে, এই ইফতারি বা মৌসুমী ফলের প্রতি তাঁদের খুব লোভ, কিংবা বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে জিনিসগুলো না এলে তাঁরা অন্যকোনোভাবে তা খেতে পারছেন না। বরং এটা নিরেট এক লৌকিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিয়ে করেছ? শ্বশুরবাড়ি থেকে কয় গাড়ি ফলমূল এল জ্যৈষ্ঠ্য মাসে?
ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন? বিয়াই সাহেব কত মন ইফতারি পাঠালেন এই রমযানে?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের ইনতেযারটা থাকে কেবলই এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের জন্য। বিয়াইর বাড়ি থেকে কয়েক মন ইফতারি না এলে, শ্বশুরবাড়ি থেকে গাড়ি ভরে মৌসুমী ফল না এলে যেন আমাদের কান কাটা যায় অবস্থা। অথচ আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন একজন ব্যক্তির জন্য এ ধরনের ইফতারি আর মৌসুমী ফল গ্রহণ খুবই লজ্জাজনক একটি ব্যাপার। রমযানে কিংবা আম-কাঁঠালের সিজনে আপনি অপেক্ষায় থাকলেন, শ্বশুরবাড়ি বা বিয়াইর বাড়ির লোকজনও বুঝতে পারছে আপনি অপেক্ষা করছেন কিছু ইফতারি কিংবা কয়েকটি আম-কাঁঠালের জন্য! ব্যাপারটা লজ্জাজনক না?
তাছাড়া এই ইফতারি আর মৌসুমী ফলের ইনতেযামের জন্য আপনার স্ত্রী/পুত্রবধূর পিতাটিকে কী পরিমাণ কাঠখড় পোড়াতে হয়, আপনি হয়তো জানেন না। হয়তো বলবেন, আপনার শ্বশুর/বিয়াই বড়লোক, তাঁর জন্য কোনো সমস্যাই না। কিন্তু আপনার পাশের বাড়ির যে ছেলেটির শ্বশুর দিন এনে দিন খান, তিনি কীভাবে এই বোঝা সামলাবেন?
ব্যাপারটি বুঝতে পারছেন নিশ্চয়! এই ইফতারি ও মৌসুমী ফলের প্রথা একটি কালচারে রূপান্তরিত হওয়ায় সমাজের কেতাদুরস্ত কিন্তু দুস্থ শ্রেণিটিকে চরম বিপাকে পড়তে হয়। সামাজিক রীতি হওয়ায় মেয়ের মুখ রক্ষার্থে চড়া সুদে ধারদেনা করে হলেও ইফতারি/মৌসুমী ফল মেয়ের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা তাদেরকে করতে হয়। মেয়ের বাবাদের ঘামঝরা এই কষ্ট ও বিপাকের চিত্রগুলো কখনো খবরের শিরোনাম হতে দেখবেন না; বরং তাঁরা নিজেরাই লুকিয়ে রাখেন, খবর হতে দেন না; কিন্তু চড়া সুদে যে ধারদেনা করেছিলেন, তা শোধ করতে করতেই হয়তো আর্থিকভাবে তাঁদেরকে আরও পঙ্গু হয়ে যেতে হয়।
তাই, এই বাজে সংস্কৃতিটির ব্যাপারে আমাদের সকলকে আক্ষরিক অর্থেই সোচ্চার হওয়া দরকার। যাঁদের শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভালো না, তাঁরা তো আনবেনই না; যাঁদের শ্বশুরবাড়ির অবস্থা অনেক উন্নত ও সম্পন্ন, তাঁরাও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকবেন; শ্বশুরবাড়ি বা বিয়াই সাহেবের বাড়ি থেকে কোনো অবস্থাতেই ইফতারি কিংবা ফলমূলের গাট্টি অথবা গাড়ি যেন আপনার বাড়িমুখো না হয়। পরিবার ও পাড়া-পড়শির মধ্যেও এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিন।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখবেন, আপনি বারবার ‘না’ করার পরও জোর করে পাঠাতে চাচ্ছে, এ ক্ষেত্রেও আপনি বিনয়ের সাথে কঠোর অবস্থানে থাকুন। আপনার এই অবস্থান কেবল আপনার বা আপনার পুত্রের শ্বশুরবাড়ির ইফতারি/মৌসুমী ফল পাঠানোর বিরুদ্ধে নয়, বরং এ অবস্থান সামাজিক একটি ব্যাধি ও লজ্জাজনক কুসংস্কৃতির বিরুদ্ধে।
শ্বশুর কিংবা বিয়াই যদি অতি বড়লোক হন, আপনি বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও রমযানে বা জ্যৈষ্ঠ্ মাসে যদি একটি গাট্টি কিংবা গাড়ি পাঠিয়ে দেন আপনার বাড়িতে, তাহলে আপনিও একটা নজির স্থাপন করে ফেলুন! অতি বিনয়ের সাথে সেই গাট্টি কিংবা গাড়িটি আবার ফেরত পাঠিয়ে দিন। এবং বলুন, হাদিয়া আদান-প্রদান সুন্নত, কিন্তু এ ধরনের মৌসুমী ‘খাবার’ প্রেরণ হাদিয়ার পর্যায়ে থাকে না, বরং সামাজিকভাবে অন্য অনেক পরিবারের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাই আপনি গ্রহণ করতে পারছেন না; উপরন্তু এ ধরনের উপঢৌকন আপনি নিজের জন্য লজ্জাজনক ও বিব্রতকরও মনে করছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সবধরনের লৌকিকতা থেকে মুক্ত রাখুন। সামাজিক সব ব্যাধি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
—হামমাদ রাগিব