জানুয়ারি ২০২২

কুতবে দাওরান হযরত বর্ণভী রহমতুল্লাহি আলাইহি’র সমগ্র জীবনের দাওয়াহ ও মেহনতকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের নিভৃত এক হাওরপল্লি থেকে যে-মুবারক আধ্যাত্মিক পরম্পরা জারি হয়েছে, তা বঙ্গভ‚খণ্ডের হাজার বছরের ইসলাম-প্রচারক সূফী-দরবেশদেরই রূহানী উত্তরাধিকার। এ-ইতিহাস তো আজ সুপ্রতিষ্ঠিত যে, জাযীরাতুল আরবের বাইরে পৃথিবীর অধিকাংশ ভূখণ্ডে ইসলামের প্রসারে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও পাহাড়-নদী আর সাগর-বেষ্টিত বৈচিত্র্যময় এ-বঙ্গভূখণ্ডে ইসলাম এসেছিল স্বেচ্ছাসেবী সূফী-দরবেশদের কল্যাণে। ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা বিজয় করেছিলেন, কিন্তু তারও বহুকাল আগ থেকে শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার, শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী, বাবা আদম শহীদ, মাখদুম শাহ দৌলা, জালালুদ্দীন তাবরেজী-সহ কালের লিপি থেকে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য গৌস-কুতুব-দরবেশ এ-মাটিকে ইসলামের আবে জমজম দ্বারা সিক্ত ও উর্বর করেছেন। লালমনিরহাট জেলায় প্রাপ্ত ৬৯ হিজরী সনে নির্মিত মসজিদের ধ্বংসাবশেষ তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। এ-মসজিদ প্রমাণ করে—সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই, কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষণ ছাড়া কেবলই সূফী-দরবেশদের ঐকান্তিকতা ও প্রচেষ্টায় এ-অঞ্চলে ইসলাম আবাদ হতে শুরু করে। মুসলিম শাসকদের বাংলা-বিজয়ের প্রাক্কালে ও পরবর্তী সময়েও বাংলার আধ্যাত্মিক রাজত্ব সূফী-দরবেশদের হাতে ছিল। নূর কুতুবুল আলম, শাইখুল হাদীস আবু তাওয়ামা, শাইখুল হাদীস ইয়াহইয়া মানেরী, হযরত শাহজালাল ও তাঁর সাথীবর্গ প্রমুখ মনীষী বুযুর্গ রাজ-ক্ষমতার প্রভাব থেকে নিজেদের যথাসম্ভব মুক্ত রেখে দ্বীন ও উলূমে দ্বীনের প্রচার-প্রসারের কাজ করে গেছেন।

হযরত শায়খে বর্ণভীর আধ্যাত্মিকতা ও কর্মধারায় যেমন এ-সকল সূফী-দরবেশের কর্মপদ্ধতির উদ্ভাস ছিল, তেমনি তাঁর রক্তেও বহমান ছিল তাঁদের সিলসিলা। সিলেটের ইতিহাসখ্যাত মনীষী-ব্যক্তিত্ব হযরত গাজী বুরহানুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁরই গর্বিত পূর্বপুরুষ, এই মহান গাজীর আহ্বান ও আকুতির নিমিত্তেই হযরত শাহজালাল সিলেট অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।

একদিকে শাহজালালের স্নেহধন্য গাজী বুরহানুদ্দীনের রক্তজাত উত্তরাধিকার, আরেকদিকে বঙ্গীয় সূফী-দরবেশদের হাজার বছরের দাওয়াতী মেহনতের পরম্পরা, অন্যদিকে শাইখুল আরব ওয়াল আজম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি’র একান্ত শিষ্যত্ব ও খিলাফাত—হযরত শায়খে বর্ণভী এ-সবের অভূতপূর্ব ও স্বার্থক সমন্বয় সাধন করেছিলেন তাঁর কর্মপদ্ধতিতে। আর এই সমন্বয়েরই সাংগঠনিক রূপ দাঁড় করিয়েছিলেন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর মাধ্যমে। সংগঠনটি বিগত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এ-দেশের মানুষের, বিশেষত বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইসলাহ, হিদায়াত ও ধর্মীয় সংস্কৃতির দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে আসছে। শায়খে বর্ণভীর ইন্তিকালের পরে আঞ্জুমানের হাল ধরে ছিলেন তাঁরই বড়-সাহেবযাদা ফেদায়ে ইসলাম আল্লামা খলীলুর রহমান হামিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনি তাঁর দায়িত্বকালে আঞ্জুমানের উন্নয়নকল্পে নানামাত্রিক খিদমাত আঞ্জাম দিয়েছেন। ২০২০ সালের ৯ অক্টোবর তিনিও মহান রবের আহ্বানে সাড়া দিলে এর দায়িত্বভার অর্পিত হয় অপর সাহেবযাদা হযরতুল আল্লাম মুফতী মুহা. রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী দা. বা.-এর উপর।

পত্রিকার বক্ষ্যমাণ সংখ্যাটি যখন পাঠকের হাতে, ঈসায়ী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তখন নতুন বছরের সূচনা। স্বাভাবিকভাবেই বিদায়ী বছরের একটা হিসাব-নিকাশ সামনে চলে আসে। আলহামদুলিল্লাহ, বিগত বছরটি ছিল আঞ্জুমানের নানামাত্রিক কর্মতৎপরতায় মুখরিত। আমীরে আঞ্জুমানের সক্রিয় তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আঞ্জুমানের শাখা পুনঃগঠন ও নতুন শাখা গঠিত হয়েছে। বছরের শেষ-দিকে কেন্দ্রীয়ভাবে ইসলাহী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আঞ্জুমানের সকল কর্মসূচি বাস্তবায়নে গ্রহণ করা হয়েছে কার্যকরী উদ্যোগ। টানা কয়েক বছরের অনিয়মিতির পর সংগঠনের বক্ষ্যমাণ মুখপত্র ‘মাসিক হেফাজতে ইসলাম’ আবারও নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। পাঠকের আগ্রহের ফলে পত্রিকার কাটতিও, মাশাআল্লাহ, বিদায়ী বছরের শুরুর তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ-সবই সম্ভব হচ্ছে আল্লাহ তাআলার একান্ত তাওফীক, অনুগ্রহ এবং বর্ণভী সিলসিলার ভক্ত-অনুরক্ত ও শুভাকাক্সক্ষীদের উৎসাহ, আগ্রহ ও ঐকান্তিক সহযোগিতার বদৌলতে।

প্রতিবারের মতো নতুন বছরের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে হযরত শায়খে বর্ণভীর দুআর ফসল ও বর্ণভী সিলসিলার দ্বিতীয় মারকায জামেয়া মাদানিয়া কাওমিয়া শেখ এম. এ. জব্বার কমপ্লেক্স-এর বার্ষিক মাহফিল। মাহফিলে আগত অতিথি, মুসল্লী এবং মাসিক হেফাজতে ইসলামের লেখক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্য আমাদের তরফ থেকে সালাম ও মুবারকবাদ। আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর নতুন যাত্রায় আমাদের সঙ্গী-সহযাত্রীদের জন্যও অনিঃশেষ দুআ ও শুভকামনা। আল্লাহ সকলের কল্যাণ করুন। আমীন।

—হামমাদ রাগিব

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT