আগস্ট ২০২১

ধারাবাহিক লকডাউনে জনজীবন নাকাল। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের দেশে দারিদ্র্যের হার বেশি, প্রায় পরিবারই নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত; যাদেরকে দিন এনে দিন খেতে হয়। টানা কয়েক মাস ধরে সীমিত কিংবা কঠোর লকডাউন দিয়ে যদি এই মানুষগুলোকে কর্মহীন করে ফেলা হয়, তাহলে তাদের বাঁচার পথই তো রুদ্ধ হয়ে যায়! করোনা থেকে বাঁচার জন্য যে লকডাউন, সে লকডাউনই এখন মরার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ করোনাকে থোড়াই কেয়ার করছে, ভয় পাচ্ছে লকডাউনকে।

উলামায়ে কেরাম ও ধর্মপ্রাণ শ্রেণি কোনো মহামারির ‘মুকাবিলা’য় বিশ্বাসী নন; কেননা, খোদায়ী আযাব কিংবা মহাপরীক্ষার ‘মুকাবিলা’ করা কারও পক্ষে সম্ভব না; কিন্তু মহামারি থেকে বাঁচতে যথাসাধ্য পদক্ষেপ গ্রহণে সকলেই একমত। বাংলাদেশে করোনার ঢেউ এসে লেগেছে প্রায় দেড় বছর হতে চলল, এই দেড় বছরে করোনা থেকে বাঁচতে এক লকডাউন ছাড়া গণহারে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপের বাস্তবায়ন আমাদের চোখে পড়েনি। আক্ষরিক অর্থে এখনো গণহারে করোনা প্রতিষেধক টিকার কার্যক্রম সেভাবে শুরুই হয়নি। ‘গণহারে’র নামে যে কার্যক্রমটি চলছে, তা বিশেষায়িত কয়েকটি শ্রেণির মধ্যে এখনো সীমাবদ্ধ। টিকার জন্য দীর্ঘ একটা সময় আমাদেরকে ভারতের উপর ভরসা করতে হয়েছে, শেষমেশ চুক্তিমতো টিকা দিতে পারেনি দেশটি। অথচ একই সময়ে ভারত ছাড়াও টিকা আমদানিকারক অন্যান্য দেশের দিকে মনোনিবেশ করলে এতদিনে হয়তো গণ টিকা দানের কাজ প্রায় সম্পন্নের পথে এসে যেত। টিকার চেয়েও বেশি জরুরি ছিল অক্সিজেন। দেড় বছর সময়কালে অন্তত প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা সম্ভব ছিল, কিন্তু আমরা এ ক্ষেত্রেও ভারতের উপর ভরসা করে বসে ছিলাম। ফলে এখন যখন সংক্রমণের হার প্রায় প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে, ভারত থেকে সর্বোচ্চ মাত্রায় অক্সিজেন আমদানি করেও কুল পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সদর হসপিটালগুলোতে প্লান্ট বসানো থাকলে সেখান থেকেই নিজস্ব উৎপাদনের অক্সিজেন চাহিদা মেটাতে পারত। স্বাস্থ্যখাতের ব্যাপক দুর্নীতির কথা আর নাই-বা বললাম।

গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষকে বাঁচাতে হলে লকডাউন নয়, জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রেখে করোনা-প্রতিষেধক কার্যক্রমের দ্রুত বাস্তবায়ন আগে জরুরি। এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপগুলোর দিকে দেশের নীতিনির্ধারক মহলের যথাযথ মনোযোগ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা কাম্য। এ খাতের সকল দুর্নীতি ও অবহেলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলে এখনো সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

 

দুই.

আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা আল্লাহ চাহে তো আবারও তালেবানের হাতে যাচ্ছে। টানা দুই দশকের যুদ্ধে দেশটির অপূরণীয় ক্ষতি এবং নিজেদের সেনা, শক্তি ও বিপুল অর্থের বেফায়দা অপচয় ছাড়া আর কিছু করতে না পেরে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট ইতিমধ্যেই নিজ নিজ দেশে ফেরত গেছে। অল্প যে কিছু সংখ্যক সৈন্য রয়েছে তারাও ১১ সেপ্টেম্বরের ভেতর ফেরত যাবে। দীর্ঘ এ যুদ্ধে তালেবানের মতো সামান্য এক পাহাড়ি যোদ্ধাদলের সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীটি কেন জয়ী হতে পারল না? এর বিশ্লেষণী জবাব হয়তো অনেকভাবেই দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমরা যদি সাদা চোখে দেখি, তাহলে এখানে তালেবানের অদম্য সাহস আর ঈমানী শক্তিটাকেই মুখ্য পাব। ২০ বছর আগে আমেরিকা যখন আফগানিস্তানে হামলে পড়েছিল, সকলেই ভেবেছিল, তালেবানের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। কিন্তু সেই সময়ে ভয়েস অব আমেরিকার নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তালেবানদের নেতা মোল্লা মুহাম্মাদ উমরের সুর ছিল ভিন্ন এবং প্রবল আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। তাঁর কাছে সাংবাদিক প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘আমেরিকার মতো শক্তিশালী একটি পক্ষের মুকাবিলায় নেমেছেন আপনারা, কী মনে করেন, আমেরিকা কি আপনাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না?’ উত্তরে মোল্লা উমর বলেছিলেন, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখি এবং তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করি। কোনো মুমিন আল্লাহর কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করলে তিনি অবশ্যই অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকান। আর আল্লাহর অনুগ্রহ যদি আমরা পেয়ে যাই, কেউ আমাদের পরাজিত করতে পারবে না।’ সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে মোল্লা উমর এ সময় বলেছিলেন, ‘পয়েন্টটি মার্ক করে রাখুন।’ আজ ২০ বছর পর এসে এ মুজাহিদ-নেতার কথারই প্রতিফলন ঘটেছে। পরাশক্তির তুলনায় বাহ্যত কোনো রসদই তো তাঁদের ছিল না, কিন্তু ২০ বছর ধরে তাঁরা অজেয় থেকেছেন। অবশেষে শত্রুপক্ষ তল্পিতল্পা গুটাতে বাধ্য হয়েছে! বস্তুত মুমিনের মূল শক্তি এখানেই। সকল কিছু আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা। বিপদে-মুসীবতে সর্বাবস্থায় তাঁর ওপর ভরসা করা, কেবলই তাঁরই কাছে অনুগ্রহ তালাশ করা। এবং সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাওয়া। একজন মুমিনের জীবনে এ গুণগুলো যদি থাকে, তাহলে দুনিয়ার সকল শক্তির সামনেই সে অজেয় থাকবে। তালেবানের বিজয় আমাদেরকে এ বার্তাটিই দিয়ে গেল।

 

—হামমাদ রাগিব

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT