আলোকিত জীবনের সৌরভ-০২

الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه ونعوذ بالله من شرور انفسنا ومن سيئات اعمالنا من يهد الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له ونشهد ان سيدنا ومولانا محمدا عبده ورسوله صلى الله عليه وعلى اله واصحابه واهل بيته اجمعين

প্রিয় অভিভাবক এবং সুধীমণ্ডলী!

সন্তান লালন-পালনে আমাদের অনেক দায়িত্ব আছে। এর মধ্যে একটি হলো, বাচ্চাকে সঠিক শিক্ষা দান করা। সবার জন্য দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা ফরয। ইসলামী রাষ্ট্রে তা অপরিহার্য কর্তব্য। ব্যক্তিগতভাবে যেমন একজন মানুষের জন্য দ্বীনী ইলম তালাশ করা ফরয, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে- দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে ইলম অর্জন করতে পারে সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া।

হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ.

‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর ইলম অর্জন করা ফরয।’ (ইবনে মাজাহ, হাদীসক্রম : ২২৪)

আমাদের সন্তান আল্লাহর তরফ থেকে পরীক্ষা। তাদেরকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে ঘোষণা হয়েছে-

وَاعْلَمُوْۤا اَنَّمَاۤ اَمْوَالُكُمْ وَ اَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ، وَّ اَنَّ اللهَ عِنْدَه اَجْرٌ عَظِیْمٌ۠.

“জেনে রেখ, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা। আর মহা পুরস্কার রয়েছে আল্লাহরই কাছে।” (সূরা আনফাল, আয়াতক্রম : ২৮)

আজ শিক্ষার অবস্থা করুণ। মৌলিক ফরয শিক্ষাকে দেখা হচ্ছে অবহেলার নজরে। এবিষয়ে জাতি উদ্বিগ্ন। শিক্ষাঙ্গনের অবস্থা শুনলে কষ্ট হয়। সঠিক লেখাপড়া না থাকার কারণে ছেলেমেয়েরা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। বাবা-মায়ের মনে কষ্ট দিচ্ছে। অনেক সন্তান উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাচ্চাদের অমানবিক, অশৃঙ্খল চলাফেরার কারণে পরিবারকে সমাজের চোখে ছোট হতে হচ্ছে।

আলহামদুলিল্লাহ, আপনারা বাচ্চাদের দ্বীনী ইলম শিখানোর জন্য, সত্যিকারের মানুষ বানানোর জন্য চেষ্টা করছেন। মাদরাসায় দিয়েছেন। এটা প্রশংসনীয়।

বাবা এবং মায়ের ওপর বাচ্চাদের সাধারণত তিনটি হক রয়েছে। এক. জন্মের সাথে সাথে ভালো ইসলামী নাম রাখা। দুই. ইসলামী শিক্ষা দেওয়া। তিন. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে বিয়ের ব্যবস্থা করা। সন্তানের হক ঠিকঠাক আদায় না করলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে। হাদীসে এসেছে-

أَلاَ كُلّكُمْ رَاعٍ وَكُلّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيّتِهِ،… وَالرّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ، وَهِيَ مَسْؤُولَةٌ عَنْهُمْ،… أَلاَ فَكُلّكُمْ رَاعٍ وَكُلّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيّتِهِ.

‘শুনে রাখো, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।…পুরুষ তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী তার পরিবার, সন্তান-সন্ততির বিষয়ে দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।… জেনে রাখো, প্রত্যেক ব্যক্তিই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্তদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত করা হবে।’ (বুখারী, হাদীসক্রম : ৭১৩৮)

আমরা বাচ্চাদের জিম্মাদারী সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করব। সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে দুআও করবো। পিতা-মাতার দুআ আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। হাদীস শরীফের ইরশাদ-

ثلاثُ دعواتٍ مستجاباتٌ لا شكّ فيهن: دعوة الوالد، ودعوة المسافر، ودعوة المظلوم.

‘তিন ব্যক্তির দুআ কবুল হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পিতা-মাতার দুআ, মুসাফিরের দুআ ও মাযলুমের দুআ।’ (আবু দাউদ, হাদীসক্রম : ১৫৩৬)

সন্তান মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মা-বাবার দুআর বড় ভূমিকা রয়েছে। এজন্য নবীগণ তাদের সন্তানদের জন্য দুআ করতেন।

আজকে আপনারা মাদরাসার অভিভাবক সম্মেলনে এসেছেন। যে-সব মাদরাসা থেকে সর্বপ্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের আযান দেওয়া হয়েছিল। তা হল কওমি-দেওবন্দী ঘরানার মাদরাসা। যদি দেওবন্দ থেকে স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরীগণ আযান না দিতেন, অভিযান না চালাতেন তাহলে আজও আমরা পরাধীন থাকতাম।

আমরা একবার ভারত সফরে যাই। দেওবন্দের খানকাহে এমদাদিয়াতেও সফর হয় তখন। এটি হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজীরে মক্কী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর খানকা। আমরা দেখতে পাই, হযরতের বিশ্রামাগারের চৌকাঠে কিছু গুলির দাগ বিদ্যমান। যা ব্রিটিশ বাহিনী উনাকে হত্যা করার জন্য ছুঁড়েছিল। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী ছিলেন একজন সুফি আলেম। পাশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রামেরও ছিলেন একজন অকুতোভয় বীর।

দেশ-ধর্ম এবং ইসলামের জন্য দেওবন্দের অনেকেই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলেন শাইখুল হিন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহি। উনার ইন্তেকালের পর গোসল দিতে গিয়ে দেখা গেলো, শাইখুল হিন্দের শরীরে বিশ্রী রকমের কিছু জখমের দাগ রয়েছে। উনারা ঘরে খবর পাঠালেন, এটা কীসের দাগ হতে পারে? শায়খুল হিন্দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর কী ফোড়া বা এমন কিছু হয়েছিল? ঘরের মানুষজন বললেন, ‘আমাদের জানা নেই।’

উনার প্রিয় ছাত্র ছিলেন শায়খুল আরবে ওয়াল আযম হুসাইন আহমদ মাদানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। ওস্তাদের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তিনি ছুটে আসলেন। তাঁর কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মাদানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, শাইখুল হিন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই বিষয়টা জীবিত থাকাবস্থায় আমাকে বলতে নিষেধ করেছিলেন। আজ যেহেতু তিনি পৃথিবীতে নেই, তাই এখন আমি এই বিষয়টি বলছি, ‘অসহযোগ আন্দোলনের কারণে ইংরেজরা শায়খুল হিন্দ রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে মাল্টার কারাগারে বন্দি করে রাখে। নির্বাসিত এই বন্দি জীবনে তারা প্রায়ই হযরতকে নির্যাতন করত। ব্রিটিশ হানাদার বাহিনী লোহার রড আগুনে উত্তপ্ত করে শাইখুল হিন্দকে বলতো, তুমি ইংরেজের পক্ষে চলে আসো তাহলে বেঁচে যাবে। নতুবা উত্তপ্ত লাল শিকের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। শায়খুল হিন্দ রহমাতুল্লাহি আলাইহি মানতেন না। ফলে তারা নির্যাতন করতে থাকতো। কখনো জ্বলন্ত অঙ্গার বিছিয়ে তাতে শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে শুয়িয়ে দেওয়া হতো।

যার ফলে হযরতের শরীর পুড়ে যেত। দাগ হয়ে পড়তো। দেশ, ধর্ম রক্ষার্থে তারা জীবনের পরওয়া করেননি। তারাই ছিলেন কওমি মাদরাসার সন্তান। এই দেওবন্দ থেকেই শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম ভূমিকা। পাক-ভারত উপমহাদেশের আলেম-উলামাগণের এই ত্যাগ অনস্বীকার্য। ভুলার মত নয়।

বুঝা গেল, কওমি মাদরাসা দেশ-জাতি রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী খুঁটি। সঠিক মানুষ গড়ার অন্যতম কারখানা হলো কওমি মাদরাসা। এই মাদরাসায় সোনার মানুষ গড়া হয়। শিখানো হয় কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত। হাদীস শরীফ এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন মাসআলা-মাসাইল।

একবার এক জমির মালিক মাদরাসা পরিচালকের কাছে নালিশ জানালেন যে, আপনার ছাত্ররা আমার জমিতে শৌচকার্য করে ফেলে। এতে আমার ক্ষতি হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়। ওস্তাদ প্রশ্ন করলেন, যারা এই কাজ করে তারা যে আমার মাদরাসার ছাত্র সেটা আপনি কীভাবে বুঝলেন? মালিক জবাব দিলেন, মলের পাশে মাটির ঢিলা পাওয়া যায়।

এটা শুনে ওস্তাদ ছাত্রদের নিষেধ করলেন এবং এটা ভেবে খুশি হলেন যে, ছাত্ররা পায়খানার সময় ঢিলা ব্যবহার করে। নবীজির সুন্নত মানে। এই হলো কওমি মাদরাসা। সুন্নাহভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইসব মাদরাসা। সুন্নাহ শিক্ষার মারকাজ।

সন্ত্রাসমুক্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কওমি মাদরাসা। এতে আদর্শ মানুষ তৈরি হয়। জাতির নেতৃত্ব ও কর্ণধার হিসেবে গড়ে ওঠে। এখানকার ছাত্ররা মানুষ হতে আসে। মানুষ হয়েই ঘরে ফিরে। এই প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত না। কোন দলেরও না। বরং জন মানুষের প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এইসব মাদরাসা।

কুতবে দাওরান, শায়খুল ইসলাম হযরত লুৎফুর রহমান বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর বহুবছরের একটি সাধনা ছিল শ্রীমঙ্গলের ভৈরবগঞ্জে একটি দ্বীনী মারকাজ গড়ে তোলা। তাই তিনি এই ব্যাপারে মহান আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর কাছে দুআ করতেন। আল্লাহর ইচ্ছায় মরহুম শেখ আব্দুল জব্বার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ভৈরবগঞ্জ বাজারের পাশে ১২৯ শতক জায়গা কওমি মাদরাসার জন্য দান করেন। এভাবে আল্লাহ কবুল করলেন হযরতের দুআ। ২০০৩ সাল থেকে চালু হয় এই জামিয়া। সেই থেকে আজ অবধি শেখবাড়ী জামিয়ার কার্যক্রম আল্লাহর দয়ায় চলে আসছে। আপনাদের দান-অনুদান, সাহায্য-সহযোগিতা রয়েছে এই মাদরাসার উন্নতিতে। আলহামদুলিল্লাহ।

শুরুতে এই মাদরাসায় অনেক চুরি হতো। চুরি বন্ধ করতে স্টাফদের কিছু নির্দেশনা দেওয়া হল। বলা হল, আল্লাহ তাআলার ইসমে আযমের আমল করতে এবং যদি কখনো কোন চোর ধরা পড়ে তাহলে তাকে মাদরাসার দক্ষিণের একটি রুমে আটকে রাখতে। তখন মসজিদের কার্পেট চুরি হয়ে যেত, শিক্ষকদের জামা-কাপড়, জুতা চুরি হয়ে যেত। এমনকি বোর্ডিংয়ের ভাত-তরকারিও চুরি হতো। একসময় চোর ধরা পড়ল। আল্লাহর ইচ্ছায় দেখা গেল, চুরিকৃত সকল মালামাল সে ফিরিয়ে দিয়েছে। আলহামদুল্লিাহ।

শেখবাড়ী জামিয়া মরহুম বর্ণভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর দুআর ফসল। আমাদের ধারণা, আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করেছেন।

মাদরাসা দিনদিন এগিয়ে যাচ্ছে। ছাত্ররা সুনামের স্বাক্ষর রাখছে বিভিন্ন বোর্ডে। ৮৪টি মুমতাজ পেয়েছে গত বোর্ড পরীক্ষায়। সুযোগ্য আসাতিজায়ে কেরাম রয়েছেন এখানে। আমার তিন ছেলে আসাতিজায়ে কেরামদের নিয়ে মাদরাসার উন্নতির চিন্তা করে যাচ্ছেন সবসময়। নায়েবে মুহতামিম হযরত শেখ আহমদ আফজাল বর্ণভী ব্রিটেন থাকলেও সদাসর্বদা মাদরাসার অগ্রগতি, তালিম-তরবিয়ত ও খাবার-দাবারের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখছেন। বাকি দুই ভাইও সুনামের সাথে মাদরাসাকে সুন্দরভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ি থেকে আসা ছোট্ট সোনামণিরা যাতে সোনার মানুষ হয়েই মা-বাবার কাছে ফিরতে পারে এই প্রত্যাশা আমাদের সবার।

টাকা-পয়সা জমা করে কোন কাজ আমরা করি না। বিশেষ করে কওমি মাদরাসাগুলো স্থায়ী আয়ের উপর ভিত্তি করে চলে না। এই মাদরাসাও এভাবে গড়ে উঠেছে। মসজিদ হয়েছে এভাবেই। তাওয়াক্কুল করে কাজ শুরু হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পূর্ণতায় পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এবারের পাঁচতলা ভবনকে আমরা ‘ফয়যে বর্ণভী ভবন’ নামে নামকরণ করেছি।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে দ্বীনের খাদিম হিসেবে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

 

(শেখবাড়ী জামিয়ার নতুন পাঁচতলা বিল্ডিং উদ্বোধন ও অভিভাবক সম্মেলনে প্রদত্ত বয়ান : ১০ জুন ২০২৩ শনিবার, অনুলিখন করেছেন- মাওলানা মিজানুর রহমান নাঈম)

এ জাতীয় আরো লেখা

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT