বর্তমান যুগে দ্বীনী প্রতিষ্ঠান আছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি। সে-সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীও আছে। পূর্বেকার তুলনায় বহুগুণ বেশি। সেখানে পড়াশোনাও আছে। এমনকি আগের তুলনায় অনেক সৃজনশীল পদ্ধতিতে। বছর শেষে পরীক্ষার রেজাল্টও বেরিয়ে আসছে। বাস্তব কথা বললে, আগেকার তুলনায় বর্তমানে পাসের পার্সেন্টিজও অনেক বেশি।
তবুও কিছু যেন একটা নেই! কীসের যেন একটা চরম অভাব! কিছু একটা যেন আমাকে নিয়ে যায় সুদূর সেই অতীতে। যে অতীতে ছিল না এত প্রতিষ্ঠান। ছিল না গোনার মত তেমন শিক্ষার্থীসংখ্যা। না ছিল এত সৃজনশীলতা, আর না ছিল এত বেশি মুমতাজ, বৃত্তি আর পাসের গ্রেড। সেখানে সেটিই ছিল, যে জিনিসটি বর্তমানে নেই।
কোন সেই জিনিসটি? তা নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে মুহতারাম পাঠকের সামনে আমি একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, ‘আপনি কি কেনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, নাকি অভিভাবক?’ যদি শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন তাহলে আপনি আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন, ‘আপনি কী কারণে এই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন?’ ‘কী কারণে আপনি লেখাপড়া করছেন?’ যদি আপনার মন এটা উত্তর দেয় যে, পরিবারের চাপে কিংবা বাড়ির কাজকর্ম থেকে পালিয়ে বাবা-ভাইয়ের কষ্টার্জিত টাকা উড়ানোর জন্য আপনি লেখাপড়া করছেন, তাহলে আপনি এখানেই থেমে যান। এই লেখাটি আপনার জন্য না। আর মন যদি এই উত্তর দেয় যে, আপনি সত্যিকারের একজন জ্ঞানী হওয়ার জন্য লেখাপড়া করছেন, নিজেকে আদর্শ একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন, তাহলে সামনের দিকে এগিয়ে যান। আশা করা যায় আপনার জন্য এখানে কিছু খোরাক মিললেও মিলতে পারে।
আর আপনি যদি অভিভাবক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনিও প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আপনার সন্তানকে কেন এই প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছেন?’ বাড়িতে সে আপনাদেরকে খুব বেশি জ্বালাতন করে, সেই জ্বালাতন থেকে বাঁচার জন্য? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয় তাহলে আপনিও এখানে থমকে যান। আমার এই লেখাটি আপনার জন্যও না। আর মন যদি এই উত্তর দেয় যে, একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানকে আদর্শ একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তাহলে আপনিও সামনে এগোতে পারেন। আপনার জন্যও কিছুটা পাথেয় মিলতে পারে এখানে।
তো আমি যে বিষয়টি আলোচনা করছিলাম, আগের যুগে এত এত আয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কিছু একটা ছিল, যা বর্তমান সময়ে নেই। সেটি হচ্ছে, সত্যিকারের কাজের মানুষ, আদর্শ মানুষ, এককথায়- একজন সফল পুরুষ। যা তৈরি হওয়ার জন্য লাগে দৃঢ় সংকল্প। প্রয়োজন পড়ে বিরামহীন প্রচেষ্টার।
আধুনিকতার গড্ডলিকাপ্রবাহে আমরা গা ভাসিয়ে দিয়েছি। ডিজিটালের ধমকা হাওয়ায় আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ ভুলে যেতে বসেছি। অতীতকে সরিয়ে দিয়েছি যোজন কিলো দূরে। তাই আসুন, অতীতকে সঙ্গে নিয়ে আগামীর পথচলার স্বপ্নকে রাঙ্গিয়ে তুলি।
বর্তমান সময়ে দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলোতে এরকম মানুষ তৈরি না হওয়ার পেছনে কারণ কী? এ সম্পর্কে আমি আমার ছাত্রজীবনে নিজ চোখে দেখা এবং শিক্ষকতা জীবনে ছাত্রদের সাথে গভীরভাবে মেশার ফলে বাস্তবতা থেকে যে জিনিসটি আঁচ করতে পেরেছি তা সামনে রেখেই কিছু কারণ আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাইবো।
যে-সমস্ত কারণে সম্ভাবনাময়ী এমন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পড়ালেখা সমাপ্ত করার আগেই ঝরে যায়, যাদের নিয়ে শিক্ষক আর অভিভাবকেরা অনেক স্বপ্ন দেখতেন। অনেকে আবার পড়ালেখার সমাপ্তি পর্যন্ত পৌঁছে ঠিক; কিন্তু গোনার মত একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে পারে না।
তবে হ্যাঁ, এখনো এমন কিছু সচেতন শিক্ষার্থী আছে, যারা খুবই সতর্ক। নিজেদেরকে সফল মানুষ হিসেবে তৈরি করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সঠিক পথেই হাঁটছে। শিক্ষক এবং অভিভাবক থেকে নিয়ে সমাজের লোকেরা এদেরকে নিয়ে বুক ফুলিয়ে গর্ব করতে পারেন এখনও।
তো আমার কথা আর লম্বা করছি না। এখন আমি উল্লেখ করব সেই কারণ-সমূহ, যেগুলোর প্রতি খেয়াল না রাখার কারণে আগের মত মানুষ তৈরি হচ্ছে না।
১. স্মার্টফোন : ডিজিটাল জামানায় উন্নতির নামে মানুষের জন্য স্মার্টফোন একটি মহামারিতে রূপ নিয়েছে। আর বিশেষ করে ছাত্রদের জন্য এটি সবচেয়ে বড় মহামারি; ক্যান্সারের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাস তালাশ করলে দেখা যাবে, যে-সব লোক আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, যারা সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন, তাদের সকলেই সময়কে কদর করেছেন। সময়কে গুরুত্ব দেওয়ার ফলেই আজ তাঁরা এই স্থানে এসে উপনীত হয়েছেন। পৃথিবীর কোথাও এমন ইতিহাস নেই যে, একজন মানুষ বড় হয়ে গেছেন; অথচ সময়কে গুরুত্ব দেননি।
সময় এমন একটি হাতিয়ার, যা আপনাকে পৌঁছে দিতে পারে আপনার মানযিলে মাকসুদে। আবার আপনাকে ডুবিয়ে দিতে পারে মূর্খতার অতল সাগরে।
ছাত্র হিসেবে যে সময়গুলো আমাদের বইয়ের পেছনে, লেখালেখির পেছনে এবং জ্ঞানচর্চার পেছনে ব্যয় করার কথা ছিল, সেই সময়গুলোকে আমরা আজ বিনষ্ট করে দিচ্ছি স্মার্টফোনের ভেতরে।
বড় বড় শিক্ষার্থীদের কাছে স্মার্টফোন তো আছেই, বড় আফসোস লাগে যখন দেখি তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রদের মাঝেও আজ স্মার্টফোনের প্রতিযোগিতা।
স্মার্টফোনের ভেতরে ঢুকলে কীভাবে যে সময়গুলো কেটে যায়, আমরা যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করছি তারা সবাই এ কথার সাক্ষী দেব।
অনলাইনে ইংরেজি শিখার বাহানা করে, স্বল্প খরচে কিতাবাদী ডাউনলোড দিয়ে পড়ালেখার কথা বলে অভিভাবককে ধোঁকা দিয়ে মোবাইল নিয়ে আসে। সরলমনা অভিভাবকরাও তাদের চালাক সন্তানদের কাছে ধোঁকা খেয়ে যান।
পরামর্শ
আপনি যদি একজন আদর্শ শিক্ষার্থী হতে চান, তাহলে আজই স্মার্টফোনকে পরিহার করুন। আর আপনি যদি অভিভাবক হয়ে থাকেন, আপনার সন্তানকে যদি আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন বুকে লালন করে থাকেন, তাহলে আপনিও সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। আপনার সন্তানকে স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখুন।
আমার নিজের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল, আমি তাকমীল ফিল হাদীস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেছি কয়েক বছর হয়েছে। ছাত্রজীবনে আমার কাছে কোনো স্মার্টফোন ছিল না। যেহেতু আমার সহপাঠী অনেকেরই স্মার্টফোন ছিল, তাই তাকমিল ফিল হাদীস সম্পন্ন করার তিন বছর আগে আমি আমার অভিভাবক বড় ভাইয়ার কাছে এসে স্মার্টফোন কেনার বায়না ধরলাম। প্রথমে তিনি আমাকে বুঝালেন, স্মার্টফোন কিনলে এখন পড়ালেখায় ক্ষতি হবে। আমি যখন মানতে নারাজ ছিলাম, তখন তার রাগ উঠে গেল। পায়ের জুতা হাতে নিয়ে আমার মাথা এবং ঘাড়ে সেই কী আঘাত! যার কথা মনে পড়লে এখনও ব্যথা অনুভব হয়। তার রাগ থামলে তিনি আমাকে নিয়ে সুন্দর করে আবার বুঝালেন। তখন আমি ছাত্রজীবনে স্মার্টফোন না কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেই দিনটার জন্য আমার ভাইয়ের জন্য আজ আমি মন খুলে দুআ করি। তিনি যদি একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে এমন ভূমিকা পালন না করতেন, তাহলে আমিও হয়তো স্মার্টফোনের ধোঁকায় পড়ে অকালেই ঝরে যেতাম।
২. বন্ধুত্ব : মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখা একটি ভালো গুণ। একে অপরের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করা একটি উত্তম চরিত্র। শিক্ষার্থীদের জন্য এই গুণটি মারাত্মক একটি ব্যাধি। কারণ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে, চলাফেরা করতে এবং কথাবার্তা বলতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। যে সময়গুলো ব্যয় করার কথা ছিল পড়ালেখার পেছনে, সে সময়গুলো অজান্তে আর বেখিয়ালে চলে যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা ইয়ার্কিতে। অথচ আমার এ কথা জানা আছে যে, ‘কিতাবই হচ্ছে প্রকৃত বন্ধু।’
হ্যাঁ, বাস্তব তো এটাই যে, কিতাব আপনাকে এমন জিনিস দেবে, যা আপনার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করবে। আর বন্ধু আপনাকে দেবে তো দূরের কথা; বরং আপনার অনেক জিনিস বন্ধুত্বের খাতিরে কেড়ে নিবে।
বন্ধুত্ব নিয়ে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর আত্মজীবনী ‘আপবীতি’ থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি। তিনি বলছেন, ‘আমার আব্বাজান (মাওলানা ইয়াহইয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) সবচেয়ে বেশি কড়াকড়ি করতেন বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরির ব্যাপারে। তাঁর একটা উক্তি, যা তিনি প্রায়ই বলতেন যে, ‘একজন মানুষ যতই মেধাহীন ও দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী হোক না কেন, যদি তার মাঝে বন্ধুত্ব পাতানো ও সম্পর্ক তৈরির রোগ না থাকে, তাহলে কোন এক সময় সে অবশ্যই কাজের লোক হয়। আরেকজন যতই যোগ্যতা সম্পন্ন, প্রখর মেধাবী এবং জ্ঞানপিপাসু হোক না কেন, যদি তার মাঝে সম্পর্ক পাতানোর স্বভাব থাকে, তাহলে সে তার আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা বিস্মৃত হবেই।’ তাছাড়া অল্প বয়সী দাড়িহীন বালকদের সাথে মেলামেশা করা তার দৃষ্টিতে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল।
আমার জন্য তো এটা সম্ভব ছিল না যে, আমি কাউকে সালাম দিব কিংবা আমি স্বেচ্ছায় এমন কারো পাশে জামাতে নামাযে দাঁড়াবো, যার পাশে এর আগে নামাযে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যদি অপরিচিত কেউ আমাকে সালাম দিত, তাহলে আমার কাছে জানতে চাওয়া হতো যে, ‘এ কে?’ যদি নামাযে আমার পাশে এমন কেউ এসে দাঁড়াতো, যে এর আগেও নামাযে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাহলে ভয়ের কারণে নিয়ত ছেড়ে দিয়ে আমাকে অন্যত্র দাঁড়াতে হতো। কখনো আবার কফ ফেলার বাহানা করে সটকে পড়তে হতো।’ (আপবীতি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৫)
পরামর্শ
আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে বন্ধুত্ব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। আর যদি বন্ধুত্ব করতেই হয়, তাহলে আমি আপনাকে পরামর্শ দেব, এমন একজনের সাথে বন্ধুত্ব করুন, যে আপনার পড়ালেখায় সহযোগিতা করবে। যার কারণে আপনার জ্ঞানের ফায়দা হবে। আপনার যোগ্যতা সমৃদ্ধ হবে।
আর আপনি যদি একজন সচেতন অভিভাবক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি এটা খেয়াল রাখুন যে, আপনার ছেলে কারো সাথে বন্ধুত্ব রাখছে কিনা; রাখলে কার সাথে রাখছে এবং কোথায় চলাফেরা করছে? সেটা খেয়াল রাখুন। যথাসম্ভব আপনার সন্তানকে বন্ধুত্ব থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করুন। কথায় আছে না; ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে।’
৩. অহংকার : সম্ভাবনাময় প্রখর মেধার অধিকারী অনেক ছাত্র পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো- অহংকার। কখনো মনের ভিতর এই অহংকার ঢুকে যায় যে, আমি তো অনেক মেধাবী। আমার সাথে কেউ পারে না। এই মনোভাবটা এক সময় এমন প্রকট আকার ধারণ করে যে, সে নিজেকে শিক্ষকের চেয়েও বড় মনে করে। তাই শিক্ষক থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে। যার কারণে আগেকার যুগে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল, সে সম্পর্কটুকু আর বর্তমানে নেই। আর এ কথা চিরসত্য যে, শিক্ষক থেকে দূরে থেকে কোন ছাত্র যদিও বা আলিম হয়ে যায়, কিন্তু আদর্শ একজন সফল মানুষ হওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
এই সেই কিতাব পড়ে নিজেকে অনেক বড় জ্ঞানী ভাবে। অবস্থা তো কখনো কখনো এমনও দাঁড়ায় যে, শিক্ষককে আটকানোর জন্য সে প্রশ্ন করে বসে।
এ কথা একবার আদৌ চিন্তা করে না যে, শিক্ষকও একজন মানুষ। তাঁর তো সবকিছু জানার কথা না। মাঝে মাঝে তাঁর আটকে যাওয়াটা স্বাভাবিক। সবকিছু তো আর অধ্যয়ন ছাড়া বলে দেওয়া সম্ভব নয়। এরকম যদি মাঝেমধ্যে শিক্ষক আটকে যান, তাহলে সে নানান জনের কাছে নানান মন্তব্য করে বেড়ায়। ফলশ্রুতিতে শিক্ষকের মনে কষ্ট লাগে, আর এই কষ্ট তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা একটু চোখ খোলে থাকালেই বাংলাদেশের মাঝেই এমন অহরহ ঘটনা দেখতে পাবো।
এরকম একটি ঘটনা আমি আমার কয়েকজন শিক্ষকের কাছে শুনেছি। যার ব্যাপারে ঘটনাটি বলেছিলেন তাঁকে নিজ চোখে দেখেছিও। খুব বেশি দূরে নয়; নিকট অতীতেই আমাদের সিলেটের বড় একটি মাদরাসার একজন ছাত্রের ব্যাপারেও এমন ঘটনা ঘটেছিল।
ছাত্রযামানায় তিনি প্রখর মেধাবী ছিলেন। তাকমিল ফিল হাদীসের পরীক্ষায় অনেক ভালো রেজাল্ট করে বড় একজন আলেম হিসেবে পরিচিতি লাভও করেছিলেন। কিন্তু তাকমিল ফিল হাদীসের বছর হাদীসের কোন এক শিক্ষকের সাথে বেয়াদবি করার ফলে তার ব্রেইনে সমস্যা এসে গিয়েছিল। যার কারণে তিনি একজন শিক্ষক হিসেবে সমাজের মাঝে কোনো ফায়দা পৌঁছাতে পারেননি। আল্লাহ তার এই বান্দাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমীন।
এখানে তিক্ত হলেও সত্য একটি কথা না বলে পারছি না। অধিকাংশ সময় এই অহংকার সে-সব ছাত্রদের অন্তরে বেশিই আসে যাদের বাপ, চাচা বা ভাই উক্ত প্রতিষ্ঠানের কোন দায়িত্বশীল হয়ে থাকেন। অনেক সময় সেইসব ছাত্রদের অন্তরেও এই অহংকার আসে যারা প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের কোনো শিক্ষকের খাদেম। এই সাহেবজাদাগিরি ভাবটা একসময় তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, আর সে মোটেই তা বুঝতে পারে না।
শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর আপবীতি থেকে কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা জরুরি মনে করছি। তিনি বলছেন— ‘আমি বড় হুজুরের ছেলে’ মনে এই গর্বিত ভাব জন্ম নেওয়া ছিল আব্বাজানের দৃষ্টিতে আরেকটি বড় অপরাধ। বারবার তার এই উক্তি শুনেছি যে, ‘বড় হুজুরের ছেলে এই ভাব একবার জন্ম নিলে বের হতে অনেক সময় লাগে।’ অদমের কোন কাজ দ্বারা যদি এর সামান্যতম সন্দেহ হতো, তাহলে আর নিস্তার ছিল না। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি—
‘পুরাতন মাদরাসার ছাদে আব্বাজানের থাকার কামরা ছিল। ঠিক তার উল্টোদিকে ছিল প্রস্রাবের জায়গা। আব্বাজান প্রস্রাব করতে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় এক স্থান থেকে কাবাবের ঘ্রাণ পেলেন। শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা যফর আহমদ সাহেব মাগরিবের পর কোন ছাত্রকে এই বলে নফল নামাযে দাঁড়িয়েছিলেন যে, ‘তুমি কাবাব কিনে নিয়ে এসে রাখো। আমি পরে খেয়ে নিব।’ আব্বাজানের পর আমি প্রস্রাব করতে গেলাম। আব্বাজানের সন্দেহ হলো, আমি কাউকে কাবাব আনতে বলেছি। এখন প্রস্রাবের বাহানা করে তা খেয়ে এসেছি। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘মুখ খুলো।’ মুখে কাবাবের কোন ঘ্রাণ না পেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাবাব কার?’ আমি অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। এত কঠিনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। উঠে গিয়ে দেখে আসলেন যে, কাবাব জায়গা মতই আছে। মাওলানা যফর আহমদ সাহেব সেই সময় আব্বাজানের সঙ্গে একসাথে খানা খেতেন। যখন সবাই একসাথে খেতে বসলেন, তখন মাওলানা যফর আহমদ সাহেব একজন ছাত্রকে বললেন, ‘ওখানে দেখো কাবাব রাখা আছে, নিয়ে আসো।’ তখন আব্বাজান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর সন্দেহ দূর হলো।’ (আপবীতি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩১)
তিনি আরও বলেন— ‘আব্বাজান এদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতেন, যাতে ছাত্রের পক্ষ থেকে উস্তাদের বেয়াদবি না হয়। আমি তাঁর কাছে মিশকাত শরীফের কিতাব পড়েছি, তা একটু আগেই বলে এসেছি। মাদরাসায় মিশকাত এবং হাদীসের অন্যান্য কিতাবাদিতে দীর্ঘ তাকরীর হত। আমি কয়েকবার অনুমতি চেয়েছি যে, হাদীসের ওই কিতাবটি আমি ছাত্রদের সঙ্গে ক্লাসে পড়ি। আব্বাজান কঠোরভাবে নিষেধ করেন যে, হাদীসের কিতাব তাঁর ও হযরত রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (যফর আহমদ) ছাড়া আর কারও কাছে পড়া যাবে না। তবে মান্তিক ও ফালসাফার কিতাব অন্য কারো কাছে পড়লে সমস্যা নেই। তিনি বলতেন, ‘ফালসাফা, মানতিক ও অন্যান্য শাস্ত্রের উস্তাদের কারো সাথে যদি বেয়াদবি করিস, তাহলে ওই শাস্ত্র তোর চলে যাবে। চলে যাক। কিন্তু হাদীসের কোন উস্তাদের সাথে তুই বেয়াদবি করবে আর তোর হাদীস চলে যাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’ (আপবীতি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৯)
পরামর্শ
আপনি যদি শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে আজ থেকেই নিজের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, শিক্ষকের সাথে উত্তম সম্পর্ক তৈরি করবেন। তাঁদের পরামর্শ নিয়েই সম্মুখপানে এগুবেন। তাঁদের সাথে কখনো বেয়াদবীমূলক কোনো আচরণ করবেন না। তবে আশা করা যায় আপনি কিছুটা হাসিল করতে পারবেন।
আর আপনি যদি অভিভাবক হয়ে থাকেন তাহলে আপনার প্রতি আমার পরামর্শ হলো, আপনার সন্তানকে শিক্ষকদের তদারকিতে দিয়ে আসুন। আপনার সন্তান কোনো শিক্ষকের সাথে কখনো কোনো বেয়াদবিমূলক আচরণ করল কিনা এদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখুন।
০