আদর্শ সন্তান গঠনে যে ব্যবস্থার বিকল্প নেই

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা অনুকরণ করতে ভালোবাসে। তাই শিশুদের শিক্ষার সহজ ও শক্তিশালী উৎস হলো অনুকরণ। আর সে অনুকরণ হয় কোন নমুনার। কাজেই শিশুদের প্রধান শিক্ষক হলো নমুনা।

শিশুরা নমুনা থেকে শেখে। দেখে-দেখে শেখে, শুনে-শুনে শেখে এবং বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে শেখে। নমুনা থেকেই শিশু শিক্ষা অর্জন করে, জীবনের পাথেয় সঞ্চয় করে।

নমুনা ভালো হলে শিশু ভালো হবে, মানুষ হবে এবং সমাজের ফুল হবে। ফলে শিশু হবে ইহকালীন ও পরকালীন সুখ-শান্তি ও প্রশান্তির আধার। আর (আল্লাহ না করুন) নমুনা খারাপ হলে শিশু খারাপ হবে, অমানুষ হবে এবং সমাজের কাঁটা হবে। পরিণতিতে শিশু হবে ইহজগৎ ও পরজগতে দুঃখ-কষ্ট ও লাঞ্ছনা-বঞ্চনার আকর।

এজন্য শিশুকে মানুষরূপে দেখতে চাইলে তার সামনে পেশ করতে হবে উত্তম ও আদর্শ নমুনা।

শিশুর গ্রহণ-বর্জনের কিছু উৎস

চারপাশের শব্দ-বাক্য ও কর্মগুলোই শিশুর মাদরাসা। আশেপাশের কথাবার্তা ও আচার-আচরণই শিশুর পাঠশালা। এদিক-ওদিক থেকে যা শুনে, যা দেখে তা-ই সে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তার সামনে যে বাণী ও কর্মের প্রশংসা করা হয় সে তা গ্রহণ করার চেষ্টা করে আর যে কথা ও কাজের নিন্দা করা হয় সে তা বর্জন করার ইচ্ছা করে।

সুতরাং শিশু যাদের কাজকর্ম দেখে, যাদের কথাবার্তা শুনে তারাই তার শিক্ষক। শিশু যে সমাজে বেড়ে ওঠে এবং যে পরিবেশে গড়ে ওঠে সে সমাজ ও পরিবেশই শিশুর শিক্ষালয়।

এসবই সন্তানের নমুনা, সন্তানের গ্রহণ ও বর্জনের উৎস। এই উৎস ও নমুনাগুলো সন্তানের জীবনে অনেক ভূমিকা রাখে, সন্তানের জীবন গঠনে বিরাট প্রভাব ফেলে।

যাদের হাতে নির্মিত হয় শিশুর ভিত 

শিশু চোখ মেলে সর্বপ্রথম যাদের ওপর দৃষ্টি পড়ে তারা হলেন মা-বাবা। তাদের শব্দ-বাক্য ও কর্মই সন্তানের প্রথম কিতাব। শিশু মা-বাবাকে দেখে তাদের অভ্যাসগুলো রপ্ত করে এবং জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। মা ও বাবা হচ্ছে সন্তানের আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হয় তার আদর্শ, প্রতিবিম্বিত হয় বিবেক ও হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। এ আয়নায় যা কিছু ভালো ও সুন্দর দেখাবে সন্তান সেগুলো আদর্শরূপে গ্রহণ করবে, বিবেক ও হৃদয়ে স্থান দেবে। আর এ আয়নায় যা কিছু মন্দ ও অসুন্দর দেখাবে সন্তান সেসব ছুড়ে ফেলবে, নিন্দা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখবে।

তাই কল্যাণকামী পিতা-মাতা সন্তানকে শুনাতে থাকে নেক ও সত্য মানুষের তৃপ্তির হাসি এবং বদ ও মিথ্যাপুষিত জীবনের আহাজারি। ফলে সন্তানের দিলে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা পয়দা হবে, অসত্য ও অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হবে।

সুতরাং সন্তানের চোখে মা-বাবাই হচ্ছে প্রথম মাদরাসা, যেখানে নির্মিত হয় সন্তানের ভিত।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও শিশুর শিক্ষালয়। তাদের জীবনপাতাও খোলা থাকে শিশুর সামনে। দেখে-দেখে তাদের স্বভাব ও অভ্যাসগুলোও নিজের জীবনে ধারণ করে নেয় শিশু।

এককথায়, শিশুর পিতা-মাতা ও পরিবারের সদস্যরাই হলেন শিশুর প্রথম বিদ্যাপীঠ। তাদের আচরণ-উচ্চারণ ও রুচি-বিশ্বাসই শিশুর প্রথম শিক্ষক। তাদের আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা ও আমল-আখলাকই শিশুদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বপ্রথম। এখানের শিক্ষাই শিশুর বুনিয়াদি ইট, যার ওপর নির্মিত হয় শিশুর গোটা জীবন। ইমারতের প্রথম ইটটা যদি বাঁকা করে বিছানো হয় তবে তার উচ্চতা তারকালোক স্পর্শ করলেও শেষ পর্যন্ত তা বাঁকাই থাকবে।

ঘরকে আলোকিত রাখুন 

শিশুর প্রথম ও সবচেয়ে প্রিয় মাদরাসা যেহেতু শিশুর ঘর, শিশুর পরিবার, তাই হাদীস শরীফে এই মাদরাসাটিকে আলোকিত করার প্রতি জোর তাকিদ দেওয়া হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিদেশ দিয়েছেন-

اجْعَلُوا فِي بُيُوتِكُمْ مِنْ صَلاَتِكُمْ وَلاَ تَتَّخِذُوهَا قُبُورًا

‘তোমরা নিজেদের ঘরেও নামাযের কিছু অংশ রাখ। ঘরকে কবর বানিও না।’ (অর্থাৎ কিছু কিছু নফল নামায ঘরে পড়।) (সহীহ বুখারী, হাদীসক্রম : ৪৩২; সহীহ মুসলিম, হাদীসক্রম : ৭৭৭)

ঘরে নামায পড়ার নির্দেশ দেওয়ার কারণ কী? হাদীস শরীফে এর উত্তর এসেছে এভাবে-

إذا قضى أحدكم الصلاة في مسجده، فليجعل لبيته نصيبا من صلاته، فإن الله جاعل في بيته من صلاته خيرا

‘মসজিদের নামায শেষ হয়ে গেলে তোমাদের প্রত্যেকেই যেন আপন ঘরে গিয়ে কিছু নামায পড়ে। কেননা, নামাযের কারণে আল্লাহ তোমাদের ঘরে কল্যাণ দান করবেন।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীসক্রম : ৭৭৮)

অপর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

صلاة الرجل في بيته نور، فنوروا بيوتكم

‘ঘরের নামায হলো নূর। সুতরাং (নামায দ্বারা) তোমাদের ঘরগুলোকে নূরানী কর।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীসক্রম : ৬৫২১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীসক্রম : ১৩৭৫)

ঘরে নামায পড়লে ঘর নূরানী হবে, ঘরে খায়র ও কল্যাণ বর্ষিত হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আলো ও কল্যাণের একটা বড় দিক হল- আমাদের সোনামণিরা অন্যদের নামায দেখে তারাও নামাযী হয়ে যাবে, তাদের জীবনও আলোকিত হবে।

অন্য হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাত বছরের শিশুদের নামাযের আদেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর এ হাদীসে শিশুরা যেন সে আদেশ সহজে কবুল করতে পারে এর পদ্ধতি বলে দিয়েছেন।

অর্থাৎ তোমরা কিছু কিছু নফল নামায ঘরে আদায় কর। ঘরে নূর ও বরকত হবে। তোমাদের নামায দেখে তোমাদের সন্তানদের মধ্যে নামাযের আগ্রহ পয়দা হবে। ফলে তাদের নামাযের আদেশ করা হলে সহজেই তারা সে আদেশ মেনে নেবে। এর জন্য অতিরিক্ত শাসনের প্রয়োজন হবে না।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন, শিশুরা কথার চেয়ে কর্ম থেকে বেশি শেখে। তোমরা শিশুদের শুধু আদেশ-উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত থেকো না, বরং তোমাদের আমলকে নমুনা হিসেবে পেশ কর। তাহলে আগ্রহের সাথে তারা তোমাদের নির্দেশাবলি গ্রহণ করবে।

যেমন গুরু তেমন শিষ্য 

মা-বাবা ও পরিবারের পর শিশুর জীবনে যাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি তাঁরা হলেন শিক্ষকমণ্ডলী। তারা হলেন শিশুর দ্বিতীয় নমুনা।

শিক্ষকের প্রতি যে ভক্তি-অনুরাগ থাকে অন্যদের ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। শিশুর চোখ শিক্ষকের প্রতি নিবদ্ধ থাকে। শিশুর দেমাগ শিক্ষকের সাথে জুড়ে থাকে। শিক্ষকের নীতি ও আদর্শে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করার চেষ্টা করে। শিক্ষকের পছন্দ শিশুর পছন্দ, শিক্ষকের অপছন্দ শিশুর অপছন্দ।

একবার ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহ-এর নিকট আবেদন করা হলো, আমীরুল মুমিনীন হারুনুর রশীদের সন্তানদের গৃহশিক্ষক আবু আবদুস সামাদকে কিছু উপদেশ দান করুন। ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহ বললেন-

ليكن أول ما تبدأ به من إصلاح أولاد أمير المؤمنين إصلاحك نفسك فإن أعينهم معقودة بعينك فالحسن عندهم ما تستحسنه والقبيح عندهم ما تكرهه

‘আমীরুল মুমিনীনের সন্তানের সংশোধনের আগে আপনি নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করবেন। কেননা, তাদের চোখ আপনার চোখের সাথে বাধা। আপনার চোখে যা নন্দিত তাদের কাছে তা নন্দিত, আর আপনার চোখে না নিন্দিত তাদের নিকট তা নিন্দিত।’ (সিফাতুস সাফওয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৩৭; হিলইয়াতুল আউলিয়া, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ১৪৭; তারীখে বাগদাদ, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩০৬)

সুতরাং শিক্ষক সন্তানের আদর্শ। সন্তান তার শিক্ষকের চিন্তা-ফিকির ও আকীদা-বিশ্বাস দিয়ে আপন হৃদয়ের খালি জমিনটাকে আবাদ করে। তাই শিক্ষকের চেতনা-বিশ্বাস ভালো হলে শিশু উত্তম চিন্তা-চেতনার ধারক হবে। আর শিক্ষকের আকীদা-বিশ্বাসে বক্রতা থাকলে শিশুর মন-মস্তিস্কে বক্রতা অনুপ্রবেশ করবে। শিশুর মনমানসিকতা, ধ্যানধারণা, বোধ-বিশ্বাস, রুচি-শিক্ষা, স্বভাব-সভ্যতা ইত্যাদি গুণাবলি অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভালো ও মন্দ গুণাবলির বিরাট ভূমিকা রয়েছে। কাজেই অভিভাবকের জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য সন্তানের শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ দায়িত্বের কথা স্মরণ রাখা।

সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ 

সঙ্গ ও সুহবতের রয়েছে চুম্বক-আকর্ষণ। জীবনের ওপর সুহবত ও সাহচর্যের প্রভাব অনস্বীকার্য। বন্ধু বন্ধুর চরিত্র গ্রহণ করে। দোস্ত দোস্তের চেতনা ধারণ করে। অবচেতনভাবেই সঙ্গীর জীবনে সঙ্গীর বোধ-বিশ^াস, রুচি-প্রকৃতি, নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটে।

কারো আখলাক-চরিত্র কেমন, তা যদি যাচাই করতে চান, তার সঙ্গীর দিকে দৃষ্টি দিন। কারো চিন্তা-ফিকির ও জীবনাচার সম্পর্কে যদি জানতে চান, তার সঙ্গীকে পর্যবেক্ষণ করুন। সঙ্গীর স্বভাবই তার স্বভাব। সঙ্গীর চেতনাই তার চেতনা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবিস্মরণীয় বাণী থেকে আমাদের আলো গ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেছেন-

المرء على دين خليله، فلينظر أحدكم من يخالل.

‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব-চরিত্র) দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, তা যেন ভেবে দেখে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদীসক্রম : ৮৪১৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীসক্রম : ৪৮৩৩; সুনানে তিরমিযী, হাদীসক্রম : ২৩৭৮)

ভালো ও দুষ্ট বন্ধু জীবনকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে- এর চমৎকার একটি উপমাও দিয়েছেন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إنما مثل الجليس الصالح، والجليس السوء، كحامل المسك، ونافخ الكير، فحامل المسك: إما أن يحذيك، وإما أن تبتاع منه، وإما أن تجد منه ريحا طيبة، ونافخ الكير: إما أن يحرق ثيابك، وإما أن تجد ريحا خبيثة

‘ভালো এবং খারাপ বন্ধুর দৃষ্টান্ত হল মেশ্ক বিক্রেতা ও কর্মকারের মত। মেশক্ বিক্রেতার সাহচর্য এমন উপকারী যে, সে তোমাকে মেশক্ উপহার দেবে অথবা তুমি মেশক্ খরিদ করবে, অন্তত তার থেকে মেশকের ঘ্রাণ লাভ করবে। আর কর্মকারের সঙ্গলাভ এমন ক্ষতিকর যে, সে হয়তো তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে, না হয় তুমি তার কাছ থেকে ধোয়ার দুর্গন্ধ পাবে।’ (সহীহ বুখারী, হাদীসক্রম : ৫৫৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদীসক্রম : ২৬২৪)

নেক সঙ্গীর সান্নিধ্য জীবনকে সুরভিত ও আলোকিত করে, আর বদ সঙ্গীর সাহচর্য মানুষকে দুর্গন্ধ ও অন্ধকার করে। কথায় বলে- ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ এ সম্পর্কে একটি ঘটনা স্মরণ হয়েছে। এতে চিন্তার অনেক খোরাক রয়েছে এবং রয়েছে অসৎ সঙ্গী জীবনকে ধ্বংসের কোন গহ্বরে ফেলতে পারে, এর জ¦লন্ত প্রমাণ।

ঘটনাটি নবীযুগের। উকবা ইবনে আবু মুঈত। সে ছিল কাফের। কিন্তু নবীজির কাছে আসা-যাওয়া করত। এক পর্যায়ে সে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করে।

তার বন্ধু উমায়্যা ইবনে খালাফ বিষয়টি জানতে পারে। একসময় তার সাথে দেখা হয়। সে উমায়্যাকে বলল, ‘তুমি নাকি মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেছ? তা ত্যাগ কর। অন্যথায় তোমার সাথে আমার কোনো বন্ধুত্ব নেই।’

উকবা ইবনে আবু মুঈতের মাথায় চড়ে বসে বন্ধুকে খুশি করার কুচিন্তা। এ জন্য সে ইসলামের সুশীতল ছায়া থেকে বের হয়ে যায়। ফিরে যায় ইসলামের আলো থেকে আবার কুফুরের অন্ধকারে। (দ্রষ্টব্য : তাফসীরে তাবারী, খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ২৬৩,৩৬৪)

আরেকটি ঘটনা লক্ষ্য করুন। আলী ইবনে হুসাইন যায়নুল আবেদীন নবী-পরিবারের উজ্জ্বল নক্ষত্র, হুসাইন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হলেন হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র এবং আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর দৌহিত্র। এই মহান মনীষী ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কৃতদাস যায়েদ ইবনে আসলামের মসজিসে বসে থাকতেন।

একদা নাফে ইবনে জুবায়ের রাহমাতুল্লাহি আলাইহি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি এমন করেন কেন?’ ‘বড় বড় ব্যক্তিদের সাথে ওঠা-বসা না করে একজন গোলামের সাথে এত চলাফেরা করেন কেন?’

যায়নুল আবেদীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তখন যে উত্তর দিয়েছেন তাতে রয়েছে আমাদের জন্য চিন্তা ও শিক্ষার বহু খোরাক। তিনি বলেন-

إنما يجلس الرجل الى من ينفعه في دينه

‘ঐ ব্যক্তির মজলিসেই তো আসা-যাওয়া উচিত, যার সান্নিধ্য দ্বীন ও ঈমানের ক্ষেত্রে উপকার করে।’ (আততারীখু কাবীর, ইমাম বুখারী, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৩৮৭; তারীখে দামেশক, খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ২৭৮; তাহযীবুল আসমা ওয়াললুগাত, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৯৭)

চারপাশে একটু তাকিয়ে দেখুন, দেখতে পাবেন, দুষ্ট সঙ্গীদের বিষাক্ত সঙ্গ কত জীবনের ঈমান ও চরিত্র খু্ইয়ে দিচ্ছে! আবার এর বিপরীতও হয়। ছেলেটা দুষ্ট। তাকে ভালো দোস্তের সাথে সম্পর্ক করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার আখলাক-চরিত্র পরিবর্তন হয়ে গেছে।

মূলকথা, শিশুর গ্রহণ ও অর্জনের বড় একটা উৎস হলো তার বন্ধু। তাই সন্তান যাদের সাথে চলাফেরা করে, তাদের আমল ও আখলাক কেমন, এ বিষয়ে খুব সজাগ দৃষ্টি রাখা চাই।

শিশুর চারপাশ 

শিশু যা দেখে, যা শোনে তা থেকেই চিন্তার খোরাক আহরণ করে। যে পরিবেশে শিশুর চলাফেরা সেখানের ভালো-মন্দ সবই সে আত্মস্থ করে। তাই পরিবেশও শিশুর নমুনা। ভালো পরিবেশ থেকে ভালো আখলাকে সজ্জিত হয়, বদ পরিবেশ থেকে বদ খাসলত গ্রহণ করে। হাদীস শরীফের ঘটনা-

বনী ইসরায়েলের এক লোক নিরানব্বইটা খুন করেছে। মনে তাওবার চিন্তা আসলে দারস্ত হলো এক দরবেশের, যার ইলম ছিল না। আরজ করল, ‘আমি বড় অপরাধী। আমার তাওবা করার কোন সুযোগ আছে কি?’ দরবেশ বললেন, ‘না’। তখন দরবেশকে সে হত্যা করল। এভাবে লাল খুনের কালো সংখ্যা পৌঁছে গেলো শ’র কোঠায়।

কিছুদিন পর আবার অস্থির হয়ে গেল। তাওবার চিন্তা তাকে ব্যাকুল করে তুলল। তাই শরণাপন্ন হলো এক আলেমের। জিজ্ঞেস করল, ‘আমার তাওবা করার কোন ব্যবস্থা আছে কি?’ আলেম বললেন, ‘অবশ্যই আছে’। এরপর আলেম বললেন-

انطلق إلى أرض كذا وكذا، فإن بها أناسا يعبدون الله فاعبد الله معهم، ولا ترجع إلى أرضك، فإنها أرض سوء،

‘অমুক গ্রামে চলে যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর ইবাদত করছে। তাদের সাথে তুমিও ইবাদত-বন্দেগি কর। তোমার এলাকায় আসবে না। কেননা, এ এলাকার পরিবেশ ভালো না।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীসক্রম : ২৭৬৬)

হাদীসটির আরেক বর্ণনায় ঐ আলেমের বক্তব্য এসেছে এভাবে-

اخرج من القرية الخبيثة التي أنت بها

‘তুমি যে গ্রামে বসবাস করছ তার পরিবেশ খারাপ। তাই এখান থেকে বের হয়ে যাও।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদীসক্রম : ১১৬৮৭)

সুতরাং মানুষের ঈমান-আমল ও স্বভাব-চরিত্র ভালো ও মন্দ হওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশের রয়েছে অনেক প্রভাব। তাই আদরের সন্তানকে গোনাহের পরিবেশ, বদ আখলাকের পরিবেশ, অন্যায় ও বেহায়াপনার পরিবেশ থেকে দূরে রাখুন এবং গান-বাদ্য বা অশ্লিলতার নোংরামি রয়েছে এমন সব আমন্ত্রণ ও অনুষ্ঠান থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। মনে রাখবেন, শিশু যদিও ভালো-মন্দ বোঝে না, কিন্তু যা দেখে তার প্রতি আকর্ষণ পয়দা হয়। ভালো দেখলে ভালোর প্রতি আকৃষ্ট হয়, মন্দ দেখলে মন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

শিশুকে যদি অনাচার ও কুসংস্কার মিশ্রিত আমন্ত্রণ-অনুষ্ঠানে উপস্থিত করা হয়, তাহলে এসবের প্রতি ঘৃণাবোধ দূর হয়ে যাবে। শিশুর হৃদয়ে অন্যায় ও অনাচারের প্রতি টান ও ভালোলাগা জন্মে যাবে। এর বিপরীত শিশুকে যদি ভালো ও আলোর পরিবেশে রাখা হয় তাহলে আলো ও ভালোর প্রতি মমতা জন্মাবে। শিশু আলোর মানুষ হতে সহায়ক হবে।

মোটকথা, সন্তানকে আদর্শ মানুষরূপে দেখতে হলে তার সামনে আদর্শ নমুনা পেশ করতে হবে। সে যেখানে থাকে তার চারপাশে আদর্শের আলো আসতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সাহায্য করুন। কলিজার টুকরোদের সামনে সুন্দর নমুনা ও উত্তম আদর্শ পেশ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

সত্য ও সুন্দরের প্রহরায় ৪৮ বছর

প্রতিষ্ঠাতা : শায়খ আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী রহ.
নিবন্ধন নম্বর : চ-৪৭৩/০৫

কপিরাইট © ২০২৪ | মাসিক হেফাজতে ইসলাম, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মুখপত্র। Developed By Shabaka IT